‘কর্মী ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সেতুবন্ধ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার জার্মানিভিত্তিক একটি বহুজাতিক কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ নূর-ই-আলম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মোহাম্মদ নূর-ই-আলম জার্মানিভিত্তিক একটি বহুজাতিক কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। এছাড়া মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নানা ট্রেনিং ও এলএলবি ডিগ্রি নিয়েছেন। বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্টের (বিএসএইচআরএম) সম্মানিত ফেলো ও এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল মেম্বার এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি এইচআর প্রফেশনালসের প্রতিষ্ঠাতা তিনি

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই..

মোহাম্মদ নূরআলম: আমি নিম্নমধ্যবিত্ত শিক্ষক বাবা-মায়ের সন্তান। ছোটবেলা থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার ইচ্ছা ছিল। তখন সরকারি চাকরির সুযোগ-সুবিধা কম ছিল। বাবার অনুপ্রেরণায় স্কুলজীবন পার করে ঢাকা কমার্স কলেজে ভর্তি হই। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ-এমবিএ সম্পন্ন করে ২০০৭ সালে দেশীয় তৈরি পোশাক শিল্পের একটি প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার শুরু করি। এরপর জামিল স্টিল বাংলাদেশ, নকিয়া-সিমেন্স নেটওয়ার্কস বাংলাদেশ, বুরো ভ্যারিতাস সিপিএস বাংলাদেশের মানবসম্পদ বিভাগ ও হামীম গ্রুপের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করি। ২০১৭ সাল থেকে জার্মানিভিত্তিক এ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রধান মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এখানে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবেও ক্লাস নিই।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে কেন বেছে নিলেন?

মোহাম্মদ নূরআলম: মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করি এর প্রতি ভালোবাসা থেকে। আমি সংগঠনপ্রিয় মানুষ। সংগঠনের মূল উপাদান মানুষ। অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালে এলাকার সহপাঠী ও সিনিয়রদের নিয়ে গড়ে তুলি ‘রংধনু’ নামে একটি গ্রন্থাগার। সেই থেকে শুরু আমার সাংগঠনিক পথচলা। কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সময় আমার নেতৃত্বের দিকটি অনেকের নজরে আসে। ফলে কলেজজীবনে দুটি সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ‘বাঁধন’ কবি জসীমউদ্দীন হল ইউনিটের সহসভাপতির দায়িত্ব পাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে কয়েকটি সামাজিক সংগঠনের সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছি। শিক্ষাজীবনে ছিলাম বিতার্কিক। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সহ-শিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য শিশু একাডেমি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, জেলা পরিষদসহ প্রায় ৪০টি পুরস্কার পাই। তাছাড়া ২০০৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান যুব ক্যাম্পে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করি। আজও মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করার সময় মনে হয় সাংগঠনিক দক্ষতা এ বিভাগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সব দিক বিবেচনা করে মনে হয়েছে, আমি একজন এক্সট্রোভার্ট মানুষ, যা মানবসম্পদ বিভাগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই এ পেশায় চলে আসি।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে একজন দক্ষ এইচআরের ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই

মোহাম্মদ নূরআলম: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ এইচআরের ভূমিকা ব্যাপক। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করেন। একজন দক্ষ এইচআর প্রফেশনাল সব সময় কর্মী ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ উভয়ের মধ্যে উইন-উইন অবস্থা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

মোহাম্মদ নূরআলম: পোশাকশিল্পের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার সময় মনে হয়েছে, উৎপাদন সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধানরা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের উদ্যোগ মোটেও পছন্দ করেন না। আবার মজার ব্যাপার হলো, পরবর্তী সময়ে ওই বিভাগের উৎপাদন হ্রাস পেলে, অনুপস্থিতির হার বৃদ্ধি তথা অভ্যন্তরীণ কোনো কোন্দল হলে তারা মানবসম্পদ বিভাগকেই দায়ী করেন। আমার মতে, এইচআর বিজনেস পার্টনার কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করলে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা চর্চা সম্পর্কে কিছু বলুন

মোহাম্মদ নূরআলম: এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের বেশিরভাগ মালিক পক্ষ এইচআর ও অ্যাডমিন বিভাগের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না। তারা মনে করে যা এইচআর, তা-ই অ্যাডমিন। এই ভ্রান্ত ধারণাই মূলত এদেশে এইচআর উন্নয়নের মূল বাধা। তবে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা চর্চার চিত্র ভিন্ন। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব বিষয়ে অনেক সচেতন।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপককে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মোহাম্মদ নূরআলম: পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক অন্য ব্যবস্থাপক থেকে ভিন্ন। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক একাধারে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধিত্ব করেন। অর্থাৎ একজন এইচআর ম্যানেজার একটি প্রতিষ্ঠানে সেবক হিসেবেই ভূমিকা রাখেন।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন

মোহাম্মদ নূরআলম: যদি কেউ মনে করেন, তিনি বিশেষায়িত কোনো বিভাগে পারদর্শী নন বলেই মানবসম্পদ বিভাগে আসতে চাইছেন, অথবা কোথাও ভালো চাকরি পাচ্ছেন না বলে এ বিভাগে আসার চিন্তা করছেন, তবে আমি বলব এমন সিদ্ধান্তই আপনার ভবিষতে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাকে মনে রাখতে হবে, সফল মানবসম্পদ পেশাজীবীকে হিসাববিজ্ঞান, অর্থায়ন, বিজনেস কমিউনিকেশন, মনোবিজ্ঞান, ইংরেজি ভাষাসহ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হতে হয়। সুতরাং এ পেশায় আসতে চাইলে এসব বিষয়ে সম্যক ধারণা নিয়ে আসুন, তাহলে ক্যারিয়ারে আর পিছুটান থাকবে না।

শেয়ার বিজ: সফল মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হতে হলে আপনার পরামর্শ

মোহাম্মদ নূরআলম: সত্যি কথা বলতে, নিজেকে সফল মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক মনে করি না। আমি চারটি বহুজাতিক ও দুটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করে কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এখনও শিখছি। তাছাড়া বাংলাদেশের এইচআর প্রফেশনালদের সর্ববৃহৎ সংগঠন বিএসএইচআরএমের ফেলো ও সর্বকনিষ্ঠ নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে বলতে চাই, সফলতার সূত্র একটাই Sharpen the saw. সব সময় নিজেকে শিক্ষা ও উন্নয়নের মধ্যে রাখতে হবে।