করদাতাদের উদ্বুদ্ধ করবে আয়কর মেলা

মুহাম্মদ আল-আমিন: ২০১৮-১৯ করবছরের আয়কর বিবরণী দাখিলের শেষ দিন ৩০ নভেম্বর। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে করদাতাদের কাছ থেকে কর প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ১৩ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে আয়কর মেলা। বিবরণী দাখিলের শেষ দিন অর্থাৎ ৩০ নভেম্বর উদ্যাপন হবে আয়কর দিবস। করজাল বৃদ্ধি ও বড় অঙ্কের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যে এবার জাতীয় আয়কর মেলা আটটি বিভাগীয় শহরসহ ১৬৬ স্থানে শুরু হবে। এর মধ্যে আগামী ১৩ থেকে ১৯ নভেম্বর বিভাগীয় শহরে সাত দিন, ৫৬ জেলা শহরে চার দিন, ৩২ জেলায় দুদিন ও ৭০ উপজেলায় একদিনব্যাপী ভ্রাম্যমাণ মেলা উদ্যাপন হবে। ৩০ নভেম্বর আয়কর দিবসে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।
নবম আয়কর মেলা উপলক্ষে এরই মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুরো প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিগত দুবছর ধরে কেন্দ্রীয়ভাবে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্মাণাধীন রাজস্ব ভবনে মেলা অনুষ্ঠিত হলেও আবার ফিরে আসছে বেইলি রোডে অফিসার্স ক্লাব প্রাঙ্গণে।
কারণ হিসেবে এনবিআর বলছে, মেট্রোরেলের কাজ চলমান থাকায় যানজট এড়াতেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত। করদাতাদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অফিসার্স ক্লাবের পাশাপাশি একই ধরনের সেবা পাওয়া যাবে কর অঞ্চলের সার্কেল অফিসগুলোয়ও। মেলায় নতুন সংযোজন হিসেবে এবার থাকছে ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে কর প্রশিক্ষণ। প্রতি বছরের মতো করদাতারা এবারও মেলায় আয়কর বিবরণীর ফরম থেকে শুরু করে কর পরিশোধের জন্য ব্যাংক বুথও পাবেন। একই ছাদের নিচে সব সেবা মিলবে। মেলায় নতুন করদাতারা ইলেকট্রনিক কর শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) নিতে পারবেন। এছাড়া ই-পেমেন্টের জন্য পৃথক বুথ থাকবে। মুক্তিযোদ্ধা, নারী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ করদাতাদের জন্য আলাদা বুথ থাকবে।
এ বিষয়ে মেলার সমন্বয়কারী ও এনবিআর সদস্য (আয়কর প্রশাসন) জিয়াউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘এবারের মেলায় নতুন করদাতাদের উদ্বুদ্ধ করতে অডিও ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে ওয়ার্কশপ হবে। নতুন করদাতা তৈরি ও বিবরণী দাখিলে সাহায্য করতেই এ কর্মশালা। এতে সাধারণত কারদাতাদের মনে যে প্রশ্নগুলো আসে, তা সেট করা থাকবে। নতুন কোনো প্রশ্ন জাগলে সে প্রশ্নের উত্তরও অন্তর্ভুক্ত হবে। এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলতে থাকবে, যা হেল্প ডেস্কের মতো কাজ করবে। এটিই এবারের মেলার একমাত্র ব্যতিক্রম।’
এর আগে ১২ নভেম্বর জেলাভিত্তিক সর্বোচ্চ ও দীর্ঘ সময় ধরে আয়করদাতাদের পুরস্কার দেওয়া হবে। ২০১৭-১৮ করবছরের পরিশোধিত আয়করের ভিত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ আয়কর প্রদানকারী ব্যক্তি, কোম্পানি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে ১৪১টি ট্যাক্সকার্ড দেওয়া হবে। ব্যক্তি শ্রেণিতে ৭৬, কোম্পানিতে ৫৪ ও অন্যান্য ক্যাটেগরিতে ১১টি ট্যাক্সকার্ড দেওয়া হবে।
এবার অবশ্য নতুন করে কোনো পরিবারকেই ‘কর বাহাদুর’ পরিবারের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। আলাদা শ্রেণি করে তিন বছর আগে থেকে সেরা করদাতাদের ট্যাক্সকার্ড দিয়ে আসছে এনবিআর। সেরা করদাতা হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এবারও ১৪১টি ট্যাক্সকার্ড দেবে এনবিআর। এর মধ্যে ব্যক্তি রয়েছেন ৭৬ জন, বাকিগুলো প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোম্পানি পর্যায়ে ট্যাক্সকার্ড পাচ্ছে ৫৪ কোম্পানি। কোম্পানিগুলোকে ট্যাক্সকার্ড দেওয়া হবে ১৪ ক্যাটেগরিতে। এগুলো হচ্ছে: ব্যাংকিং, অব্যাংকিং আর্থিক, টেলিযোগাযোগ, প্রকৌশল, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক, জ্বালানি, পাটশিল্প, স্পিনিং ও টেক্সটাইল, ওষুধ ও রসায়ন, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, আবাসন, তৈরি পোশাক, চামড়াশিল্প ও অন্যান্য।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যান্য করদাতা পর্যায়ে চার ক্যাটেগরিতে দেওয়া হবে আরও ১১টি ট্যাক্সকার্ড। ক্যাটেগরিগুলো হচ্ছে: ফার্ম, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, ব্যক্তিসংঘ ও অন্যান্য।
যোগ্য করদাতা হিসেবে সবাইকে এ মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে ট্যাক্সকার্ড ও সম্মাননা দেবে সরকার। নীতিমালা অনুযায়ী, ট্যাক্সকার্ডধারীদের সরকার বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান ও সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকার আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় আমন্ত্রণ জানাবে। যে কোনো ভ্রমণে সড়ক, বিমান বা জলপথে টিকিট পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা অগ্রাধিকার পাবেন।
স্বামী-স্ত্রী, নির্ভরশীল পুত্র-কন্যা নিজেদের চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কেবিন সুবিধাও পাবেন তারা। এছাড়া বিমানবন্দরে সিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার এবং তারকা হোটেলসহ সব আবাসিক হোটেলে বুকিং পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা অগ্রাধিকার পাবেন। ট্যাক্সকার্ড দেওয়ার পর থেকে এর মেয়াদ থাকবে এক বছর।
সাংবাদিক শ্রেণিতে এ বছর সেরা করদাতা প্রথম আলো সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান এবং ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম। করদাতার দিক থেকে সেরা পাঁচ সাংবাদিকের অন্যরা হচ্ছেন: চ্যানেল আইয়ের পরিচালক (বার্তা) শাইখ সিরাজ, চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল মালেক এবং বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর সম্পাদক নঈম নিজাম।
সিনিয়র সিটিজেন শ্রেণিতে ট্যাক্সকার্ড পাবেন স্যামুয়েল এস চৌধুরী, তপন চৌধুরী ও রাজশাহীর অনিতা চৌধুরী এবং গোলাম দস্তগীর গাজী ও খন্দকার বদরুল হাসান। তাদের মধ্যে সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) করদাতা। স্যামুয়েল এস চৌধুরী ও অনিতা চৌধুরী রাজশাহী কর অঞ্চল এবং খন্দকার বদরুল হাসান ঢাকা কর অঞ্চল-৩-এর করদাতা।
গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণিতে ট্যাক্সকার্ড পাবেন ঢাকার চার কর অঞ্চলের লে. জেনারেল (অব.) আবু সালেহ মো. নাসিম, মো. নাসির উদ্দিন মৃধা, এসএম আবদুল ওয়াহাব, মো. ইদ্রিস আলী মিয়া এবং মো. আতাউর রউফ।
নারী শ্রেণিতে ঢাকার কর অঞ্চল-৩-এর রুবাইয়াত ফারজানা হোসেন, কর অঞ্চল-৬-এর মাহমুদা আলী শিকদার ও কর অঞ্চল-৯-এর পারভীন হাসান এবং রাজশাহী কর অঞ্চলের রতœা পাত্র ও রংপুর কর অঞ্চলের নিশাত ফারজানা চৌধুরী ট্যাক্সকার্ড পাবেন।
তরুণ শ্রেণিতে রয়েছেন এলটিইউর করদাতা নাফিস সিকদার, ঢাকার কর অঞ্চল-৪-এর গাজী গোলাম মর্তুজা, কর অঞ্চল-৩-এর মো. হাসান, কর অঞ্চল-১০-এর জুলফিকার হোসেন মাসুদ রানা এবং চট্টগ্রাম কর অঞ্চল-৪-এর মো. আমজাদ খান।
প্রতিবন্ধী শ্রেণিতে ঢাকার কেউ ট্যাক্সকার্ড পাননি। পাচ্ছেন চট্টগ্রামের সুকর্ণ ঘোষ, সিলেটের মো. মামুনুর রশিদ ও খুলনার কাজী আখতার হোসেন।
ব্যবসায়ী শ্রেণিতে রয়েছেন ঢাকার কর অঞ্চল-২-এর মো. কাউছ মিয়া, কর অঞ্চল-১২-এর আবদুল কাদির মোল্লা, কর অঞ্চল-১৫-এর কামরুল আশরাফ খান, এলটিইউর সৈয়দ আবুল হোসেন এবং কর অঞ্চল-১০-এর মো. নুরুজ্জামান খান।
চিকিৎসক শ্রেণির সেরা পাঁচ করদাতাই কর অঞ্চল-১০-এর। তারা হলেন: একেএম ফজলুল হক, প্রাণ গোপাল দত্ত, জাহাঙ্গীর কবির, এনএএম মোমেনুজ্জামান ও মো. নুরুল ইসলাম।
আইনজীবী শ্রেণির সবাই কর অঞ্চল-৮-এর। তালিকায় রয়েছেন: মাহবুবে আলম, শেখ ফজলে নূর
তাপস, আহসানুল করিম, কাজী মুহাম্মদ তানজীবুল আলম ও নিহাদ কবির।
স্থপতি শ্রেণিতে এবার তিনজন ট্যাক্সকার্ড পাবেন। তারা হলেন: ফয়েজ উল্লাহ, হাসান শামস উদ্দীন ও ইকবাল হাবিব।
প্রকৌশলী শ্রেণিতে ঢাকার কেউ ট্যাক্সকার্ড পাচ্ছেন না। পাচ্ছেন চট্টগ্রামের মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, রাজশাহীর মো. হাফিজুর রহমান ও বগুড়ার মোহাম্মদ হামিদুল হক।
হিসাবরক্ষক শ্রেণিতে কার্ড পাচ্ছেন ঢাকার মো. মোক্তার হোসেন, এমবিএম লুৎফুল হাদী ও
বিমলেন্দু চক্রবর্ত্তী।
নতুন করদাতা শ্রেণিতে সাতজনের মধ্যে ঢাকার মিয়া মনিকা রফিকুলোভনা, তাফিজুল ইসলাম পিয়াল ও সাইফুল ইসলাম, সিলেটের রানা মালিক, মোসাম্মাৎ সেলিনা আক্তার ও রাসেল রায় এবং রাজশাহীর মোছা. ছিয়াতুন নেছা।
অন্যান্য এলটিইউর করদাতা শ্রেণিতে পাচ্ছেন সদর উদ্দিন খান, আবু মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন খান ও নজরুল ইসলাম মজুমদার।
ব্যাংক প্রাতিষ্ঠানিক করদাতা শ্রেণিতে রয়েছে: ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, এইচএসবিসি, সাউথইস্ট ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক।
অব্যাংকিং আর্থিক খাত শ্রেণিতে রয়েছে: আইডিএলসি ফাইন্যান্স, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড ও উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট।
খাদ্য ও আনুষঙ্গিক প্রাতিষ্ঠানিক করদাতার শ্রেণিতে রয়েছে: নেসলে বাংলাদেশ, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ ও ট্রান্সকম বেভারেজেস।
প্রকৌশল শ্রেণিতে বিএসআরএম স্টিলস, পিএইচপি কোল্ড রোলিং মিলস এবং পিএইচপি নফ কন্টিনিউয়াস গ্যালভানাইজিং মিলস কার্ড পাচ্ছে।
তৈরি পোশাক শ্রেণিতে কার্ড পাচ্ছে: রিফাত গার্মেন্ট, জিএমএস কম্পোজিট, দ্যাটস ইট স্পোর্টস
ওয়্যার, ফোর এইচ ফ্যাশন, কেডিএস গার্মেন্টস ও এ্যাপেক্স লেনজারি।
এছাড়া টেলিযোগাযোগে গ্রামীণফোন; জ্বালানিতে তিতাস গ্যাস, সিলেট গ্যাস ও শেভরন বাংলাদেশ; পাটশিল্পে জনতা জুট, সুপার জুট ও আইয়ান জুট; আবাসনে স্পেসজিরো, বে ডেভেলপমেন্টস ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স; চামড়াশিল্পে বাটা শু, এ্যাপেক্স ফুটওয়্যার ও লালমাই ফুটওয়্যার। অন্যান্য শ্রেণিতে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, মেটলাইফ, লাফার্জ হোলসিম ও নিটল মোটরস। অন্যান্য করদাতার ফার্ম পর্যায়ে ওয়ালটন মাইক্রোটেক করপোরেশন, এসএন করপোরেশন, ওয়ালটন প্লাজা ও এএসবিএস কার্ড পাচ্ছে।
আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮২-এর ওপর ভিত্তি করেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর আদায় করে থাকে। কিন্তু দেশের মানুষের মধ্যে এনবিআরকে নিয়ে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। ভীতির সঙ্গে অজ্ঞতাও রয়েছে। ফলে রাজস্ব খাতে আমূল পরিবর্তন আনতেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২০১০ সাল থেকে দেশে আয়কর মেলার আয়োজন করে আসছে। আর চাকরিজীবী-ব্যবসায়ী বিভিন্ন সংস্থার দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আয়কর রিটার্ন দাখিলে শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়। এরপর আয়কর দিতে চাইলে জরিমানা গুনতে হয় করদাতাদের।

সদস্য, ঢাকা কর আইনজীবী সমিতি
[email protected]