কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিসিএস চাই

শরীফুর রহমান আদিল: বাংলাদেশে পেশা হিসেবে শিক্ষকতা অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটিকে সবচেয়ে সম্মানজনক পেশা হিসেবেও মনে করা হয়। কিন্তু শিক্ষা নিয়ে সরকারের স্বচ্ছ বা নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা না থাকায় এ পেশাটি সর্ববৃহৎ ও খামখেয়ালি পেশায় রূপান্তরিত হয়েছে। তবে এ পেশার লোকদের, অর্থাৎ শিক্ষকদের বেতন-ভাতায় অসংগতি থাকায় তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত। এখানে কেউ সরকারি তথা বিসিএস দিয়ে নিয়োগ পাওয়া, কেউ আবার এমপিওভুক্ত, কেউ নন-এমপিওভুক্ত, এমপিও হওয়ার আশায় প্রহর গুনছেন, আবার কেউ বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা, কোম্পানি, ট্রাস্ট কিংবা প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছেন। ফলে বিভিন্ন সংগঠনের উৎপত্তি হয়েছে আর এসব সংগঠন সরকারের কাছে একেক সময় একেক দাবি নিয়ে হাজির হচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের বিভিন্ন দাবিনামা নিয়ে রাজপথে বিক্ষোভ- সমাবেশ, অনশন, ঘেরাও কর্মসূচি লক্ষ্য করা গেছে। তাদের একটি সংগঠন চাচ্ছে সদ্য আত্তীকরণ হওয়া কলেজগুলোর শিক্ষকরা ক্যাডারভুক্ত হোন; আবার বিসিএস শিক্ষা সমিতির পক্ষ থেকে সেøাগান জারি করা হয়েছে নো বিসিএস, নো ক্যাডার! অর্থাৎ তারা বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে আত্তীকৃত কলেজ শিক্ষকদের তাদের সমপর্যায়ে নিতে চায় না। আরেকটি গ্রুপ চাচ্ছে বিদ্যমান সব এমপিওভুক্ত কলেজকে জাতীয়করণ করা হোক। আরেকটি গ্রুপ চাচ্ছে ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করা হোক। ইবতেদায়ী মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষক সংগঠনগুলো চাচ্ছে তাদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলের মতো সব সুযোগ-সুবিধা দিক। আবার অনার্স-মাস্টার্স পাঠদানকারী সব শিক্ষকই বর্তমানে ননএমপিও। তারা চাচ্ছেন সব শিক্ষককে এমপিওভুক্তের আওতায় নিয়ে আসা হোক। সর্বশেষ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা কলেজেই যেতে পারেন না অন্য শিক্ষকরা তাদের শিক্ষক হিসেবে মনে করেন না বলে; অর্থাৎ তাদের প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকার থেকে কোনো ভাতা না পাওয়ায় তারাও সরকারের কাছে এর প্রতিকার চান। এখানে বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় কি ধরনের অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা কিংবা অরাজকতা বিরাজ করছে। এমন পরিবেশের মূলে রয়েছে আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা। মূলত সরকারের শিক্ষা নিয়ে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় বিষয়টি আজকের পর্যায়ে এসে গেছে। সরকার তার দেশের নাগরিকদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করবে এবং সরকারই শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন পলিসি তার মতো করে বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু ব্যক্তি তার মান ও সুনামের জন্য বা রাজনৈতিক কারণে কিংবা শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে ব্যবহারের নিমিত্তে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যাপকহারে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়ার সময় সরকারি যে বিধি রয়েছে, তা আমলে নেওয়া হয়নি। হলফ করেই বলতে পারি, সরকারি নীতিমালা মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়া হলে তার সংখ্যা আজকের সংখ্যার চেয়ে অর্ধেক থাকত; এমনকি সরকারের আর্থিক জোগান অর্ধেকের চেয়ে কমে আসত। একই সঙ্গে শিক্ষা নিয়ে যে অব্যবস্থাপনা কিংবা অরাজকতা আজকে বিদ্যমান, তা কখনোই সৃষ্টি হতো না। এই অস্থিতিশীল পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন করে। সেখানে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল গঠনের প্রস্তাবনা দিয়ে এ অস্থিতিশীল পরিবেশের সাময়িক সমাধানের চেষ্টা করা হয়; কিন্তু বিসিএস ক্যাডারদের আপত্তিতে এটা এখনও আলোর মুখ দেখেনি। তাদের যুক্তিÑবিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা সরকারি চাকরিজীবীদের মতোই যখন যে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে, তখন সেই আলোকে তারাও তা গ্রহণ করবেন। এখানে শিক্ষকদের পৃথক বেতন স্কেল করা হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে বিসিএস শিক্ষকরা একীভূত হতে চান না। সরকার পরে শিক্ষার মানোন্নয়নে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কম খরচে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগের লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি স্কুল ও কলেজ জাতীয়করণের কর্মসূচি ঘোষণা করে। এতে প্রায় ২৮৫টি কলেজ জাতীয়করণের জন্য মনোনীত করা হয় এবং নিয়ম অনুসারে জাতীয়করণকৃত এসব শিক্ষক শিক্ষা ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু সরকারি এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার সমিতি। তাদের দাবি, দেশে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি কলেজ রয়েছে; কিন্তু সরকার ঘোষিত ২৮৫ কলেজকে জাতীয়করণ করা হলে তাতে কেবল পাঁচ-সাত শতাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপকৃত হবেন। আর কেবল পাঁচ-সাত শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে এলে কী ধরনের ফল আসবেÑতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সর্বমহলে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকার জাতীয়করণের জন্য যে তালিকা প্রণয়ন করেছেÑতা নিয়ে। কোনো নীতিমালা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো যোগ্যতা ছাড়াই কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় কলেজগুলোকে জাতীয়করণের জন্য মনোনীত করায় তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগÑএকই যোগ্যতায়, একই মানদণ্ডে প্রত্যেক কলেজে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও কেন কেবল উপজেলা সদরে অবস্থানের কারণে এসব কলেজ জাতীয়করণ করা হচ্ছে? এর দ্বারা কি সমতা, ন্যায্যতা কিংবা নৈতিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান হলো না? এমনও রয়েছে, যেসব কলেজ জাতীয়করণ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশ শিক্ষকের ক্যাডার কিংবা ননক্যাডার হওয়ার ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতাও নেই। তবে তাদের বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত নেবে সরকার? অন্যভাবে বলা চলেÑজাতীয়করণের জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া এসব কলেজ শিক্ষকের চেয়ে অন্য কলেজ শিক্ষকদের পারদর্শিতা কিংবা যোগ্যতা আরও বেশি। তবে কেন এসব যোগ্য শিক্ষককে অবমূল্যায়ন করে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা হবে?
বিসিএস শিক্ষক সমিতি ইতোমধ্যে ‘নো বিসিএস নো ক্যাডার’ সেøাগান ধরেছে। তাদের এ সেøাগান একেবারে অযৌক্তিকÑতা নয়। বরং মর্যাদার স্বার্থে তাদের সেই সেøাগান অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। সরকার নীতিমালা ছাড়া কেবল উপজেলা সদরের অবস্থানকে চিহ্নিত করে জাতীয়করণের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে করে অযোগ্য শিক্ষকরা বিসিএস শিক্ষা সমিতিতে ঢুকে পড়লে পরবর্তীকালে বিভিন্ন অপেশাদারি ও বিব্রতকর কার্যক্রম চোখে পড়তে পারে, তাই বিসিএস শিক্ষা সমিতি এদের ক্যাডারভুক্ত না করে ননক্যাডার হিসেবে ঘোষণার জোর দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে আত্তীকৃত কলেজগুলোয় বিসিএসের মাধ্যমে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আবার ওইসব জাতীয়করণকৃত কলেজের শিক্ষকরা বদলির সুযোগ পাবেন না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কেবল জাতীয়করণ বিষয়টি নিয়েই চারটি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে: এক. বিসিএস শিক্ষা সমিতির সেøাগান। দুই. আত্তীকরণকৃত শিক্ষকরা ক্যাডারভুক্ত হওয়ার বিভিন্ন যুক্তি। তিন. একই প্রতিষ্ঠানে বদলির সুযোগ পাওয়া-না পাওয়ার বৈষম্য, ক্যাডার, ননক্যাডার সমস্যা। চার. জাতীয়করণের জন্য মনোনীত না হওয়া দেশের ৯৫ শতাংশ শিক্ষকের দাবি সমগ্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আন্দোলন।
উপরোক্ত চার সমস্যা সমাধানের জন্য একটি বিসিএসই যথেষ্ট। যার নাম হতে পারে ‘বিসিএস ফর একজিসটেন্স টিচার’। অর্থাৎ বিদ্যমান শিক্ষকদের জন্য বিসিএস। ফলে সবাইকে একই বৃত্তে এনে সমতা সৃষ্টি করতে জাতীয়করণ নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ জš§াবে, এমনকি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আন্দোলন প্রশমিত করতে, সর্বোপরি নো বিসিএস নো ক্যাডার সেøাগান জয় করতে হলে দেশের বিভিন্ন কলেজে কর্মরত শিক্ষকদের নিয়ে একটি বিসিএসের আয়োজন করলে উপরোক্ত সব সংকট দূর করা সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে যাবে। যার রূপরেখাটা হবেÑজাতীয়করণের অপেক্ষায় থাকা ২৮৩ কলেজসহ আরও ২০-২৫ কলেজকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে এসে সেসব কলেজের মোট বিষয় ও পদসংখ্যা নির্ধারণ করে দেশের এমপিওভুক্ত-ননএমপিওভুক্ত কর্মরত শিক্ষকদের বিসিএসে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া। একই সঙ্গে নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হওয়ার দু-তিন বছর পর যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা অনুসারে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক প্রভৃতিতে সরকারি বিদ্যমান নিয়ম অনুসারে পদোন্নতি দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে দেশের সরকারি কলেজগুলোর জন্য একই নীতিমালা প্রণীত হওয়ার সুযোগ পাবে। তবে যারা এই বিসিএসে আসার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন না কিংবা পাস করবেন না, তারা বর্তমানে তাদের অবস্থানে বহাল থাকবেন। তবে শিক্ষক এমপিওভুক্ত হলে নিয়মে তাদের কর্মজীবন অতিবাহিত করবেন। সেক্ষেত্রে কারও কোনো ক্ষোভ থাকবে বলে মনে হয় না।

প্রভাষক, দর্শন বিভাগ
ফেনী সাউথ-ইস্ট ডিগ্রি কলেজ

[email protected]