কবি শেখ ফজলল করিমের বাড়িতে একদিন

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা গ্রামে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি শেখ ফজলল করিমের বসতবাড়ি। কবির বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, যা আমার অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছে।
কবির বাড়ি যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না, এমনকি আমি নিজেও জানতাম না কাকিনায় এ বিখ্যাত মানুষটির বাড়ি রয়েছে। ওই গ্রামে আমার একজন নিকটাত্মীয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চাকরি করেন। তার কাছে যাওয়াই ছিল আমার একমাত্র উদ্দেশ্যে। তাই হুট করে পরিকল্পনা ছাড়াই লালমনিরহাট সদর হতে পাটগ্রামের বাসে চড়ে বসি। বাসটি কালীগঞ্জে নামিয়ে দিলে রিকশাযোগে কাকিনায় আন্টির কাছে পৌঁছাই। উপজেলা সদর হতে সড়কপথে এর দূরত্ব ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার।
আমি জানতাম না আন্টি আমাকে কবির বাসায় বেড়াতে নিয়ে যাবেন। আমাকে যখন বলল, আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। একই সঙ্গে আনন্দে আপ্লুত হয়ে উঠি। এ প্রথম কোনো এক কবির বাড়ির দেখার সৌভাগ্য হবে এ ভেবে।
কবি ফজলল করিমের বিখ্যাত সেই চরণগুলো ‘কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর! মানুষের মাঝে  স্বর্গ-নরক, মানুষেতে সুরাসুর’, অনেকবার পড়েছি। কিন্তু তার জন্মস্থান দেখতে পারব এটা কখনও ভাবিনি।
কবি পরলোকেগমন করেছেন ১৯৩৬ সালে। তার বসতবাড়িটি ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে। এ বাড়িতে বর্তমানে বাস করে তার নাতি-নাতনিরা। সড়ক থেকে উঁকি দিলেই কবির বাড়িটি দেখা যায়। আমরা সড়ক থেকে নেমে কাঁচা রাস্তায় হাঁটতে শুরু করি। প্রথমেই নজরে পড়ল কবির সমাধি স্থান। এখানে অচেনা অনেক ধরনের ফুলের গাছ চোখে পড়ল। দেখতে বেশ ভালোই লাগছিল। এরপর বিরাট কাচারি ঘর দেখতে পেলাম। কাচারি ঘরে প্রবেশের পথে অনেক লম্বা একটি বারান্দায় সৌখিন কাঠের কারুকাজ চোখে পড়ে। ঘরের পুরো চালাজুড়ে ফুলের সমাহার। এরপর সেই কাচারি ঘরে ঢুকলাম, এখানে কবি কবিতা লিখে জীবন পার করেছেন। ঘরটায় ঢুকে মনে হলো দীর্ঘদিন এর তেমন কোনো সংস্কার করা হয়নি।
কবিতা লিখতে যে কালি ও কলম ব্যবহার করতেন, তা এ যুগের কলমের মতো নয়, অনেকটা দোয়াত-কলমের মতো। এমন বিরল একটি বস্তু সংগ্রহে থাকলে কেমন হয়! মনে উঁকি দিচ্ছিল ভাবনাটি। কিন্তু সেটা সংরক্ষণ করা, তাই শুধু দেখেই গেলাম। এর সঙ্গে চেয়ার ও টেবিল রয়েছে, তবে আধা ভাঙা। কবির ঘুমানোর খাটটাও কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে। পুরোনো কারুকাজ করা একটা আলমারি চোখে পড়ল, এখানে তার যাবতীয় ব্যবহার্য জিনিস সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। দু’চোখ ভরে দেখে নিলাম। ঘরের ভেতরে কবির দুই চারটা বাঁধাই করা ছবিও দেখতে পাই।
3কবির ঘরের সামনে বড় একটি আঙিনা। এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ। আমরা যেদিন গিয়েছিলাম সেদিন নাইটকুইন ফুলের কলি এসেছিল, যা সে রাতে ফুটবে বলে জানান কবির নাতবউ। তিনি আরও বলেন, আমরা নাকি খুব সৌভাগ্যবান, এ নাইটকুইন ফুলের গাছকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যত্নে বড় করছিলেন। আজ প্রথম ফুলের কলি ছেড়েছে আর আজ আমরাও এসেছি। তার কথা শুনে মনে হচ্ছিল, আমি সেই রাতে সেখানে থেকে যাই। নাইটকুইন মধ্যরাতে ফোটে, আমি সেটা উপভোগ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি।
কবির নাতবউ এক এক করে তার বাড়ির সব ফুলগাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। দেশের প্রায় সব ফুল গাছের আইটেম রয়েছে এখানে। এ বিষয়টিই আমাকে সবচেয়ে বেশি বিমোহিত করেছে। নাতবউ বলেন, কবি ফুল খুব ভালোবাসতেন। তাই তিনি সব ফুলেরই চারা লাগিয়েছেন। বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলাম পুকুরপাড়ে। অনেক বড় আকারের একটি পুকুর রয়েছে, এখানে বসে প্রায়ই কবিতা লিখতেন কবি। খুব সুন্দর মনোরম পরিবেশ। তিনি যে মসজিদে নামাজ পড়তেন, সেই মসজিদটি এখনও সেখানে রয়েছে, স্থানীয়রা সেখানে নামাজ আদায় করেন।
কাকিনা বাজারে দোতলা ভবন নির্মিত একটি গ্রন্থাগার রয়েছে। গ্রন্থাগারটি নোংরা হয়ে আছে। কোনো পাঠকও নেই, বইয়ের সংখ্যাও খুব কম। সব বিষয়ে ভালো লাগলেও এ বিষয়ে আমার একটু মন খারাপ হয়েছিল। ভালো খারাপ নিয়েই দিনটি খুব মজায় কেটেছিল। তাই আবারও যেতে ইচ্ছে করে সেই বিখ্যাত কবি শেখ ফজলল করিমের বাড়িতে।

কামরুন নাহার ঊষা