‘কৃষককে প্রযুক্তির সদ্ব্যবহারও জানতে হবে’

 

কৃষিকাজে সফলতার পরিপ্রেক্ষিতে ঝিনাইদহের গান্না গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন অর্জন করেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। সম্প্রতি এক আলাপচারিতায় তার উদ্যোগের উৎকর্ষ ও ব্যবসার খুঁটিনাটি জানার চেষ্টা করেছেন দেলোয়ার কবীর

শেয়ার বিজ: আপনার সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।

আলতাফ হোসেন: কৈশোরে দারিদ্র্যর কারণে সবজি বহনকারী ট্রাকশ্রমিকের কাজ করি। তখন থেকে বুঝতে শুরু করি, সবজিচাষিরা মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারদের কাছে কতটা অসহায়। গ্রামে ফিরে সিদ্ধান্ত নেই এ পেশায় আর থাকবো না। বাবার সঙ্গে একজন সচ্ছল কৃষকের মাঠে কাজ শুরু করি। এর ফাঁকে কিছু জমি লিজ নিয়ে কয়েক বছর চাষাবাদ করার পর নিজের মতো করে সবজি আবাদে সফল হই। এলাকার কৃষি বিভাগীয় মাঠকর্মীরা এক্ষেত্রে আমাকে বেশ সহযোগিতা করেছেন।

শেয়ার বিজ: আপনার উদ্যোগ সম্পর্কে বলুন।

আলতাফ হোসেন: নব্বইয়ের দশকে প্রাচীন পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষণ শুরু করি। এ-সংক্রান্ত খবর একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশের পর দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় তা আলোড়ন সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ কিছু সংস্থার কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিষয়ক কর্মকর্তা ভিড় জমাতে শুরু করেন আমাদের গ্রামে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা কিছু প্রশিক্ষণও দেয় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশসম্মত অধিক উৎপাদনের জন্য।

শেয়ার বিজ: চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোগী হলেন কেন? এ গল্প শুনতে চাই।

আলতাফ হোসেন: দারিদ্র্যের কারণে যেহেতু লেখাপড়া করতে পারিনি, কৃষি পেশাকেই তাই সর্বোত্তম বলে মনে করেছি। কৃষিকেই ধ্যান-জ্ঞান বিবেচনা করে এগিয়ে চলেছি। বর্তমানে নিজের ৪৫ বিঘা জমিসহ ১৪৫ বিঘা জমিতে জৈব পদ্ধতিতে পেঁপে, কলা, ঢেঁড়শ, শাক, পটোল, করলা ও বেগুন চাষ করছি। যথাসম্ভব বিষমুক্ত রাখার চেষ্টা করি সব ধরণের ফসল। এখানে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জন শ্রমিক কাজ করেন।

শেয়ার বিজ: আপনার উদ্যোগ বা প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব কী?

আলতাফ হোসেন: ট্রাকে সবজি পরিবহনের সময় আমি দেখেছি, বস্তায় ভরার পরও একাধিকবার বিষ প্রয়োগ করা হয় পোকা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তোলে। তখন থেকেই আমি বিষমুক্ত সবজি আবাদের সংকল্প করি। আমার কোনো সবজিক্ষেতেই ক্ষতিকর কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় না। ফলে ভোক্তারা নিরাপদ সবজি পান। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কথা বিবেচনা করে সবজি মাঠে বসিয়েছি সৌরবিদ্যুতের প্লান্ট।

শেয়ার বিজ: কোনো সমস্যায় পড়েছেন কি?

আলতাফ হোসেন: সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রামসহ রাজধানীর শ্যামবাজার ও যাত্রাবাড়ীতে সবজি পাঠাই। এর মধ্যে আমার কাছ থেকে নেওয়া সবজির বড় একটা অংশই রফতানি হয়। সবজি রফতানির জন্য আগে থেকে বিমানের কার্গো সেকশনে বুকিং দিতে হয়। গ্রেডিং ও ধোলাইসহ আনুষঙ্গিক কাজের পর সময়মতো কার্গোতে পাঠানো না গেলে ওইসব সবজি বিমানে অফলোড হয়ে যায়। ফলে তা যেমন ফিরিয়ে আনা যায় না, ভালো দামে স্থানীয় বাজারেও বিক্রি করা যায় না। ফলে অবিক্রীত সবজি ফিরিয়ে আনতে যে খরচ হয়, তাতে বড় অঙ্কের ক্ষতির বোঝা বইতে হয়।

শেয়ার বিজ: বর্তমান প্রতিবন্ধকতাগুলো কী?

আলতাফ হোসেন: ঝিনাইদহ ও আশপাশের রাস্তাঘাটের অবস্থা বেশ নাজুক। ভাঙাচোরা, মেরামতহীন রাস্তায় সবজি বোঝাই ট্রাক বা ছোটখাটো যানবাহন আটকা পড়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মাঝেমধ্যে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটে। এতে যেমন ব্যয় বাড়ে, সময়ও বেশি লাগে।

শেয়ার বিজ: সমস্যা সমাধানে কী করা যেতে পারে বলে মনে করেন?

আলতাফ হোসেন: আমাদের দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি বলা যায় কৃষিকে। সেহেতু দেশের আর্থসামাজিক দিক বিবেচনা করে অতি দ্রুত রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, সবজি পরিবহনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা ও পরিবহন শ্রমিকদের আন্তরিক সহযোগিতা খুবই জরুরি। একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আর্থিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।

শেয়ার বিজ: নতুন উদ্যোক্তার জন্য কিছু বলুন।

আলতাফ হোসেন: দেশে প্রযুক্তির ব্যবহার করে ফসল উৎপাদনের হার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তাই টিকে থাকতে হলে একজন কৃষককে অবশ্যই লেখাপড়া জানতে হবে। জানতে হবে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার-পদ্ধতিও। না হলে সফলতার মুখ দেখা সম্ভব নয়।