কর্মসংস্থানের খবর খারাপ কর্মমুখী শিক্ষারও

 

. আর এম দেবনাথ: ব্যক্তিগত আলোচনায় সবারই এক কথা: কাজের লোক পাওয়া যায় না। গৃহিণীদের অভিযোগ‘বুয়া’র বড় অভাব। তারা অনিয়মিত আসে-যায়। কিছুই করার থাকে না। যারা গ্রামে থাকেন, তারা বলেন কৃষিশ্রমিকের খুব অভাব। অন্য শ্রমিকের অবস্থাও তা-ই। বাধ্য হয়ে তারা কৃষির যন্ত্রায়ন করছেন। এতে শ্রমিকের দাপট কিছুটা কমেছে। কৃষিকাজে খরচও বেশ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। শহরের লোকেরাও একই কথা বলেন। তারা বলেন একটু দক্ষ শ্রমিকের কথা, কর্মজীবীর কথা। এই শ্রেণির লোকেরও অভাব। প্লাম্বার, কাঠমিস্ত্রি, অ্যালুমিনিয়াম মিস্ত্রি, বিদ্যুৎ মিস্ত্রির বড় অভাব। তারা কোথাও স্থির থাকেন না। আজ এখানে, কাল সেখানে। অনেকে চলে যায় বিদেশে। যারা অফিস পরিচালনা করেন, তারাও লোক পান না। ইংরেজি জানা লোক পাওয়া যায় না। হিসাব জানা লোক পাওয়া যায় না। বিপণন জানা লোক পাওয়া যায় না। সর্বত্রই এক কথা লোকের অভাব। এ মুহূর্তে তো বলা হবে আরও বেশি। এখন বোরো ফসল ওঠার সময়। অনেক জায়গায় কৃষকরা ধান তুলতে শুরু করেছেন। নেত্রকোনা ও ভাটি অঞ্চলের খবর, এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। অতএব এখন কৃষিশ্রমিকের অভাব হবে অকল্পনীয়। যন্ত্র ব্যবহার করা হবে সেই যন্ত্রও সময়মতো পাওয়া যাবে না। চাহিদা প্রচুর। এমনিতেই শ্রমিক পাওয়া যায় না, মৌসুমের সময় তো আরও।

এই যে চিত্র আঁকলাম, তার সঙ্গে কি সরকারি তথ্যের কোনো মিল আছে? সাধারণভাবে সরকারি তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। শ্রম, শ্রমিক, কাজ প্রভৃতির তথ্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়Ñমানুষ বলছে এক কথা, সরকারি তথ্য বলছে উল্টোটা। সরকারি তথ্য বলছে, দেশে লাখ লাখ লোক বেকার। তাও এমন সংজ্ঞা ধরে, যা শুনলে সবাই হাসবে। কারা কর্মহীন (বেকার) তার সংজ্ঞা দেয় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করলে সেই ব্যক্তি বেকার নন। বলা বাহুল্য, উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশে ঘণ্টার ভিত্তিতে কাজ পাওয়া যায় না। আমাদের হিসাব ‘দৈনিক’। আবার ধরা হয় ১৫ বছরের বেশি বয়সী লোকের হিসাব। এর কম বয়সীরা হিসাবে নেই। অথচ অনেক ক্ষেত্রে আমাদের দেশে শিশুরাই কাজ করে। এটি বাস্তবতা। অথচ ১৫ বছরের কম বয়সীদের হিসাবের মধ্যে আনা হয় না। না এনে বেকারত্বের যে হিসাব পাওয়া যায়, তাতে মাথা বিগড়ে যায়। ‘১৫ বছরের বেশি বয়সী এবং সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে’এমন সংজ্ঞাতেই দেখা যায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে বেকার ছিল ২৬ লাখ ৩০ হাজার কর্মক্ষম লোক। যদি আধা-বেকার ধরা হয়, তাহলে মোট বেকারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১ লাখ ৮০ হাজার। ভাবা যায়! অথচ দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। গত অর্থবছর কর্মসংস্থান হয়েছে ১৩ লাখের। অথচ সেই বছর ‘জব মার্কেটে’ ১৫ বছর-ঊর্ধ্ব লোকবল ঢুকেছে ১৪ লাখ। অর্থাৎ এক বছরেই বেকার এক লাখ। তার সঙ্গে যোগ হবে পুরোনো (ব্যাকলগ) বেকার, যাদের সংখ্যা ২৫ লাখ ৮০ হাজার। এসব তথ্য সরকারের। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস) নামীয় যে সংস্থাটি চলে আমলাদের দ্বারা সংখ্যাতত্ত্ববিদ সেখানে খুব কম। সরকারের একজন উপদেষ্টা এটিকে ‘বামন প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কিছুদিন আগে। এমন প্রতিষ্ঠানই তথ্য দিচ্ছে, দেশে বেকার বাড়ছে। লাখ লাখ লোক বেকার।

তাহলে কী দাঁড়াল? আমরা সবাই বলছি কাজের লোকের অভাব, লোক পাওয়া যায় না, ‘বুয়া’ পাওয়া যায় না, কৃষিশ্রমিক পাওয়া যায় না, হিসাবরক্ষক পাওয়া যায় না; অথচ সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা বলছে, দেশে বেকার লাখ লাখ। এ বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। উন্নয়ন হচ্ছে সাত শতাংশ, সাড়ে সাত শতাংশ হারে। অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে, আমদানি-রফতানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, ব্যাংক-বিমা, লিজিং কোম্পানির সংখ্যা বাড়ছে, মেগা প্রকল্প চারদিকে, অর্থনৈতিক জোন হচ্ছে সারা দেশে, রাস্তাঘাটের উন্নতি হচ্ছে সর্বত্র উন্নয়নের একটা আবহ। মাথাপিছু আয় বাড়ছে। অনেক সামাজিক সূচকে আমাদের অবস্থান ঈর্ষণীয় পর্যায়ে। ক’বছর পরই আমরা উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি পাব। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছি। হাজার হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স দেশে আসছে। অনেক শিল্প বিদেশি শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেও টিকে আছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে পারে, এমন শিল্পগোষ্ঠী দেশে এখন আছে। কৃষিতে হয়েছে অভাবনীয় উন্নতি। না খেয়ে মানুষ মরে না। ‘মন্দা’ শব্দ নির্বাসিত। সারা দেশ এখন ঢাকার সঙ্গে দক্ষভাবে যুক্ত। লাখ লাখ লোক দেশ-বিদেশ করছে। প্রতিবেশী দেশে বেড়াতে গেলেও পাঁচ হাজার ডলার নেওয়া যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগে না। উন্নয়নের এ বিশাল আয়োজনের মধ্যেই, অর্জনের মধ্যেই বড় একটা খারাপ খবর বেকারত্ব।

তবে কি আমরা ‘জবলেস গ্রোথ’ অনুসরণ করছি? জানি না। কিন্তু দুটো উদাহরণ দিই। দুটোই দেশের বড় দুই শিল্প গ্রুপের খবর। একটি বিনিয়োগ করবে ১০ হাজার কোটি টাকা চট্টগ্রামে। কর্মসংস্থান হবে মাত্র ৭০০ জনের। অন্যটি বিনিয়োগ করবে পাঁচটি শিল্পে মোট দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এতে কর্মসংস্থান হবে মাত্র তিন হাজার ৫০০ জনের। দৃশ্যতই এসব শিল্পে শ্রমবিকল্প যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে। ধরা যাক, গার্মেন্টসের কথা। এই ‘সেলাই কারখানা’গুলোতে গত দশ বছর ধরে নতুন কর্মসংস্থানের খবর নেই। বরং খবর আছে ‘রোবট’ স্থাপনের। মালিকরা প্রতিযোগিতার কথা বলে কারখানায় ‘রোবট’ বসাচ্ছেন। দক্ষতা ও উৎপাদন বৃদ্ধিই উদ্দেশ্য। অন্যান্য শিল্পও আধুনিকায়ন করা হচ্ছে বলে সর্বত্র খবর। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ আগের মতো তৈরি হচ্ছে না। বরং বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে চাকরিচ্যুতির ঘটনা। বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘ব্র্যাক’; সেখানে চাকরিচ্যুতি ঘটছে। সেলফোন কোম্পানিগুলোতেও তা-ই; ব্যাংক-বিমা কোম্পানিতেও তা-ই। বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানেও তা-ই। বহু কোম্পানি, তার অনেকগুলোই চট্টগ্রামে সেখানে তারা ব্যবসা থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছে। লোকের চাকরি যাচ্ছে। সাংবাদিকদের মধ্যেও বেকারত্ব অনেক। এসব খবর হচ্ছে সংগঠিত খাতের (অর্গানাইজড সেক্টর)। অসংগঠিত খাত, যেমন কৃষির অবস্থা কী? আগেই উল্লেখ করেছি, কৃষিতে যন্ত্রায়ন হচ্ছে এবং তা সরকার উৎসাহিত করছে। জমি চাষ, সেচ, চারা রোপণ, সার প্রয়োগ, আগাছা দমন, কীটনাশক প্রয়োগ, ফসল কর্তন, ফসল মাড়াই, ফসল ঝাড়াই, ফসল শুকানো এবং গুদামজাতকরণ প্রভৃতি সব কাজেই এখন যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। বস্তুত অর্থনীতির সর্বত্রই যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। কর্মকারের ওজন মেশিন ছিল হাতে তৈরি। এর বিকল্প এখন চীনা ওজন যন্ত্র যাতে ওজন ও মূল্য দুটোই জানা যায়। কামার, কুমার, তাঁতি থেকে শুরু করে সব পেশাজীবীর কাজেই এখন যন্ত্রের ছোঁয়া। টেকনোলজি। এর থেকে আমাদের মুক্তি নেই। এখন মুশকিল হচ্ছেÑটেকনোলজি যদি মানুষকে ‘বাতিল’ ঘোষণা করে, তাহলে এর সমাধান কী হবে?

এমনিতে বাজারে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে তো সন্তুষ্ট থাকার কোনো উপায় নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, ৪০ শতাংশ তরুণ গ্রামাঞ্চলে নিষ্ক্রিয়। তারা লেখাপড়া করে না, কোনো কাজও করে না। যারা রেমিট্যান্স প্রাপক এবং যেসব অঞ্চলের অধিবাসীরা বেশি বেশি বিদেশে গেছে, সেসব অঞ্চলে নানাবিধ উপসর্গ দেখা যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। শিশু-কিশোররা স্কুলে যায় না। তাদের স্বপ্নÑসৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্যে যাবে। ওখানে রোজগার বেশি। কাজেই বাপের জমি-জমা বিক্রি করে তারা দালালের পেছনে ঘুরে। অলস জীবনযাপন করে। রেমিট্যান্স প্রাপকের পরিবারের লোকেরা শ্রমবিমুখ হচ্ছে। তাদের জমি পতিত থাকছে। আবার রেমিট্যান্সের টাকা ‘প্রোডাকটিভ’ কাজে খুব বেশি লাগছে না যেÑকর্মসংস্থান, অধিকতর কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেখা যাচ্ছে, চা শ্রমিকরা তাদের পুরোনো পেশা ছেড়ে কাজের সন্ধানে বাজারে ঢুকছে। কিন্তু কাজ মিলছে কম। নারী শ্রমিকরা এতদিন বেশ এগিয়ে আসছিল। গার্মেন্টস খাতে ‘রোবট’ ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে নারী শ্রমিক নিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। বস্তুত শ্রমিকের অনুপাতে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ হ্রাস পেতে শুরু করেছে। কৃষির কথা তো আগেই বললাম। আবার শিক্ষিত বেকারের সমস্যা ভিন্ন ধরনের। দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো না তৈরি করছে কর্মজীবী, না তৈরি করছে কেরানি। বিবিএ, এমবিএ পাস ছেলেমেয়েরা চাকরির দরখাস্ত পর্যন্ত লিখতে পারে না। এরা প্রকৃতপক্ষে ‘ইন্ডাস্ট্রি’র কোনো কাজে আসছে না। এদের শিক্ষা দেওয়া হয় ‘ওয়ালমার্টের’ সমস্যা! তারা ‘মীনা বাজারের’ সমস্যা জানে না। হিসাবশাস্ত্র, নিরীক্ষাশাস্ত্র, বিপণন, মার্চেন্ডাইজিং প্রভৃতির লোক নেই। ইন্ডাস্ট্রি যা চায়, তা তারা পাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইংরেজি শিক্ষার ভালো ব্যবস্থা নেই। ছেলেমেয়েরা বিজ্ঞান পড়তে চায় না। পড়ে বিবিএ, এমবিএ। অথচ এরা বাণিজ্যের, ব্যবসার কোনো কাজে আসে না। ফলে শ্রমবাজারে তৈরি হচ্ছে এক বিপরীতধর্মী অবস্থা। এই ফাঁকে বহু বিদেশি নাগরিক টেকনিক্যাল কাজ করার জন্য আমাদের শিল্পে স্থান করে নিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এদের লুফেই নিচ্ছে। এ অবস্থায় দেখাই যাচ্ছে, দেশের উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। চীনারা এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তাদের শিল্পকারখানা গ্রামে নিয়ে যাচ্ছে। এ এক নতুন কৌশল। আমরা কি তা ভাবতে পারি?

 

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক