সুশিক্ষা

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ১৪তম বর্ষে পদার্পণে ভাবনা ও প্রত্যাশা

২০০৬ সালের বাংলাদেশের ২৬তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের  মধ্য-পূর্বাঞ্চলের কুমিল্লায় বিখ্যাত শালবনবিহারের কোলঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চারটি অনুষদের অধীনে সাতটি বিভাগের ১৫ শিক্ষক ও ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৭ সালের ২৮ মে। গত ২৮ মে বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৪ বছরে পদার্পণ করেছে। বিগত বছরগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নানা পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে ১৯টি বিভাগে অধ্যয়ন করছে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী। বিভিন্ন বিভাগের সাতটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা তাদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাদের অনেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪তম বর্ষে পদার্পণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মতামত ও প্রত্যাশা রয়েছে সাবেক শিক্ষার্থীদের। তাদের অভিমত জানার চেষ্টা করেছেন মো. জাহিদুল ইসলাম

লালমাটির পাহাড়ি প্রাকৃৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা ভবনগুলো থেকে আকাশ ও প্রাকৃতিক শোভা দেখলে বুক ভরে যায়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় বৃহত্তর কুমিল্লার মানুষের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার কেন্দ্র। ছাত্রজীবন ও কর্মজীবন মিলিয়ে প্রায় ৯ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়কে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়। নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সব অপূর্ণতা পূর্ণ হবে বলে আমার বিশ্বাস। ৫০ একরের ক্যাম্পাস রূপান্তরিত হবে ২৫০ একরে। নির্মিত হবে আধুনিক ক্লাসরুম। শিক্ষার্থীদের গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা প্রয়োজন।
নূর মোহাম্মদ রাজু, প্রভাষক, বাংলা

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আমার স্বপ্ন ও সাহসের উৎস। এ বিশ্ববিদ্যালয় শত প্রতিকূলতা আর সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে পথচলার বাঁকে বাঁকে উপহার দিয়েছে অনেক মেধাবী মুখ। শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মচর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক উন্নয়ন ও নেতৃত্বের বিকাশে মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এ বিদ্যাপীঠটি। তবু সময়ের পরিক্রমায় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সমৃদ্ধ করতে পর্যাপ্ত গবেষণা বরাদ্দ, ডিজিটাল গবেষণাগার নির্মাণ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিভাগীয় গ্রন্থাগার, সব অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অটোমেশন ব্যবস্থা, যথাযথ আবাসন ব্যবস্থা, শারীরিক ও মানসিক উন্নয়নে স্বাস্থ্যবিমা চালু, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সেমিনার-মিলনায়তন কক্ষ, সুপরিসর খেলার মাঠ, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আইডিয়া এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম ও বার্ষিক আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলন আয়োজন করা জরুরি। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত প্রজন্মের দেশপ্রেম শানিত করতে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি মাইলফলক তৈরি করা যায়।
আমেনা বেগম, প্রভাষক, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি)

আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে শিক্ষক হয়েছি, যা আমার জীবনের তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১২ বছর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যথেষ্ট নয় একটি অর্থপূর্ণ অবস্থানে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে। কেননা নবপ্রতিষ্ঠিত প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়কে নানা সংকট, যেমন বাজেট, রাজনৈতিক অবস্থা, সর্বোপরি নেতৃত্বের সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয় বা হচ্ছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তবে প্রতিকূলতার মাঝে প্রাপ্তিও কম নয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির অনুষদ সদস্য ও পাস করে যাওয়া শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ ও বিশ্বদরবারে ছোট পরিসরে হলেও পরিচয় এনে দিয়েছে।
মো. নাজমুল হক, প্রভাষক, লোকপ্রশাসন
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সুষ্ঠু জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরির প্রয়াস নিয়ে আমাদের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে চলেছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ড নির্ণয়ে যে বিষয়টি খুবই গুরত্বপূর্ণ সেটি হলো শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং এই নিশ্চয়তার ধারায় সব উন্নয়নমূলক কাজকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত ও গতিশীল করা। সামনের দিনগুলোয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকসই ও যুগোপযোগী উন্নয়নের ধারা আরও বেশি গতিশীল হবে এবং জাতীয় নেতৃত্ব (সব ক্ষেত্রে) তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়টি অনেক দূর এগিয়ে যাবে এ প্রত্যাশা করি।
মো. আওলাদ হোসেন, প্রভাষক, মার্কেটিং

হয়তো নেতিবাচক কথা বলতে গেলে অক্সফোর্ড নিয়েও দু-চার কলম লিখে ফেলা যাবে, তাই আমি পজিটিভ ও অপটিমিস্টিক থাকতেই পছন্দ করি। ক্যাম্পাসে আমি তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র হিসেবে যেদিন পা ফেলি, সেদিন থেকেই আমরা শুধু শুনতে পেতাম এটা নেই, সেটা নেই। পরবর্তীকালে রিঅ্যাডমিশন নিয়ে চতুর্থ ব্যাচে কন্টিনিউ করি ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য। ক্লাস নেই, ল্যাব নেই, আসবাব নেই, শিক্ষক নেই, বাস নেই, ক্যাফে নেই, মসজিদ নেই, হলের আবাসন ব্যবস্থা নেই এমন আরও অনেক কিছুই নেই বলে শেষ করা যাবে না সেই ‘নেই’-এর খাতা। শুধু তা-ই নয়, প্রতিনিয়ত মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হতো এটা শোনার জন্যে যে, ক্যাম্পাস অনির্দিষ্ট কালের জন্যে বন্ধ, ফল সেশনজট। মিডিয়ার নেগেটিভ নিউজ তো রেগুলার নিউজে পরিণত হয়েছিল একপর্যায়ে। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্য যে, এত-শত হতাশার ভিড়েও আমাদের ছাত্রছাত্রীরা ধৈর্য হারায়নি; শিক্ষকদের পরিশ্রম ও অনুপ্রেরণায় স্বপ্ন দেখতে ভোলেনি ছাত্ররা। নিজেদের ওপর রেখেছিল অগাধ বিশ্বাস। সমস্যা উত্তরণে প্রথম ব্যাচগুলোকে কী পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, এই গল্প না হয় তোলা থাক। কুবির নাম শুনেই অনেকে ভাইভাতে চমকে যেতেন, সেই কুবির ছাত্ররাই আজ চমক লাগিয়ে দিচ্ছেন নিজ যোগ্যতায়। মাঝের কিছু বছরে অনেক চিত্র পাল্টে গেছে, উন্নত হয়েছে আমাদের ছাত্রছাত্রীর মানসিকতা, পাল্টে গেছে ক্যাম্পাসের সেই ‘নেই’-এর দিনগুলো।
শাহরিয়ার অনিক, প্রভাষক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই)

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পদার্পণ হয় ২০০৯ সালে। সে হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার ১০ বছরের পথচলা এর মধ্যে আট বছর শিক্ষার্থী ও দুই বছর শিক্ষক হিসেবে। যে প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা কি পূরণ হয়েছে, নাকি এখনও অনেক বাকি? একজন শিক্ষকের প্রত্যাশার সঙ্গে যেমন একজন ছাত্রের প্রত্যাশা কিছুটা ভিন্ন হয়ে থাকে, তেমনই পুরো প্রত্যাশা আরও ভিন্ন হয়। এখানকার সবচেয়ে বড় যে সমস্যা প্রতীয়মান, সেটা হলো সেশনজট। একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে কুবিতে যেসব সংকট (ক্লাসরুম, ল্যাব অপ্রতুলতা, আবাসন, পরিবহন সংকট) ও সমস্যা বিদ্যমান তার নিরসন জরুরি। শিগগির বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবর্তন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করি। নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মহলের প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে কুবি। এ ধারা অব্যাহত থাকবে তা প্রত্যাশা করি।
খাইরুন নাহার, প্রভাষক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং

সর্বশেষ..