কার সমর্থনে বেপরোয়া মিয়ানমার!

শরীফুর রহমান আদিল : বাংলাদেশের মানুষ ভারতকে প্রকৃত বন্ধু হিসেবে জেনে আসছে। এর বড় কারণ, স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে থেকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও সৈন্য দিয়ে সাহায্য করাসহ বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষদের আশ্রয় দিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করার ভিত্তিতে ভারতকে বন্ধুত্বের মনোভাব নিয়ে সবকিছু উজাড় করে দিলেও ভারত বন্ধুত্বের পরিবর্তে বাংলাদেশ থেকে প্রাপ্ত যে কোনো সুযোগ-সুবিধাকে ‘বিগ ব্রাদার’ নীতি ও কূটনীতির বিজয় বলে দেখতে চায় বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

অনেকে বলেন, ভারতের কূটনীতির মূল সংজ্ঞাই হলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা। আর এ কথাটি জোর দিয়েই বলেছেন ভারতের সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখার্জি।

ভারত বন্ধুত্বের দাবি উপেক্ষা করে কূটনীতি তথা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে। এ সুযোগে মিয়ানমার বার বার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে যুদ্ধের উসকানি দিয়ে যাচ্ছে। যে বাংলাদেশ পারমাণবিক বোমার অধিকারী পাকিস্তানকে পরাজিত করতে পারে, সে বাংলাদেশ কেন আজ দুর্বল মিয়ানমারের কাছে পরাভূত? পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতার চেয়ে মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা অনেকাংশে কম। তবুও কেন মিয়ানমারের এই ঔদ্ধত্ব? কার সমর্থন পেয়ে মিয়ানমার তার শক্তি প্রদর্শন করে যাচ্ছে? হয়ে উঠছে বেপরোয়া?

বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলসহ তাদের কর্মী-সমর্থক ভারতকে অকৃত্রিম বন্ধু বলে ঘোষণা দিয়েছেন। পাঠক মাত্রই জানেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুসম্পর্ক থাকায় ভারত মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের সরঞ্জামসহ সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেছে ও প্রায় কোটি মানুষকে শরণার্থী হিসেবে ঠাঁই দিয়েছে। সেই মুজিব-ইন্দিরার চেয়েও বেশি সুসম্পর্ক বর্তমানে উভয় দেশের মধ্যে বিরাজ করছে বলে ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, মন্ত্রী, আমলা ও কূটনীতিকরা প্রচার করে যাচ্ছেন। সে সুবাদে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ে স্বাক্ষর-সমঝোতা সম্পাদিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা বাংলাদেশ মনে রেখেছে। তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বসে ভারতের একমাত্র মাথাব্যথা ‘সেভেন সিস্টারস’-র স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহীদের দমনে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। আবার বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সামরিক চুক্তির কথাও ভাবছে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় অনেকের ধারণা ছিল রোহিঙ্গা ইস্যুতে অস্বস্তিতে থাকা বাংলাদেশের পাশে থেকে মিয়ানমারকে চাপ দেবে ভারত; কিন্তু দেশটি এখানে ভিন্ন ভূমিকা রাখছে। চাপ দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো মিয়ানমারের পাশে থাকার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার সফর করেছেন!

রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ যখন কাবু হয়ে যাওয়ার অবস্থা, তখন তো বন্ধু দেশের সহানুভূতি ও সহযোগিতা পাওয়ার কথা। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রশ্নে সহানুভূতি, সহযোগিতার কোনোটিই পায়নি বাংলাদেশ। যখন বাংলাদেশ যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও তুরস্কের মতো দেশের সমর্থন লাভে সমর্থ হলো, তখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ফোনে বাংলাদেশের পাশে থাকার সুবিধাভোগী সিদ্ধান্তের কথা জানান। কিন্তু ‘পাশে থাকা’র প্রতিশ্রুতি কেবলই সিকিভাগ ত্রাণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে ভারত। বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে ত্রাণের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারতের কাছে যে সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল, তাকে বরাবরই তারা এড়িয়ে গেছে। ভারত বাংলাদেশের মানুষের আবেগ-অনুভূতি নিয়ে মনে হয় গবেষণা করেছে প্রতিনিয়ত আর এ কারণে তারা মানুষকে খুশি করানো যায়Ñসে পদক্ষেপই নিয়েছে। তারা দেখেছে, বাংলাদেশের মানুষ রোহিঙ্গাদের জন্য সবকিছু বিলিয়ে দিচ্ছে; ত্রাণ কাজে সাহায্য করছে দেশটির জনগণ, আর ভারত বাংলাদেশের মানুষের এ আবেগকে পুঁজি করে সামান্য পরিমাণ ত্রাণ পাঠিয়ে নিজেদের বাংলাদেশের পাশে রয়েছে বলে প্রমাণ করতে চায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেবল সামান্য ত্রাণ দিলেই কি পাশে থাকা বোঝায়? এটাই কি পাশে থাকা কিংবা বন্ধুত্ব রক্ষার নমুনা? চীন ও মিয়ানমারের সম্পর্ক কি ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের চেয়েও গভীর? যদি এ প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হয়, মিয়ানমারের অপরাধ সত্ত্বেও চীন যদি ইয়াংগুনের পাশে থাকে, তবে অকৃত্রিম বন্ধু হয়েও ভারত কেন ঢাকার পাশে থাকবে না? চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক বেশ ঐতিহাসিক বললে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হওয়ার কথা প্রাগৈতিহাসিক। কেননা বাংলাদেশসহ ভারতের বিভিন্ন মন্ত্রী অধিকাংশ সময় বলে থাকেনÑবাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক চির অটুট। মিয়ানমার চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরও চীনের সমর্থন, এমনকি জাতিসংঘে পর্যন্ত ভেটো পাওয়ার প্রয়োগ করতে পারে, তবে প্রাগৈতিহাসিক সম্পর্কের ভারত কেন বাংলাদেশের পাশে থেকে মিয়ানমার সরকারকে চাপ দেয়নি? ভারতের ধারণা, ১০ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশ বিপদে থাকলে বাংলাদেশে তাদের শাসন আরও পাকাপোক্ত হবে। ভারত মিয়ানমারের বর্তমান শাসক গোষ্ঠী ও সামরিক জান্তার ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত থেকে মিয়ানমারের পাশে থেকে সেদেশের শাসকগোষ্ঠীর আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করছে!

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গত ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোনে জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে আছে ভারত। কিন্তু গত ৩০ সেপ্টেম্বর ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়Ñরোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার-বাংলাদেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করবে না ভারত! তাদের এ দ্বিমুখী আচরণে বাংলাদেশের অনেকের প্রশ্নÑবন্ধুত্ব সত্ত্বেও ভারতের এই ডিগবাজির কারণ কী?

ভারত কেন মিয়ানমারের পক্ষেÑএর উত্তরে ভারতের প্রসিদ্ধ কূটনীতিক কানওয়াল সিবাল ইকোনমিক টাইমসকে ‘ডোন্ট জয়েন হিপোক্রেসি কনডেমিং মিয়ানমার’ শিরোনামে বলেছেনÑভারত মিয়ানমার দিয়ে থাইল্যান্ডের সঙ্গে সড়ক সংযোগ স্থাপন করতে চায়। এ কারণে ভারত মিয়ানমারের পক্ষে থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশ আরও অনেক আগেই এশিয়ান হাইওয়ে নির্মাণ করে দিয়েছে; তবুও কেন ভারতের এমন ডিগবাজি? ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমানা দৈর্ঘ্য মাত্র এক হাজার ৬৪১ কিলোমিটার আর বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তসীমানা হলো চার হাজার ৯ কিলোমিটার। সুতরাং কৌশলগত দিক থেকে হলেও ভারত বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা; কিন্তু পাশে থাকা তো দূরের কথা, একটি আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্রেও স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানায়। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে যে আহ্বান জানিয়েছিল, তাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সব মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনসহ সেখানে মানবিক সহায়তাসহ নিরাপদ প্রবেশের নিশ্চয়তার দাবিতে ইন্দোনেশিয়ার বালি শহরে যে আন্তর্জাতিক যৌথ স্বাক্ষর অভিযান ছিল, ভারত তাতেও স্বাক্ষর করেনি।

বন্ধুত্বের নামে ভারতের ডিগবাজি এর আগেও বাংলাদেশের জনগণ দেখেছিল চীন থেকে সাবমেরিন কেনার পর। বাংলাদেশ যখন চীন থেকে সাবমেরিন কিনেছে, ভারত তখন মিয়ানমারের কাছে সেই সাবমেরিন ধ্বংসে সক্ষম শেইনা টর্পেডো বিক্রি করতে ৩৮ লাখ ডলারের চুক্তি করেছে। অন্য এক চুক্তির আওতায় ভারত মিয়ানমারের কাছে চীন থেকে কেনা বাংলাদেশের সাবমেরিন খুঁজে বের করতে সোনার (ঝঙঁহফ ঘধারমধঃরড়হ অহফ জধহমরহম) ও রাডার (জঅফরড় উবঃবপঃরড়হ অহফ জধহমরহম ড়ৎ জঅফরড় উরৎবপঃরড়হ অহফ জধহমরহম) বিক্রি করতে সম্মত হয়েছে। ভারত যদি প্রকৃত বন্ধুই হবে, তবে বাংলাদেশের অস্ত্র ধ্বংসকারী সরঞ্জাম বারবার যুদ্ধের উসকানিদাতা মিয়ানমারের কাছে বিক্রি করবে কেন?

ভারতকে বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা ও মনোভাব বুঝে কাজ করতে হবে। মাত্র ৫০ লাখ মানুষের কথা চিন্তা করে তিন কোটি মানুষের ন্যায্য দাবি তিস্তাচুক্তি করতে ভারতের এখনও অনীহাসহ সবকিছুতেই ‘বড় ভাইসুলভ’ আচরণ ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের বিরূপ মনোভাবেরই অন্যতম কারণ। ভারত যদি নিজেদের বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু বলে দাবি করে, তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াসহ দ্রুত তিস্তাচুক্তি সম্পন্ন করাসহ বাংলাদেশ যেমনিভাবে সবকিছু উজাড় করে দেয়, তেমনি ভারতেরও উচিত বন্ধুত্বের দাবি অনুযায়ী সমহারে পাশে থাকা।

 

প্রভাষক, ফেনী সাউথ-ইস্ট ডিগ্রি কলেজ

[email protected]