সারা বাংলা

কালীগঞ্জে চলছে চিত্রা দখলের মহোৎসব

নয়ন খন্দকার, ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে চিত্রা নদীতে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বড় বড় পুকুর। পুকুরপাড়ে লাগানো হয়েছে গাছ। গাছগুলো এতটাই বড় হয়ে উঠেছে যে, নদীকেই আড়াল করে ফেলেছে! একপাশ থেকে আরেক পাশ দেখা যায় না। এ নদী দখল করেই নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য ভবন। গড়ে তোলা হয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এখনও চলছে এই দখল-উৎসব।
এভাবে দখলে সংকুচিত হয়ে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী চিত্রা নদী। একসময় যে নদীতে লঞ্চ-স্টিমার চলত, সেই নদী এখন খালে পরিণত হয়েছে। দখলদাররা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ নানা অজুহাতে এই দখল অব্যাহত রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঝিনাইদহের নির্বাহী প্রকৌশলীর দফতরে খোঁজ নিয়ে দখলের সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান ওরফে সুজন জানান, সম্প্রতি তারা দখলদারদের একটি তালিকা তৈরি করেছেন। সেখানে চিত্রা নদীতে কয়েকটি পুকুর আছে উল্লেখ রয়েছে। তালিকায় দেখা গেছে, কালীগঞ্জ উপজেলার সিংদহ গ্রাম এলাকায় আট দখলদারের দখলে রয়েছে আটটি পুকুর।
সরেজমিনে নদী এলাকায় দেখা গেছে, কালীগঞ্জের চাঁচড়া এলাকা থেকে শালিখা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার নদীর দুই পাড়ে চলছে দখলের প্রতিযোগিতা। এখানে নদীর জায়গায় পুকুর কেটে মাছ চাষ করা হচ্ছে। নদী ভরাট করে নার্সারিও প্রতিষ্ঠা করেছেন দখলদাররা। মার্কেট, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পাকা ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এখনও কিছু কিছু স্থানে নির্মাণকাজ চলছে। দখলের কারণে নদীটি খালে পরিণত হয়েছে। অথচ একসময় এ নদীতে লঞ্চ-স্টিমার চলত। এ নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে কালীগঞ্জ শহর।
কালীগঞ্জ শহরের মেইন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পশ্চিম পাশে চিত্রা নদীর সেতু এলাকায় নির্মাণ শুরু হয়েছিল একটি বিশাল পাকা ভবন। কিন্তু সংবাদপত্রে লেখালেখির কারণে বন্ধ আছে। এর পশ্চিমে শিবনগর গ্রামের মুক্তার হোসেন নদীর জায়গায় ঘর তৈরি করে মুরগির খামার করেছেন। শহরের মধ্যে নদীর ওপর থাকা সেতুটির (পুরাতন সেতু) দু’পাশে মার্কেট গড়ে উঠেছে। সেতুর পশ্চিমে নদীর দু’পাড়ে যেভাবে বড় বড় পাকা ভবন তৈরি হয়েছে, এখন দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি নদী। অর্থাৎ নদীটি খালে পরিণত হয়েছে। সেতুর পূর্ব পাশেও দুই পাড়ে অসংখ্য পাকা ভবন। এক শ্রেণির লোকজন নানা কাগজপত্র দেখিয়ে এসব জায়গা নিজেদের দাবি করে আসছে।
শহরের কালীবাড়ির কিছু অংশ নেমে গেছে নদীর মধ্যে। সেখানেও দখল হয়েছে নদীর জায়গা। হেলাই হাসপাতালের নিচে নদীর মধ্যে বিশাল বড় পুকুর কাটা হয়েছে। এ পুকুরপাড়ে বিশাল বিশাল গাছ রয়েছে। যেগুলো নদীর পানির গতিপথই নয়Ñগোটা নদীটিই আড়াল করে দিয়েছে। নিশ্চিন্তপুর এলাকার নদীর মধ্যে ঈদগাহ নির্মাণ করা হয়েছে। এভাবে চিত্রা নদীর কালীগঞ্জ অংশের বেশিরভাগ জায়গা দখল করে নিয়েছেন দখলদাররা।
শুধু দখল নয়, নদীতে নানা ধরনের ময়লা ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। ক্লিনিকের বর্জ্য, শহরের ময়লা ফেলে পানি দূষণ করা হচ্ছে। একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রায়ই এক শ্রেণির মানুষ বস্তায় ভরে ময়লা এনে সেতুর ওপর থেকে নিচে পানিতে ফেলে। এই বস্তায় নানা ধরনের ময়লা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে কুকুর-বিড়াল মারা যাওয়ার পরও বস্তায় ভরে নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে।
শহরের সিনেমা হল এলাকার বাসিন্দা মোশারফ হোসেন জানান, প্রায়ই তাদের চোখে পড়ে নদীতে ময়লা ফেলা হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে উল্টো খারাপ আচরণ করে দখলদাররা।
এ বিষয়ে নদীর জায়গায় মুরগির খামার গড়ে তোলা মুক্তার হোসেন জানান, বেশ কয়েক বছর আগে তিনি ঘরটি নির্মাণ করেছেন। সে সময় বাধা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে সরকারি লোকজন নদীর সীমানা মেপে তাকে ঘরটি নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে। লিখিত অনুমতি আছে কি না জানতে চাইলে মৌখিক অনুমতি পেয়েছেন বলে জানান তিনি। তাছাড়া সম্প্রতি তিনি নতুন করে কাজ করেননি। ঝড়ে কিছুটা ক্ষতি হলে শুধু তা মেরামত করেছেন।
নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নদীর মাঝে পুকুর রয়েছে তারিকুর রহমানের। তিনি জানান, নদীর ওপর তাদের জমি রয়েছে। সেখানে পাড় ঘেঁষে পুকুর তৈরি করেছেন। নদীর মধ্যে পুকুরের অংশ যায়নি বলে জানান তিনি। হেলাই গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানায়, তাদের গ্রামের নিচে নদীর অপর পাড় দখল করে ঈদগাহ নির্মাণ করা হয়েছে। যে স্থানে মাত্র ১৫ থেকে ২০ বছর আগেও নদীর স্রোত ছিল।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুবর্ণা রানী সাহা জানান, এগুলো উচ্ছেদের জন্য গণজাগরণ প্রয়োজন। যারা এভাবে দখল করছে, তাদের বিরুদ্ধে শুধু আইন দিয়ে কাজ হবে না। নদীর মধ্যে ভবন, পুকুর এগুলোর বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

সর্বশেষ..



/* ]]> */