মত-বিশ্লেষণ

কাশ্মীর পরিস্থিতি: টানটান উত্তেজনা

ডিএস হুদা: বিভিন্ন রাজ্য সরকার জম্মু ও কাশ্মীরের অধিবাসীদের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার পরামর্শ দিয়েছে। এই পদক্ষেপটা এখন মোক্ষ হওয়া উচিত। রাজ্যটির মানুষের মধ্যে এই প্রচারণাটিও পৌঁছে দিতে হবে। জম্মু ও কাশ্মীরজুড়ে একটি গুজব রটে বেড়াচ্ছে, ৩৭০নং ধারা বাতিল হয়ে গেছে। আর রাজ্যটি দুটি ধারার সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বলা চলে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করার ক্ষেত্রে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা এবং নিরাপত্তা হুমকির ক্ষেত্রে এগুলোকেই দলিল হিসেবে পেশ করা যায়। কিন্তু এসবের ভেতর দিয়ে মনে মনে কিছু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে। ৩৭০ ধারাটির আলোচনায় দুটি দিক রয়েছে। এই বিষয়টি এখন পার্লামেন্টে ব্যাপকভাবে তোলপাড় সৃষ্টি করবে। এমনকি এই উত্তেজনা সুপ্রিমকোর্টকেও উত্তপ্ত করবে। যাহোক ইউনিয়ন গভর্নমেন্ট এ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় কাজটি হলো এ সিদ্ধান্ত থেকে আসা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জকে সামলাতে পারা।
প্রথম চ্যালেঞ্জটির সঙ্গে রয়েছে অনিবার্য পরিণতি। নিঃসন্দেহে কাশ্মীর উপত্যকার এই অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়বে। একই রকম বিপর্যস্ত পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে সৃষ্টি হয়েছিল ২০১৬ সালে বুরহান ওয়ানিকে হত্যা করার পর। তবে ২০১৬ সালের সঙ্গে এবারের পরিস্থিতিতে কিছুটা তফাত রয়েছে। এবারে সরকার ও নিরাপত্তা বলয় উন্নত প্রস্তুতি নিয়েছে। তাই তারা এখানকার যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে বলতে হবে। ২০১৬ সালে বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আকস্মিকভাবে হামলে পড়ে। কিন্তু এবার সাম্প্রতিক সময়ে জম্মু ও কাশ্মীরে সরকার আগে থেকেই অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করে রেখেছে। এটা রাজ্য সরকারকে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে।
যদি অনেক বড় ধরনের বিক্ষোভ হামলে পড়ে, সেক্ষেত্রে কী হবে? তখন সরকার কীভাবে তা প্রশমন করতে পারবে, সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা নিশ্চিত যে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির একেবারে অধঃপতন কোনোভাবেই বরদাস্ত করা চলবে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী কী ধরনের প্রতিরক্ষা কৌশল গ্রহণ করবে, সেটাই দেখার ব্যাপার। নাগরিকদের মধ্যে যদি বিপুল সংখ্যায় নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে যায়, তবে তার ক্ষত কিন্তু ছোট হবে না, সেটাকে বহুকাল ধরে বয়ে বেড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে সমাধান বের করাটা খুবই কঠিন হয়ে যাবে।
তবে কাশ্মীরের ঘোলা জলে পাকিস্তান যে মাছ শিকার করবে, সেটা অনাকাক্সিক্ষত হবে না। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতা করার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বলা যায়, পাকিস্তান নিশ্চয় এ ইস্যুটাকে আন্তর্জাতিক তকমা লাগানোর চেষ্টা করবে। তবে আমি মনে করি না যে, পাকিস্তান তার কূটনীতি ব্যবহার করে খুব বেশি সফল হতে পারবে, কেননা পুরো বিশ্ব পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী ছলনা দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব দেখবে এই ইস্যুটি একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ। তবে পাকিস্তান অবশ্যই কাশ্মীরের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সহযোগিতা করবেই। সম্ভবত কাশ্মীরে আজাদি কাশ্মীরকে তাদের সমর্থনদানের এটাই হবে শেষ সুযোগ। যদি পাকিস্তান এক্ষেত্রে কোনো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দেয়, তবে তারা কেবল কাশ্মীরেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে না, বরং তারা লস্কর-ই-তাইবা ও জইশ-ই-মুহাম্মাদের মতো গোষ্ঠীরও সমর্থন হারাবে। মনে রাখতে হবে, এই গোষ্ঠীগুলো ইন্টার-সার্ভিস ইন্টেলিজেন্সের হাতিয়ার।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, এ পরিপ্রেক্ষিতে জবাব দিতে গেলে পাকিস্তানের কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। তাদের কিছু আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে এবং আর্থিক পরিস্থিতি সংগত নয়। তবে পাকিস্তানকে এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যেখানে কোনো প্রচলিত দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে। ভারতীয় সেনা যেভাবে জম্মু কাশ্মীর সীমান্তে মোতায়েন করা হয়েছে, তাতে করে বলা চলে এই মোতায়েন প্রক্রিয়া খুব বলিষ্ঠ ও শক্ত-সমর্থ। ফলে বড় ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটা সহজ হবে না। এখানেই শেষ নয়, বড় বড় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য কিন্তু অতি সহজে শেষ হবে না। এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে গোয়েন্দা বাহিনীর কাজ করতে হবে। তারা কতখানি সফল হবে, সেটাই দেখার বিষয়। নিশ্চিত হতে হবে আর যেন কোনো পুলওয়ামার হামলার মতো ঘটনা না ঘটে।
নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে দিয়ে এই পরিস্থিতিকে যে কোনো উপায়েই হোক মোকাবিলা করতে হবে। তবে সরকার যদি এই অঞ্চলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে কোনো আইন বিধিমালা তৈরির দিকে যায়, কিংবা কোনো চুক্তি-সন্ধি করে, তা অবশ্যই স্থানীয়দের অংশগ্রহণেই হতে হবে। তবে এই কাজটি এখন সহজ নয়। খুবই দুরূহ। কেননা সরকার এরই মধ্যে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে বিশ্বাসের জায়গা একেবারেই শূন্য। এখন কেউ কাউকে বিশ্বাস করবে না। আর যদি কোনো জোটবদ্ধতা বা কোনো সমঝতা না হয়, তবে ধরেই নিতে হবে এখানে খুব তাড়াতাড়ি কোনো শান্তি আসছে না। একটি দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্ব এখানে চলতেই থাকবে।
মিলিটারিতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হলো বাকযুদ্ধে জয়ী হওয়া। এটা একটা কাউন্টার ইনসার্জেন্সি অভিযান। এটাকে যোগাযোগের সক্ষমতাও বলা হয়। এর ফলে তরুণদের কট্টরতা থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। আর তা যদি করা সম্ভব হয়, তবে সরকারের পক্ষেই ফসল ঘরে উঠবে। কিন্তু কাশ্মীর ইস্যুতে এ কৌশল অবলম্বন করার কোনো চিহ্ন আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এমনকি এটা কখনও ঘটবে বলে মনে হয় না।
তবে এটাকে মৌখিক বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা বোঝায় না। এখানে সততা দেখাতে হয় কাজের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্বে বিশ্বাসযোগ্যতা এখানে মোক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। তারাই সমাধান বের করতে পারে। তবে সরকার যদি এখানে জয়-পরাজয়ের তকমা লাগাতে যায়, তবে সেটা হবে মস্ত বড় ভুল। তাহলে কোনো সমাধানই আসবে না। মনে রাখা উচিত, এখানে সবারই জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, তাই কেউ পিছু হটবে না। বিভিন্ন রাজ্য সরকার জম্মু-কাশ্মীরে নাগরিক নিরাপত্তা বাড়ানোর যে দাবি জানিয়েছে, তা একটি ভালো সিদ্ধান্ত ছিল। আসলে সেখানকার জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন মুখ্য বিষয়।
মনে রাখা দরকার, ৩৭০ ধারা বাতিল করা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। সরকার যেহেতু এটা বাতিল করতে বদ্ধপরিকর এবং করবে বলেই
মনে হচ্ছে, তাহলে খুব ভালোভাবে এই বিষয়টিকে সামলাতে হবে।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.), নর্দান কমান্ড

হিন্দুস্তান টাইমস থেকে
ভাষান্তর: মিজানুর রহমান শেলী

সর্বশেষ..