‘করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কোম্পানি সচিব প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানি সচিব হাবিবুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

হাবিবুর রহমান প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানি সচিব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। পরে দেশ ও দেশের বাইরে ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিংসহ বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করেন

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

হাবিবুর রহমান: ১৯৮৭ সালে জনতা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে জুনিয়র অফিসার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করি। পরে পদোন্নতি পেয়ে অ্যাসিসট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ওই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১১ বছর কাজ করার পর ১৯৯৮ সালে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে ২০০০ সালে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে যোগ দিই কোম্পানি সচিব হিসেবে। ওই প্রতিষ্ঠানে দেড় বছর কাজ করার পর ২০০১ সালে কোম্পানি সচিব হিসেবে প্রাইম লাইফ ইন্স্যুরেন্সে যোগ দিই। প্রতিষ্ঠানটি ২০০২ সালের এপ্রিলে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডে রূপান্তর করা হয়।

শেয়ার বিজ: আপনার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাঠককে কীভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন?

হাবিবুর রহমান: বিমা খাতের কোম্পানি প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড ইসলামি শরিয়াহ্্ভিত্তিক জীবন বিমা প্রতিষ্ঠান। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০০২ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি বিমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড নামে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ২০০৭ সালে দেশের উভয় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা ও পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে আইএসও ৯০০১:২০০৮ সনদ লাভ করেছে। ক্রেডিট রেটিংয়ে ‘এ প্লাস’ মান অর্জন করেছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে ২৩টি পরিকল্প রয়েছে। পলিসি হোল্ডারের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখের ওপরে। পলিসির মূল টাকা ও

মুনাফা সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত। দ্রুত দাবি নিষ্পত্তিই বিমা কোম্পানির সফলতার অন্যতম প্রধান বিষয়, যা আমাদের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি। বিমাগ্রহীতার মৃত্যু হলে নমিনি

বিমাসংক্রান্ত মূল কাগজপত্র দাখিল করার এক মাসের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ও বাকি ২০ শতাংশ ন্যূনতম তিন মাসের মধ্যে আমরা পরিশোধ করে থাকি। জীবন বিমা পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হলে সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে লাভসহ মূল টাকা পরিশোধ করা হয়। আমরা শতভাগ ইসলামি শরিয়াহ্ পরিপালন করে থাকি। কিছু অসাধু বিমা ব্যবসায়ীর জন্য দেশের পুরো বিমা খাতের ওপর মানুষের একটা নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। আমরা সততা, স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেবার মাধ্যমে বিমা সম্পর্কে মানুষের এই নেতিবাচক ধারণার পরিবর্তন করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছি।

প্রতিষ্ঠানের সফলতার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে স্বীকৃতিস্বরূপ অনেকবার পুরস্কৃত হয়েছি। আমরা প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছি। তাছাড়া সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক দায়িত্ব পালন করছি। সর্বশেষ সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে আমার প্রতিষ্ঠান প্রাইম ইসলামী লাইফকে পাঠকের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।

 শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সচিবের সম্পর্ক কেমন?

হাবিবুর রহমান: সচিব কোম্পানির হৃৎপিণ্ড। তিনি পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং অন্য স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। অতএব, কোম্পানি সচিবের সঙ্গে কোম্পানির সম্পর্ক নিবিড়।

 শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে সচিবের ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই

হাবিবুর রহমান: কোম্পানি সচিবের পদটি সাংবিধানিক। সচিব যাবতীয় বিধি ও নীতিমালা পালনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন এবং পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করেন।

কোম্পানি ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিধিমালা পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বিধায় কোম্পানি সচিবের পদটি অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সচিব যদি সঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তবে প্রতিষ্ঠানে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সচিব প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন।

 শেয়ার বিজ: কোম্পানি সচিবের জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

হাবিবুর রহমান: কোম্পানি সচিব একটি চ্যালেঞ্জিং পদ। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধানের মধ্য দিয়ে চলতে হয়। একই সঙ্গে এ-সংক্রান্ত নানা ধরনের কমপ্লায়েন্সের দায়িত্ব তাকে পালন করতে হয়। সিকিউরিটিজ আইন, বিমা আইন ও বিধিমালা এবং জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ ও ফার্মসের যাবতীয় রিটার্নসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিপালনের দায়িত্ব কোম্পানি সচিবের ওপর ন্যস্ত বিধায় পদটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে আপনার পরামর্শ

হাবিবুর রহমান: মধুর ও আন্তরিক ব্যবহারের পাশাপাশি ধৈর্য ও সহনশীলতাই পারে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করতে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমস্যা জানতে হবে, বুঝতে হবে ও প্রয়োজনে সমাধানের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। কারও মনে আঘাত দিয়ে কথা বলা যাবে না। অন্যকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শুনতে হবে। কাউকে ছোট করা বা ভাবা যাবে না। কর্মক্ষেত্রে সবাইকে সমান মনে করে কাজ করতে হবে। সবাইকে এক পরিবারের সদস্য মনে করতে হবে। বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে আপনার প্রতি সবাই সন্তুষ্ট হবে। প্রশাসনিক ব্যাকরণে ‘অরগানাইজেশনাল বিহেভিয়ার’ বলে একটা কথা আছে যার মূলমন্ত্র হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাঝে সুসম্পর্ক তৈরি করা এবং তা বজায় রাখা। উপরোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলেই সবার আস্থা অর্জন সম্ভব।

 শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে কোম্পানি সচিবকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

হাবিবুর রহমান: খুবই সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল একটি পেশা। প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ এটি। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে এ পেশায়। তাছাড়া এ পেশার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে সেবা করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। কোম্পানি সচিবের ওপর ওই কোম্পানির উন্নতি ও অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করে ভেবে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন

হাবিবুর রহমান: কোম্পানি সচিব হিসেবে যদি কেউ কর্মজীবন গড়তে চান, তবে তাকে সাধুবাদ জানাই। পেশা হিসেবে কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব অনেক। ধরুন, কেউ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের সচিব। তিনি সুষ্ঠুভাবে প্রতিষ্ঠানের নানা কার্যক্রম সঠিক সময়ে শেষ করতে পারলে সুনাম অর্জন করবেন; অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সুনজরে থাকবেন। যে কোম্পানিতে চাকরি করবেন, সে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে। সততা, নিষ্ঠা, ধৈর্য, পরিশ্রম ও ভালো লেখাপড়া এ পেশার মৌলিক বিষয়।

 শেয়ার বিজ: সফল কোম্পানি সচিব হতে হলে আপনার পরামর্শ কী?

হাবিবুর রহমান: কোম্পানি সচিবকে সৎ, সদালাপী ও কর্মঠ হতে হবে। তার চরিত্রে বিনয় ও শিষ্টাচার থাকতে হবে। বিষয়ভিত্তিক সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি। সব সব ঘটনাকে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া ও সময়ের কাজ সময়ে শেষ করতে হবে। সফল হওয়ার ইচ্ছা থাকতে হবে। ইচ্ছা থাকলে উপায় বের হবেই। জানার আগ্রহ থাকতে হবে। রেগুলেটরি অথরিটিগুলোর যাবতীয় আইন ও বিধিবিধান জানতে হবে এবং তা যথাসময়ে পালন করতে হবে।