সম্পাদকীয়

কারিগরি সহায়তায় ফসলের সংগ্রহ-ক্ষতি কমানো হোক

‘তিল বুনি ছাই, রাই বুনি পায়’। ফসলের সংগ্রহ-ক্ষতি এভাবেই আবহমানকালের খনার বচনে স্পষ্ট হয়। কৃষিনির্ভর গ্রামবাংলা ফসল উৎপাদন ও সংগ্রহ কাজে সনাতনি পদ্ধতি থেকে আরও সুবিধাজনক উন্নত পথে পা বাড়িয়েছে সেই শুরু থেকেই। এই বিবর্তনকে কোনো ক্ষুদ্র সময়কাঠামোর মধ্যে আটকে ফেলা যায় না। ফলে উৎপাদন ও সংগ্রহ কৌশলে আসা নতুনত্ব প্রতিটি ধাপেই সুবিধা ও সঞ্চয়কে বাড়ন্ত করেছে। কিন্তু আধুনিকায়নের এখানেই শেষ নয় এবং ব্যবস্থাগত ক্ষতি শূন্যের কোঠায় আনার আগ অবধি প্রচেষ্টা নিরন্তর। সাম্প্রতিক জরিপে বোরো ধান সংগ্রহে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে উৎপাদনের সাড়ে সাত শতাংশ। আউশে এ ক্ষতি দাঁড়ায় আট দশমিক ৯৩ ও আমনে সাত দশমিক ৭০ শতাংশ। একইভাবে গম, ভুট্টা, আলু ও পাট সংগ্রহ-ক্ষতি দাঁড়িয়েছে পাঁচ থেকে আট শতাংশের মধ্যে। বাড়ন্ত জনসংখ্যা ও ভূমির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির আর্থসামাজিক পরিবেশে এই ক্ষতি ছোট করে দেখার নয়। এ ব্যাপারে উন্নত কারিগরি অবকাঠামো সৃষ্টির বিকল্প নেই।
বিবিএসের জরিপ মারফত দৈনিক শেয়ার বিজের প্রতিবেদন থেকে গোচরীভূত এই ক্ষতির শোচনীয়তায় জিডিপি কীভাবে প্রভাবিত হয়, তা জনমনকে ভাবিয়ে তোলে। অথচ দেশের মোট জিডিপির ১৫ শতাংশ ও কর্মসংস্থানের ৪৩ শতাংশ আসে কৃষি খাত থেকে। এমনকি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে কৃষিনির্ভরশীলতা তাৎপর্যপূর্ণ। সাবেক কৃষিমন্ত্রী এক খণ্ড জমিকে চার ভাইয়ের চার অংশে ভাগবাঁটোয়ারার সংকটকে মাথায় এনে বাণিজ্য বাড়ানোর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রাচীনকাল থেকেই এ দেশে বিদেশি বণিক-বেনিয়ারা কৃষিপণ্যের ব্যবসায় প্রলুব্ধ হয়েছে এবং আসন গেড়ে বসেছে। তাই কৃষিকে গুরুত্ব দিতেই তার সংগ্রহ-ক্ষতি কমিয়ে আনতে হবে। ম্যালথাসের তত্ত্বানুসারে গাণিতিক হারে শস্য উৎপাদনের বিপরীতে জ্যামিতিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সংকটকে মিটমাট করা গিয়েছিল কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন ঘটিয়ে। সত্তরের দশকের পর দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে চলার পরও খাদ্যশস্যের গড় আমদানি বাড়েনি। রফতানিও হচ্ছে। এর পেছনে কাজ করেছে কৃষির আধুনিকায়ন। বিশ্বব্যাপী এ আন্দোলনের অগ্রদূত মেক্সিকোর নোবেল বিজয়ী ড. নরম্যান বোরলাগ। যাহোক, স্বাধীনতা-উত্তরকালে কৃষি যন্ত্রপাতির দাম কমিয়ে ভর্তুকি ও ঋণ সহায়তা দিয়ে দেশের এই সফলতা সম্ভব হয়েছে। এখন সংগ্রহ-ক্ষতি কমাতে সংগ্রহকাজে ব্যবহৃত কারিগরি যন্ত্রপাতি স্বল্পদামে সরবরাহ করা অপরিহার্য।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, কৃষিতে যন্ত্রপাতির দাম কমিয়ে সরকার কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছে বলে উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু কৃষিপণ্য তিলে তিলে সংগ্রহ-ক্ষতিতে তাল-পরিমাণ ক্ষতির রূপ নেয় প্রতি মৌসুমে। এ ক্ষতি কমিয়ে আনতে সরকার আশু পদক্ষেপ নেবে বলেই প্রত্যাশা।

 

সর্বশেষ..