কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশি বিমান বিধ্বস্ত

শেয়ার বিজ ডেস্ক: মর্মান্তিক এক বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে। এতে নিহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশত মানুষ, যার সিংহভাগ বাংলাদেশি। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬৭ জন যাত্রী ও চারজন ক্রু নিয়ে উড়াল দিয়েছিল বিমানটি। বাংলাদেশি বেসরকারি কোম্পানি ইউএস বাংলা এয়ারের এ বিমানটি বেলা ২টা ১৮ মিনিটে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অঞ্চলে পৌঁছায়। মূল রানওয়েতে অবতরণের দুই মিনিট আগেই আগুন ধরে যায় যাত্রী বোঝাই বিমানটিতে।

ঠিক কী কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে তা এখনও কোনো সূত্রে স্পষ্ট হওয়া যায়নি। ত্রিভুবন বিমানবন্দরের মুখপাত্র প্রেমনাথ ঠাকুরের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানায়, ‘অবতরণের সময় বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। বিমানবন্দরের পাশেই একটি ফুটবল মাঠে বিধ্বস্ত হয় এটি।’

নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিচালক সঞ্জীব গৌতম বলেন, রানওয়েতে অবতরণের সময় বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এটা দক্ষিণ দিকে নামার কথা থাকলেও উত্তর দিক দিয়ে নামে। তিনি বলেন, ‘কারিগরি ত্রুটির কারণে এমনটা হয়ে থাকতে পারে। আমরা বিধ্বস্ত হওয়ার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’ এদিকে ঢাকার একটি অনলাইন গণমাধ্যমকে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন তাৎক্ষণিক বলেছিলেন, আমরা নিজেরাও এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি কী ঘটেছিল। আমাদের স্টেশন ম্যানেজারও দেশে রয়েছে। বিস্তারিত জেনে আমরা জানাতে পারব।

সূত্রমতে, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই উদ্ধার অভিযান শুরু করে ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও নেপাল সেনাবাহিনী। গতকাল রাত ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত দুর্ঘটনায় ৪৯ জন নিহত হয়েছেন বলে নেপালি সংবাদপত্র দ্য হিমালয়ান টাইমস জানায়। সূত্রমতে, ইউএস বাংলা (বিএস-২১১) বিমানটিতে ২টি শিশুসহ ৬৭ জন যাত্রী ছিল। নেপাল পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) মনোজ নৈপুণ্যে জানান, দুর্ঘটনায় ৪৯ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অপর ২২ জনকে মারাত্মক আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত ৪৯ জনের মধ্যে ৩১ জনের মৃতদেহ বিধ্বস্ত বিমানের মধ্য থেকেই উদ্ধার করেছে নেপালি সেনাবাহিনী। অপর ১৮ জনকে হাসপাতালে মৃত ঘোষণা করা হয়। ইউএস বাংলা এয়ারের সূত্রে জানা গেছে বিধ্বস্ত হওয়া উড়োজাহাজটিতে ৩৩ বাংলাদেশি যাত্রী ছিলেন। এছাড়া ৩২ জন নেপালি এবং একজন করে মালদ্বীপ ও চীনের যাত্রী ছিলেন।

এদিকে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকে ত্রিভুবন বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই নেপালি প্রধানমন্ত্রী কেপি ওলিসহ দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশি হাইকমিশনার দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। এ দুর্ঘটনায় সিঙ্গাপুর সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে গভীর শোক জানানো হয়। গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর দফতরের এক বার্তায় জানা গেছে, দুর্ঘটনার পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিফোনে কথা বলেন নেপালি প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলির সঙ্গে। নেপালি প্রধানমন্ত্রী এ সময় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীকে জানান, দুর্ঘটনা ঘটার পর তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ফ্লাইট উš§ুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে  বাংলাদেশ থেকে সাহায্যকারী দল নেপালে পাঠানো হবে। পরে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) থেকে জানানো হয়, কাঠমান্ডু বিমানবন্দর চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের টিম রওয়ানা হবে নেপালের উদ্দেশে।

দুর্ঘটনার পরপরই সামাজিক গণমাধ্যমে স্বজনদের আতঙ্ক প্রকাশ করতে দেখা যায়। তবে আতঙ্কিত স্বজনদের জন্য সর্বশেষ আপডেট সরবরাহ করতে নেপালে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে একটি হটলাইন ডেস্ক খোলা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, যে কোনো তথ্যের জন্য নেপালে কর্মরত কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলামুল ইমাম (+৯৭৭৯৮১০১০০৪০১) ও ফার্স্ট সেক্রেটারি অসিত বরণ সরকারের (+৯৭৭৯৮৬১৪৬৭৪২২) সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।

উল্লেখ্য, বেসরকারি মালিকানাধীন ইউএস বাংলা এয়ার দেশের অভ্যন্তরের প্রায় সব রুটে ফ্লাইট পরিচালনার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুটেও ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এর আগেও ইউএস বাংলার বিমানে ত্রুটি দেখা গিয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। গতকাল দুর্ঘটনার পরপরই সামাজিক গণমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি এ কোম্পানির নানা তথ্য তুলে ধরেন।

কাজী সায়েমুজ্জামান নামে একজন তার ফেসবুক ওয়ালে মন্তব্য করেন, যশোর যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্টে আসলাম। ইউএস বাংলা এয়ারের ফ্লাইটে যাব। বিকাল সাড়ে ৫টায় ফ্লাইট। এসেই বিমানবন্দরের টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজ দেখছি, ইউএস এয়ারলাইন্সেরই একটা বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে নেপালে। বিমানের কর্মীসহ যাত্রীদের মুখ শুকিয়ে আছে। এর আগে একই এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় রাজশাহীর আকাশ থেকে ঢাকা ফিরতে হয়েছিল। আমি ওই ফ্লাইটের যাত্রী ছিলাম। এখন মিলিয়ে দেখতে হবেÑএকই এয়ার বাস কি না! আবার একই এয়ারলাইন্সে বৃহস্পতিবার ঢাকায় ফিরব।

এদিকে ইউএস বাংলা এয়ারের পক্ষ থেকে তাদের ফ্লাইটে (বিএস-২১১) কোনো ত্রুটি ছিল না বলে দাবি করে গতকাল বিকালে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আফিফ সেমবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় বারিধারায় কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করতে গিয়ে বলেন, ‘নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কন্ট্রোল রুম থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার কারণেই ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে থাকতে পারে বলে তার সন্দেহ। তাছাড়া বিমানের পাইলটের কোনো গাফিলতি ছিল না।’

তিনি বলেন, আমাদের ফ্লাইটটি অবতরণ করার আগের তিন মিনিটের একটি কথোপকথন আমাদের হাতে এসেছে। ফ্লাইটের পাইলটের সঙ্গে কন্ট্রোল রুমের যে কথা হয়, তা রয়েছে ওই কথোপকথনে। এটা থেকে আমরা ধারণা করছি, দুর্ঘটনায় আমাদের পাইলটের দিক থেকে কোনো গাফিলতি ছিল না।

সিইও ইমরান আফিফ আরও বলেন, ‘ফ্লাইট অবতরণের আগে কাঠমান্ডুর কন্ট্রোল রুম থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে। কোনো রানওয়ে দিয়ে অবতরণ করতে হবে, সে সম্পর্কে ওই তিন মিনিটের কথোপকথনে বিভিন্ন ধরনের তথ্য দেওয়া হয়েছে। অবতরণের তথ্য সঠিকভাবে না দেওয়ার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।’