প্রচ্ছদ শেষ পাতা

করদাতার তথ্য গোপন থাকছে না

রহমত রহমান: আয়করদাতার তথ্য খুবই গোপনীয় ও স্পর্শকাতর বিষয়। করদাতার তথ্য চাইলেই প্রকাশ করা যায় না। তথ্য প্রকাশ পেলে করদাতা যেমন বিপদে পড়ে, তেমনি নতুন করদাতারা কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হয়। করজাল সম্প্রসারণে সমস্যা তৈরি হয়। আয়কর আইন ১৯৮৪-এর ১৬৩ ধারা অনুযায়ী করদাতার সব তথ্য গোপন রাখতে বাধ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতসহ যেসব দেশ আয়করের ক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তারাও একই চর্চা করে। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে সরকার চাইলে যেকোনো করদাতার কর-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য নিতে পারে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তাতে করদাতার তথ্য গোপন থাকছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রমতে, করদাতাদের কর বিবরণী, রিটার্ন ও ব্যাংকের তথ্যসহ যাবতীয় তথ্য অবাধে পেতে আইন করতে যাচ্ছে দুদক। আগে যদিও আইন অনুযায়ী যেকোনো করদাতার তথ্য এনবিআর থেকে নিতে পারত দুদক। সেটা যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করার সময় ‘কর ফাইল জব্দ’ করে নিয়ে যেত। কিন্তু দুদকের আইন সংশোধন করা হলে যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে তথ্য দিতে এনবিআর বাধ্য থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদকের কাছে প্রতিনিয়ত শত শত অভিযোগ জমা পড়ে। বেশিরভাগই অনুসন্ধান বা তদন্ত করা হয়। দোষী প্রমাণিত হলেই কেবল মামলা করা হয়, যা খুব বেশি নয়। তবে এনবিআর বলছে, সংশোধিত আইন অনুযায়ী দুদকের অবাধে তথ্য চাওয়ার ফলে করদাতার কোনো তথ্য গোপন থাকবে না। করদাতাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হবে। নতুন করদাতারা কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হবে। এছাড়া সরকারের ‘কর না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণ’ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। দুদক বলছে, অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করা দুর্নীতিবাজরা ছাড়া সৎ করদাতারা এ আইনকে সাধুবাদ জানাবে। অপরদিকে আবার সংশোধিত আইনে এনবিআর কর্মকর্তারা তথ্য না দিলে বা সময়ক্ষেপণ করলে, তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদক মামলা করলে তিন বছর পর্যন্ত জেলও হতে পারে। এ নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র জানায়, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে দুদক। আইনটি বর্তমানে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। আইনের বিধি ২০-এর (ঈ) উপবিধি (৩) ও উপবিধি (৪) সংযোজন নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘অনুসন্ধান বা তদন্ত কার্যে নিয়োজিত কমিশনের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা আবশ্যক বোধ করিলে ব্যাংকার্স বুকস (ব্যাংক আইন, ১৮৯১-এ সংজ্ঞায়িত) বা আয়কর অফিস হইতে আয়কর রিটার্ন, বিবরণী, হিসাব, প্রমাণ, অ্যাসেসমেন্ট নথি, দলিলাদি কমিশন আইন ও এই বিধিমালার বিধান মোতাবেক উদ্ঘাটন বা পরীক্ষা বা জব্দ বা উহার অনুলিপি তলব করিবার ক্ষেত্রে অন্য কোনো আইনের কোনো বিধান কোনো বাধা হইবে না।’
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে আমরা বলেছি, আয়কর আইনের ব্যত্যয় করা যাবে না। অনুসন্ধান পর্যায়ে কোনো করদাতার তথ্য চাইলে দেওয়ার এখতিয়ারও নেই। দুদকের কাছে কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অনুসন্ধান বা তদন্ত করবে। মামলা হচ্ছে বা হয়েছে সে সময় তথ্য চাইলে আমরা আগের মতোই দেব। ঢালাওভাবে তথ্য দেওয়ার বিধান নেই।’
গত ২৩ এপ্রিল আইন মন্ত্রণালয়ে এনবিআর ও দুদকের কর্মকর্তাদের নিয়ে আইন সংশোধন বিষয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, আইন সংশোধন হলে অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সহজে আইনের আওতায় আনা যাবে বলে দাবি করেন দুদক কর্মকর্তারা। করদাতাকে হয়রানি করা আইন সংশোধনের উদ্দেশ্য নয়। তবে এনবিআর কর্মকর্তারা আয়কর আইন তুলে ধরে জানান, আইন সংশোধন করা হলে নিয়মিত ও সৎ করদাতারা ভয়ে থাকবে। আইন অনুযায়ী করদাতার সব তথ্য আমাদের কাছে সুরক্ষিত থাকে বলে করদাতারা মনে করে। এছাড়া ব্যাংকের তথ্য এনবিআর দিতে বাধ্য নয়। আইন সংশোধন করা হলে ব্যাংকের তথ্যও বেহাত হতে পারে। এতে ব্যাংকের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে দাবি করা হয়।

এ বিষয়ে এফবিসিআই’র সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, যেকোনো দেশে করদাতার যাবতীয় তথ্য আইন অনুযায়ী গোপন রাখা হয়। আমাদের দেশেও তা-ই হচ্ছে। কিন্তু দুদক অবাধে তথ্য চাইলে করদাতারা কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হবে। এমনিতে আমাদের দেশে করদাতার সংখ্যা কম, করজাল সম্প্রসারিত হচ্ছে না। কেউ দোষী হলে তার বিরুদ্ধে মামলা করবে। ঢালাওভাবে সবার ফাইল চাইলে তো তথ্য বেহাত হবে।
এ বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মাইদুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘তথ্য উš§ুক্ত হবে না। আমরা এখন যেভাবে তথ্য পাচ্ছি সেভাবে পাব। আইনের বিধিতে স্পষ্ট না থাকা সত্ত্বেও আমরা ব্যাখ্যা দিয়ে এখন তথ্য পাচ্ছি। বিধিতে সংশোধিত হলে ব্যাখ্যার আর দরকার হবে না, বিধিতে তথ্য পাওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার থাকবে। বিধি সংশোধন করে আমরা তো অন্যকে তথ্য দিতে বলিনি, দুদকে দিতে বলেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এতে নতুনত্বের কিছুই নেই। আয়কর আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে যে কথা বলা হচ্ছে তাও সঠিক নয়, সম্পূর্ণ ভুল। আয়কর আইনের যে অংশে কনফিডেনশিয়ালিটির কথা বলা আছে, সে জায়গায় বলা আছে, অপরাধের তদন্তের ক্ষেত্রে এ কনফিডেনশিয়ালিটি থাকবে না। যারা তদন্ত করবে তাদের তদন্তের স্বার্থে তথ্য সরবরাহ করতে হবে। এটা আয়কর আইনের মধ্যে আছে, আমরা তা দুদকের বিধিতে সংযোজন করছি।’ তিনি বলেন, ‘যে করদাতার মধ্যে কোনো সমস্যা বা অপরাধ নেই, তার তো ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। অপরাধের উদ্ঘাটন করতে গেলে তো তথ্য দিতেই হবে। সংশ্লিষ্ট সবাই তথ্য না দিলে তো দুদক কাজ করতে পারবে না। দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হবে না।’

সর্বশেষ..



/* ]]> */