কাদা ছোড়ার খেলা

দুঃসাহসী সওদাগর: পর্ব-২৭

শামসুন নাহার: পিটিএ অনুমোদনের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ২৯ মে। সরকারের নতুন নিয়মমতে, ২৯ মে পর্যন্ত যেসব পিটিএ আমদানির বিপক্ষে অপ্রত্যাহারযোগ্য এলসি খোলা হয়েছে, তা নির্বিঘ্নে অনুমোদন দেওয়া হবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগীরা ভেবেছিল, এবার রিলায়ান্স বাধ্য হবে পিটিএ থেকে সরে গিয়ে ডিএমটিনির্ভর পলিয়েস্টার উৎপাদন করতে। কিন্তু এ নিয়মের কোনো তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েনি রিলায়ান্সে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, সোসায়েট জোরেল ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মতো কয়েকটি ব্যাংকের মাধ্যমে ২৯ মের আগেই এক লাখ ১৪ হাজার টন পিটিএ আমদানির এলসি করে ফেলেছিল রিলায়ান্স। এর মধ্যে কেবল ২৭ তারিখেই পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ৫০ হাজার টন পিটিএ নিবন্ধনের চুক্তি করেছে রিলায়ান্স। মাত্র তিন কর্মদিবসের মধ্যে এ চুক্তির বিপরীতে এলসি খোলা ও অন্যান্য দাফতরিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা ভারতের প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে অলৌকিক ব্যাপার। অথচ তা-ই করে দেখালেন ধীরুভাই আম্বানি। অর্থাৎ দেশীয় ডিএমটি শিল্পকে রক্ষার জন্য সরকার যে পলিসি তৈরি করেছে, তা আদতে কোনো কাজেই আসেনি।

সরকার এ ব্যর্থতায় বেশ রুষ্ট হলো। তাদের ক্ষোভ আরও বাড়ল যখন বোঝা গেল সরকারের ভেতর থেকেই পলিসির ব্যাপারে তথ্য পাচার হয়েছে রিলায়ান্সে। শেষ তিন দিন যেভাবে রিলায়ান্স এলসি খোলার জন্য ঘোড়দৌড় শুরু করেছিল, তা থেকে এটা অনুমান করা কঠিন নয়। কর্তৃপক্ষও রিলায়ান্সকে জানিয়ে দিল, যদি রিলায়ান্সের এক লাখ ১৪ হাজার টন পিটিএ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসে পৌঁছায় কেবল তাহলেই তার এ আমদানির ক্ষেত্রে ৯০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড কার্যকর করা হবে। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাত্র ১৪ হাজার টন পিটিএ এসে পৌঁছাল। বাকি এক লাখ টনের বৈধতা পেতে সরকার বিবাদী মামলা করলেন আম্বানি। তার দাবি, এভাবে আমদানি পৌঁছানোর সময় বেঁধে দেওয়া সরকারের খামখেয়ালি সিদ্ধান্তেরই নামান্তর। এছাড়া তার কারখানাকে পিটিএর উপযোগী করে উন্নত করা হয়েছে। এখন আবার ডিএমটির উপযোগী করে রূপান্তর করতে হলে কয়েক কোটি রুপি খরচ করতে হবে। এছাড়া এ রূপান্তরে সময়ও লেগে যাবে কয়েক মাস। ফলে কোম্পানিকে গুনতে হবে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি। মুম্বাই উচ্চ আদালতে রায় বলা যায় আম্বানির পক্ষেই গিয়েছে। আদালত সরকারের সিদ্ধান্তকে ‘স্টে’ (সাময়িকভাবে স্থগিতকরণ) করে। পাশাপাশি শিপমেন্টের জন্য প্রস্তুত থাকা পাঁচ হাজার টন ডিএমটি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। বাকি ৯৫ হাজার টনের জন্য কোম্পানিতে সরকারের থেকে সাপ্লিমেন্টারি লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে। সরকারকে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে লাইসেন্সের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় পরবর্তী আদেশের রিলায়ান্স আবারও আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে।

এ রায়ের পর সরকারপক্ষ উচ্চ আদালতের আরেকটি সিনিয়র বেঞ্চে আপিল করে। শুনানির তারিখ আসার আগেই ডিএমটি ও পিটিএ উভয়েরই আমদানি শুল্ক আরেক দফায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ১৯০ শতাংশে পৌঁছায়। এতেও অবশ্য আম্বানির কোনো ক্ষতি হয়নি। কারণ তখন আন্তর্জাতিক বাজারে এ দুটি কাঁচামালেরই দাম তখন কমছে হু হু করে। ২৮ অক্টোবরের শুনানিতে, এর আগের রায়ে যে পাঁচ হাজার টন আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে যুক্তি উত্থাপন করে সরকারপক্ষ। বাকি ৯৫ টন শিপমেন্টের  জন্য ৩১ অক্টোবরের ডেডলাইনও বাতিল করার জন্য সুপারিশ করা হয়। এই বেঞ্চও সরকারের আপিল খারিজ করে দেয়। তবে পাঁচ হাজার টনের শিপমেন্টটি পরবর্তী এক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থগিত করার অনুমতি দেয়, যাতে সরকার চাইলে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারে। তা-ই করে সরকারপক্ষ। ৪ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে পাঁচ হাজার টন পিটিএ শিপমেন্টের অনুমতি পায় রিলায়ান্স। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানিটি এ কাঁচামাল ব্যবহার করতে পারবে না। সরকারকে মামলা করার জন্য তিন সপ্তাহ, রিলায়ান্সকে জবাব দেওয়ার জন্য এক সপ্তাহ ও উচ্চ আদালতকে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন সুপ্রিম কোর্ট।

একদিকে মামলা চলছে, অন্যদিকে সাংবাদিক বহরকে কাজে লাগাচ্ছিলেন আম্বানি। বোম্বে ডায়িংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়, ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ প্লান্টে নিম্নমানের ডিএমটি ব্যবহার করছে বোম্বে ডায়িং। পলিয়েস্টার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্বদেশি পলিটেক্সের বরাতে বলা হলো, বোম্বে ডায়িংয়ের ৬৮ টন ডিএমটির একটি শিপমেন্ট এসেছে, যা নিম্নমানের ও ভেজাল কাঁচামালে পূর্ণ।

পলিয়েস্টার কোম্পানিগুলোর জন্য এ সময়টি ছিল প্রচণ্ড ঘটনাবহুল। কয়েকদিক থেকে সরকারি বিভিন্ন অফিস ও মন্ত্রণালয়ে লবিং চলছে পুরোদমে। সমানতালে চলছে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো। নভেম্বরের দিকে লবিং ও প্রোপাগান্ডার যুদ্ধ চরম রূপ নিল। প্রেস রিলিজ ছাপে রিলায়ান্স। এতে বলা হয়, পলিয়েস্টার প্লান্টকে পিটিএ থেকে আবার ডিএমটিতে রূপান্তর করাটা খুবই ঝামেলাপূর্ণ এবং ব্যয়সাপেক্ষ। এছাড়া পিটিএ সবচেয়ে আধুনিক। পিটিএ থেকে ডিএমটিতে পরিবর্তন করা অনেকটা ডিজেলচালিত গাড়িতে পেট্রল ব্যবহারের উপযোগী করে রূপান্তর করার মতোই। এতে রিলায়ান্সের প্রায় পাঁচ কোটি ৮৬ লাখ রুপি ও ৯ থেকে ১২ মাস সময় খরচ হয়ে যাবে। রিলায়ান্স যদি পিটিএ আমদানির অনুমতি না পায় তাহলে প্লান্টের কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। হাজার হাজার শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করে বসে থাকতে হবে।

গণমাধ্যমের উপযুক্ত ব্যবহার করেছিলেন ধীরুভাই। সাধারণ শ্রমিকের স্বার্থও যেহেতু জড়িত, তাই রিলায়ান্সের পক্ষে সাধারণ মানুষের সহানুভূতিও তৈরি হয়েছিল কিছুটা। সরকারের জন্য এটাও একটি চাপ। এছাড়া পিটিএ নির্ভর পলিয়েস্টার প্রস্তুতকারী অন্যান্য কোম্পানি মালিকদেরও দলে ভেড়ালেন তিনি। এতে আরও ঘনীভূত হলো এ যুদ্ধ। দুটি বড় টেক্সটাইল গ্রুপের মধ্যকার এ যুদ্ধ আরও নোংরা রূপ নিল, ছড়িয়ে পড়ল রাজনীতিতেও। মুম্বাইভিত্তিক ট্যাবলয়েড ব্লিটস্-এর মতে, রিলায়ান্সের নেতৃত্বে কয়েকজন মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদের সমন্বয়ে দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপরই ওরকে সিল্ক মিলের মালিক কপল মেহরার বিরুদ্ধে পরপর কয়েকটি মামলা দেওয়া হয়। ১ নভেম্বর এক কোটি ৫০ লাখ রুপি শুল্ক ফাঁকির দায়ে গ্রেফতার করা হয় তাকে। অভিযোগ করা হয়, ১৯৮২ থেকে ১৯৮৩ সালে জাপানের সি. ইতোহ কোম্পানির কাঁচামাল আমদানিতে আন্ডার ইনভয়েসিং করে এ বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দেন তিনি।  জাপানের রাজস্ব ইন্টেলিজেন্সের দালিলিক প্রমাণ থেকে এ তথ্য পেয়েছে ভারত সরকার। মেহরার আইনজীবীর মতে, প্লান্ট সম্প্রসারণের জন্য শেয়ার ইস্যু করেছিল ওরকে। এ ইস্যুকে ক্ষতিগ্রস্ত করতেই কর্তৃপক্ষকে খুঁচিয়ে দিয়েছে মেহরার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পপতি। ক’দিন পরেই জানা যায়, এর কিছুদিন আগেই জাপান গিয়েছিলেন ধীরুভাই। আর সি. ইতোহর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক তার অনেক মজবুত। সি. ইতোহ অ্যান্ড কোম্পানি ২০ শতাংশ ডিসকাউন্টে রিলায়ান্সের কাছে পলিয়েস্টার বিক্রি করে অনেক আগে থেকেই।

মেহরা একাই নন, ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হন নুসলি ওয়াদিয়াও। ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়া নামের একটি নিউজ এজেন্সি থেকে প্রকাশ করা হয়, নুসলি ওয়াদিয়া ও তার স্ত্রী প্রতারণামূলক চুক্তিতে জড়িত। তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি পারসি ট্রাস্টের জমি তারা গোপনে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ করা হয়। এ ন্যক্কারজনক মামলায় যথেষ্ট ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল ওয়াদিয়া পরিবারকে।

এদিকে ধীরুভাই তার দুই প্রধান প্রতিপক্ষের পাশাপাশি সরকারের বিরুদ্ধেও সমানে লড়ে যাচ্ছেন। ২৬ অক্টোবর বেশ কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয় যে, মে মাসে পিটিএকে সীমিত অনুমোদনযোগ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত কীভাবে লিক হলো, তা নিয়ে অনুসন্ধান চালাবে নয়া দিল্লির সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিএ) সর্বোচ্চ অপরাধমূলক তদন্ত বোর্ড। এর কয়েকদিন পর অর্থমন্ত্রী ভিপি সিং অবশ্য গণমাধ্যমকে জানান, এ ধরনের কোনো তদন্তের আদেশ তিনি দেননি। কিন্তু পত্রিকার বরাতে জানা যায়, ভিপি সিংয়ের অফিসসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অফিসার লেভেলে ব্যাপক তদন্ত চালানো হচ্ছে।

এ ব্যাপারে রিলায়ান্সের বক্তব্য হলো, তারা তদন্তের ব্যাপারে কিছু জানে না। মে মাসের মধ্যে কীভাবে এতগুলো এলসি খোলা হয়েছিল তারও বিশদ ব্যাখ্যা পেশ করল। যদিও এত দিনে ধীরুভাই স্পষ্ট বুঝে গিয়েছেন যে, অর্থমন্ত্রী তার বন্ধু নয়। রিলায়ান্সের ওপর একের পর এক যে আঘাত আসবে, তাতে সায় আছে তার। কিন্তু তখনও পর্যন্ত ধীরমস্তিষ্কে সরকারের সবরকম আক্রমণ সামলে চলতে পেরেছেন আম্বানি।