প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যে ব্যাহত চাষাবাদ

পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ

সাইফুল আলম ও শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের পিএইচপি ফ্যামিলির সহযোগী প্রতিষ্ঠান পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত। গ্লাস উৎপাদনকারী এ কারখানা থেকে নির্গত অপরিশোধিত বর্জ্য ও দূষিত পানি সরাসরি গিয়ে পড়ছে খালে, যা খালের পানির সঙ্গে মিশে পার্শ্ববর্তী এলাকার ফসলি জমি ও পুকুরে প্রবেশ করে। এর ফলে স্থানীয় কৃষকদের জমির ফসল ও পুকুরের মাছ মারা যাচ্ছে। এতে বারবার লোকসানের কারণে কৃষক জমি চাষের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এমনটাই অভিযোগ স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ জনগণের।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ডে অবস্থিত। এ কারখানার বর্জ্য পানির সঙ্গে মেশায় ক্ষতিকারক জীবাণু ও রোগে দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন এলাকার মানুষ। স্থানীয় এক কৃষক আবদুর রশিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্ষায় পিএইচপির এই ময়লা পানি খালের পানির সঙ্গে মিশে আমার পুকুরে প্রবেশ করে, যার কারণে পুকুরের সব মাছ মরে যায়। এতে আমাকে প্রায় দেড় লাখ টাকার লোকসান গুনতে হয়েছে। আরেক কৃষক মঞ্জুর ইসলাম বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে আমাদের ধানি জমিতে ধান ফলছে না। সাধারণত বর্ষার মৌসুমে বা বৃষ্টির সময় খালের পানি এই জমিতে ঢোকে। পানি নেমে গেলে সবকিছু স্বাভাবিক থাকত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে পানি প্রবেশের পর ধানগাছ মরে যায়। এতে আমাদের প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কৃষক মঞ্জুর আরও বলেন, পিএইচপির দূষিত পানির কারণেই এমনটি হচ্ছে। ওই এলাকার আরও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্ষতির আশঙ্কায় অনেক কৃষক এখন চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আর চাষাবাদ না করায় আবাদি জমিগুলো দিনে দিনে অনাবাদি জমিতে পরিণত হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-পরিচালক ফেরদৌস হাসান বলেন, সীতাকুণ্ডে অবস্থিত পিএইচপি কারখানাটির বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট (ইটিপি) করা আছে। তবে বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট থাকলেও কারখানাটি যে বিকল্প পথে খালের পানিতে বর্জ্য ফেলে, সে বিষয়ে অবগত নয় পরিবেশ অধিদফতর। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা খতিয়ে দেখব এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিল্টন রায় শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা আপনার মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়েছি এবং প্রয়োজনে পরিবেশ অধিদফতরকে নিয়ে তদন্তসাপেক্ষে আমরা ব্যবস্থা নেব। এই সমস্যা সমাধান কীভাবে করা যায় এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা খাসজমি আছে কিনা দেখব। যদি না থাকে তবে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে রাস্তার পূর্ব পাশের খালের সঙ্গে পশ্চিম পাশের খালের সংযোগের ব্যবস্থা করব।
এ বিষয়ে জানার জন্য পিএইচপি ফ্যামিলির ভাইস চেয়ারম্যান মহসিন চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদেবার্তা দেওয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। এছাড়া পিএইচপি ফ্লোট গ্লাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমির হোসেন চৌধুরীর মন্তব্যের জন্য প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা দিলশাদ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার নম্বর আমার কাছে নেই। আপনি ল্যান্ডফোনে যোগাযোগ করুন। পরে ল্যান্ডফোনে কল করা হলে কেউ ফোন রিসিভ করেনি।
উল্লেখ্য, পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ২০০৫ সালে বাণিজ্যিকভাবে গ্লাস উৎপাদন শুরু করে। শুরুর দিকে দৈনিক ১০০ টন গ্লাস উৎপাদন করত প্রতিষ্ঠানটি।
এর আগে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কালভার্ট বন্ধ করে কারখানা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপটির বিরুদ্ধে। ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার ঘোপাল ইউনিয়নের নিজকুঞ্জরা এলাকায় পিএইচপির এ কর্মকাণ্ডের কারণে বেশকিছু ফসলি জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছিল। পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ, রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
জানা যায়, ওই কারখানা নির্মাণের সুবিধার্থে পানি নিষ্কাশনের তিনটি কালভার্ট বন্ধ করে দিয়েছিল পিএইচপি। এতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে চাষাবাদ বন্ধ হয়ে পড়ে ১০ একরেরও বেশি কৃষিজমিতে। এছাড়া আরও ১০০ একরের বেশি জমির চাষাবাদ বিঘ্নিত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।

সর্বশেষ..