কাঁচা চামড়ার বাজার সিন্ডিকেটমুক্ত হতে আর কত দিন?

শরীফুর রহমান আদিল: গত কয়েক বছরের মতো এবারও কোরবানির চামড়া নিয়ে ব্যসায়ীদের অনৈতিক সিন্ডিকেটের কারণে কোরবানিদাতা ও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত! এবার চামড়ার দাম যথেষ্ট নিম্ন, কোথাও অবিক্রীত, কোথাও বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চামড়ার দাম তিন শতকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে, পানির দামে চামড়া বিক্রি অথবা লোকসান দিয়ে আড়তদারদের কাছে বিক্রি সবই আজকের বাংলাদেশের বিভিন্ন মিডিয়ার শিরোনাম। কেননা, এ বছর কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে ট্যানারি মালিকরা যে হোলি খেলায় মেতে উঠেছেন, তাতে কারোই মন ভালো থাকার কথা নয়। ৯ আগস্ট চামড়াশিল্প মালিক ও সরকার যৌথভাবে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়, যেখানে গরুর চামড়া ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৪৫-৫০ টাকা, আর ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০; খাসির চামড়া ১৮-২০ ও বকরির ১৩-১৫ টাকা। আর এ ঘোষণা দিলেও ফড়িয়ারা অনেকে চামড়া কিনেছেন ঘোষণাকৃত দামের চেয়েও অনেক কম দামে; আবার তাদের থেকে আড়তদার আর আড়তদার থেকে মালিকরা ওইসব চামড়া কিনেছেন আরও কম দামে! আবার কারও কারও চামড়া রয়ে গেছে অবিক্রীত অবস্থায়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, ফকির, গরিব- মিসকিনসহ অন্যান্য দাতব্য প্রতিষ্ঠান।
অযৌক্তিক কারণ আর নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য কোরবানির পশুর দরপতন ঘটানো হয়েছে। ফলে মনে প্রশ্ন জাগে: আমরা কি শেষ পর্যন্ত ফকির, মিসকিন, এতিম কিংবা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের টাকা আত্মসাতের জন্য লোলুপ চোখে তাকাচ্ছি? কারণ তারাই কোরবানির পশুর চামড়া থেকে সাহায্য পেয়ে থাকে। যদিও বিষয়টি নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করেনি। আর যাদের এই টাকা পাওয়ার কথা, তারা তো সহজ-সরল ও নিরীহ; তাদের প্রতিবাদ করার কোনো পথ নেই। চামড়ার বাজারের এই দরপতনের জন্য ব্যবসায়ীরা দোষ চাপালেন অন্যের ঘাড়ে। আর তাই তারা তিনটি কারণকে চিহ্নিত করেন যথা: আন্তর্জাতিক বাজরে চামড়ার মূল্যের দরপতন, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ, আগে সংগ্রহ করা চামড়া অবিক্রীত থেকে যাওয়া। তবে এবার বিসিক দেশে লবণের কোনো ঘাটতি নেই বলে আগেই সংবাদ সম্মেলন করায় লবণের বাড়তি দামের অজুহাত দাঁড় করাতে পারেনি। তা না হলে অন্যবারের মতো এবারও হয়তো তারা এরকম অজুহাত দাঁড় করাত।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে চামড়ার সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ২০১৩ সালে। সেবার প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯০ টাকা। ২০১২ সালে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রফতানি করে অর্জিত হয়েছে মাত্র ৫৮ কোটি ডলার! আর এই রফতানি হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা ২০১৩ সালে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছিলেন ৯০ টাকা। অথচ ২০১৭ সালে চামড়া রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১২৩ কোটি ডলার! এরপরও এ বছর ব্যবসায়ীরা চামড়া অবিক্রীত কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দরপতনের কথা বলে দাম কমিয়ে নির্ধারণ করেছে। অথচ রফতানি ব্যুরোর দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জুলাই থেকে নভেম্বরে চামড়া রফতানিতে আয় হয়েছে ২৩ কোটি ১৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ বেশি। আর পূর্বের অর্থবছরে একই সময়ের তুলনায় এ খাতে আট দশমিক ৫৫ শতাংশ আয় বেড়েছে। এবারের চামড়ার দাম গত তিন দশক থেকেও নিম্ন! ১৯৮৯ সালে চামড়ার দাম সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে ছিল। সে বছর যে চামড়া কিনতে হয়েছিল ৭০০ টাকায়, ওই মানের চেয়েও আরও ভালো মানের চামড়া ফড়িয়ারা এবার কিনেছেন মাত্র ৪০০ বা তারও কম দামে! এ থেকে সহজেই অনুমান করতে পারি, চামড়া নিয়ে ব্যবসায়ীরা কী ধরনের অনৈতিক সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন।
এ বছর চামড়ার দামে ধসের কারণ হিসেবে ট্যানারি শিল্পমালিকরা চীন-আমেরিকা বাণিজ্যযুদ্ধের কথা বলে সিন্ডিকেটকে বৈধ করার প্রয়াস চালান। তাদের মতে, বাংলাদেশের বড় বাজার হলো চীন; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে, তাই তারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অথচ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ইতালি ও জাপান। যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম কমার অন্যতম কারণ হিসেবে গত বছরের ৪০ শতাংশ চামড়া রয়ে যাওয়ার কথা বলেন; অথচ এবার তাদের চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সোয়া পঁচ লাখ, যা গতবারের তুলনায় অনেক বেশি। প্রশ্ন হলো, যদি চামড়া অবিক্রীত অবস্থায় রয়ে যায়, তবে চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াবে কেন?
চামড়ার এই সিন্ডিকেটের জন্য দেশের চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অত্যধিক। কেননা, বর্তমানে ভারতে গরু জবাই করায় একধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর এ নিষেধাজ্ঞা বিরাজ ছিল ২০১৬ সালেও। ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ হওয়ার প্রভাব কী তা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বিস্তারিত উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার একটি শিরোনাম ছিল, ‘গো-হত্যা নিয়ে রাজনীতির জেরে ভারতে কাঁচা চামড়ার জোগানে টান’। আর রিপোর্টটিতে বলা হয় প্রায়ই গো-হত্যা নিয়ে রাজনীতির কারণে ওই বছর প্রায় ৭৪ হাজার কোটি রুপি বলি দিতে হচ্ছে ট্যানারি মালিকদের। তবে বাংলাদেশের চামড়া সিন্ডিকেটের কল্যাণে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পেরেছিল তারা। আর এ বছরও ভারতে গরু জবাই নিয়ে রয়েছে তুমুল বিতর্ক। ফলে চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কা এবারও প্রকট; কেননা ভারতে চামড়া বিক্রির ফলে পাওয়া যায় তিনগুণ দাম। আর সঙ্গে সঙ্গে বিক্রীত পণ্যের অর্থ, সঙ্গে ভারতের শিল্প রক্ষা।
কিছু অসাধু ও অনৈতিক ব্যবসায়ী গরিব-মিসকিনের টাকা নির্লিপ্তভাবে আত্মসাৎ করতে আন্তর্জাতিক দরপতনের ধুয়া তুলছেন। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম বিশেষ করে ভারত, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে গতবারের তুলনায় এবারও বেশি। ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের চামড়া অত্যন্ত উন্নত ও ভালো। কিন্তু ভারতের নিম্নমানের চামড়া প্রতি বর্গফুটের দাম ৯০ টাকা অথচ বাংলাদেশের চামড়া উন্নত হয়েও এর দাম তার অর্ধেক তথা ৪৫ টাকা! পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যে পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত চামড়া রফতানির চাহিদা রয়েছে, বাংলাদেশ সারা বছর যতগুলো চামড়া অর্জন করে, তা তার অর্ধেক অর্থাৎ বিশ্বে চামড়ার চাহিদা রয়েছে দ্বিগুণ; কিন্তু তারপরও কেন এ অজুহাত? তবে ব্যবসায়ীরা যা-ই বলুন না কেন, এটা যে একধরনের প্রতারণা ও ষড়ষন্ত্র তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট। এই স্পষ্টতার মধ্য দিয়ে সাধারণের জিজ্ঞাসা এ বছর যে স্বল্পমূল্যে ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনেছেন, এখান থেকে কি সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে? এ বছর চামড়ার দাম যেভাবে কমেছে, তার ফল কি জনগণ ভোগ করবে? এবার কি জুতা, ট্রাভেল ব্যাগ, বেল্ট কিংবা মানিব্যাগর দাম কমবে? বাস্তবতা হলো কখনোই আমরা দেখি না এসবের দাম কমতে, বরং প্রতিবছরই এসবের দাম বাড়ছে জ্যামিতিক হারে; তবে কেন চামড়ার এমন পানির দর?
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ঋণ না পাওয়া ও সাভারে নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উন্নত করতে ব্যবসায়ীরা এবার এ ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করে ফকির-মিসকিনের টাকা আত্মসাৎ করলেন! সরকারের উচিত ছিল চামড়া সিন্ডিকেটদের খুঁজে বের করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা; কিন্তু সরকার সেটি না করে উল্টো ওইসব ব্যবসায়ীর সঙ্গে সুর মেলাল! এমনকি চামড়া ব্যবসায়ীদের দাবির চেয়েও সরকার প্রতি বর্গফুটে পাঁচ টাকা কমে দাম নির্ধারণ করেছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, সরকার কি ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি!
মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য রফতানি যেমন অপরিহার্য শর্ত, তেমনি রফতানি বাড়াতে কাঁচামাল-জাতীয় পণ্য অন্যতম শর্ত। আর এ শর্ত পূরণ করতে পারে চামড়াশিল্প। প্রতিবছর বাংলাদেশে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে ১৪ কোটি বর্গফুট হলো গরু ও মহিষের; বাকি আট কোটি বর্গফুট চামড়া অন্যান্য পশু থেকে সংগ্রহ করা হয়। চামড়া খাতের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে বর্ষপণ্য বা প্রোডাক্ট অফ দ্য ইয়ার-২০১৭ ঘোষণা করেন এবং চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে আরও দুটি চামড়া শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কথা ঘোষণা করেন। বর্তমানে রফতানির ক্ষেত্রে চামড়াশিল্পের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ। এ হিসেবে অনেকের ধারণা, পোশাকশিল্পের পরই স্থান দিতে হবে চমড়াশিল্পকে। অন্যদিকে বাংলাদেশে যতগুলো কওমি মাদরাসা রয়েছে, তাদের প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রধান আর্থিক উৎস হলো এই কোরবানির চামড়া থেকে অর্জিত আয়। এক্ষেত্রে সরকার মনোযোগী হলে এর মাধ্যমেই এগিয়ে যেতে পারে আগামীর বাংলাদেশ, পূরণ হতে পারে উন্নত দেশের স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হবে ভিশন-২০৪১।

প্রভাষক
দর্শন বিভাগ, ফেনী সাউথ ইস্ট ডিগ্রি কলেজ
[email protected]