কর্মজীবন তাকে বাঁচিয়ে রাখবে অনেক দিন

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও মুক্তিযোদ্ধা টিকে গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবু তৈয়ব শনিবার প্রয়াত হয়েছেন। তার মৃত্যুতে অন্যতম বৃহৎ শিল্প গ্রুপটি শুধু নয়, দেশ হারিয়েছে একজন সুযোগ্য ব্যবসায়ীকে। আমরা তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। যদিও স্বজন হারানোর বেদনা কোনো সান্ত¡নাতেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়, তবু প্রত্যাশা পরিবারের সদস্যরা তার কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার মাধ্যমে শোককে করে তুলবেন শক্তি। এতে তার কর্ম স্থায়িত্ব লাভের পাশাপাশি স্মৃতিও সমুজ্জ্বল হবে। প্রতিষ্ঠাতার পরলোকগমনের পর অনেক বিজনেস গ্রুপকে দেখা যায় নেতৃত্ব সংকটে পড়তে। এর প্রভাব পড়ে তাদের ব্যবসায়। এতে প্রতিষ্ঠান শুধু নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হন নিয়োজিত কর্মী ও তাদের পরিবার। সামগ্রিকভাবে এর প্রভাব পড়ে ওই প্রতিষ্ঠান-উৎপাদিত পণ্যের বাজার ও অর্থনীতিতে। টিকে গ্রুপের ক্ষেত্রে এমনটি যাতে না হয়, সে ব্যাপারেও তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সতর্কতা আমরা প্রত্যাশা করি।

প্রয়াত মোহাম্মদ আবু তৈয়ব সহোদর আবুল কালামকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা শুরু করেন ১৯৭২ সালে। সময়ের সঙ্গে তাদের গ্রুপে গড়ে ওঠে প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এ গ্রুপের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্রে অর্জন করেছে পরিচিতি ও খ্যাতি। তাদের উৎপাদিত পণ্য সমাদৃত হচ্ছে মানুষের কাছে। বাংলাদেশে এমন উদাহরণ কম চোখে পড়ে। ব্যবসায়িক সততা ও মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের কারণেই যে মানুষের আস্থা অর্জন তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের প্রয়াণের পর এটি ধরে রাখার দায়িত্ব থাকবে গ্রুপটিকে যারা নেতৃত্ব দেবেন, তাদের ওপর। আমরা আশা করব, এ লক্ষ্যে পরিচালনার দায়িত্ব সব সময় দেওয়া হবে যোগ্যতম ব্যক্তিকে।

মোহাম্মদ আবু তৈয়ব এমন সময় প্রয়াত হলেন যখন ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যে টিকে গ্রুপ কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপন করতে যাচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) টার্মিনাল এবং জ্বালানি তেল ও গ্যাসের উপজাত থেকে প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কাঁচামাল উৎপাদনের কারখানা। আশা করা হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম শিল্প প্রতিষ্ঠান এতে অংশগ্রহণ করবে সহযোগী হিসেবে। এ দুই প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। শুধু সংশ্লিষ্ট পণ্যের ব্যবসার দিক বিবেচনায় নয়, এ অঙ্কের বিনিয়োগ আমাদের অর্থনীতির জন্য সুসংবাদ। আশা করি, গ্রুপটির পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও পাওয়া যাবে।

টিকে গ্রুপের একক মালিকানা ও অংশীদারিত্বে থাকা ৫০টি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ঠিক কত কর্মী নিয়োজিত, আমরা জানি না। তবে ধারণা করা যায়, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও গ্রুপটি রেখে চলেছে বড় ভূমিকা। গ্রুপটি এমন সময় যাত্রা করে যখন দেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র। এরপর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে ‘বিস্ময়কর উদাহরণে’ পরিণত হয়েছে আমাদের অর্থনীতি। এতে বেসরকারি খাত থেকে টিকে গ্রুপ যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে, সেটা অনস্বীকার্য। বলা চলে, মুক্তিযোদ্ধা আবু তৈয়ব এ দেশের অর্থনীতি গঠনেও পালন করেছেন যোদ্ধার ভূমিকা। ভোগ্যপণ্যসহ যেসব ব্যবসায় তিনি হাত দিয়েছেন, সঙ্গত কারণেই এর ভোক্তারা তাকে মনে রাখবেন। সফল ব্যবসায়ী ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে বিভিন্ন সমাজসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে আরও নানা অবদান তিনি রেখে গেছেন। তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনুপ্রেরণা হয়ে। বর্তমানে ব্যবসায় যারা নিয়োজিত, তাদের জন্য তিনি অনুসরণীয়। মৃত্যুর পর কর্মই কেবল পারে ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে। টিকে গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবু তৈয়ব যে কর্মজীবন রেখে গেলেন, সেটা তাকে আরও অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখবে।