কৃষিকাজ কি কখনও লাভজনক পেশা হয়ে উঠবে?

ড. আর এম দেবনাথ: গম চাষের ওপর একটা খবর দেখলাম। এতে বলা হয়েছে, এবার কৃষক গম চাষে যায়নি। গত তিন দশকের মধ্যে এবার গম চাষের জমির পরিমাণ সবচেয়ে কম। এর কারণ কী? দুটি কারণের কথা বলা হয়েছে। গম চাষের সময় বৃষ্টিপাত হয়নি। দ্বিতীয় অন্যতম কারণ হচ্ছে, গমের চেয়ে চালের দাম বেশি। কারণের কথায় পরে আসছি। আগে বলা দরকার এর ফল কী, সে সম্পর্কে। দেশের মানুষ এখন আটার রুটি খায়, আটায় তৈরি খাবার খায়। অথচ গম উৎপাদনে বাংলাদেশ অগ্রণী নয়। অতএব প্রতিবছর বহু টাকা খরচ করে গম আমদানি করতে হয়। তথ্যে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ৫৬ লাখ ৯০ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে ৩৮ লাখ টনের মতো গম আমদানি হয়েছে। আরও আমদানি করতে হবে। যেহেতু গমের চাষ কম হয়েছেÑঅতএব ধারণা করা হচ্ছে, গত অর্থবছরের তুলনায় এবার আরও বেশি গম আমদানি করতে হবে। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। এমনিতে বাজেটের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে। ‘ব্যালান্স অব পেমেন্ট’ চাপের মধ্যে। আমদানি ব্যয় বেশি, রফতানি আয় এবং অন্যান্য আয় ও প্রাপ্তি কম। এমতাবস্থায় বাজেটের ওপর অধিকতর চাপ প্রায় সংকট সৃষ্টি করবে বলে ধারণা।

এ আলোচনা যেহেতু ভিন্ন, আমি তাই কৃষকের আলোচনায় ফিরে যেতে চাই। দেখা যাচ্ছে, ইদানীং কৃষক এক ফসল থেকে অন্য ফসলে যাচ্ছে। যেখানেই সে একটু দাম বেশি পাচ্ছে, সেখানেই যাচ্ছে। ধানে পোষাচ্ছে না, সে যাচ্ছে শাকসবজি চাষে। শাকসবজিতে পোষাচ্ছে না, যাচ্ছে ফলমূল চাষে। ধান-গম চাষে পোষাচ্ছে না, সে যাচ্ছে মাছ চাষে জমিকে পুকুরে পরিণত করছে। এ সুবিধা আগে ছিল না। এখন দুটো পয়সা বেশি আয়ের জন্য কৃষক এক ফসল থেকে অন্য ফসলে, শাকসবজি ও ফলমূল-মাছ চাষে যাচ্ছে। এর কারণ কী? কারণ ‘স্বেচ্ছা পরিবর্তন’ নয়। আসলে কৃষিকাজ একটা লোকসানি কারবার। লোকসান কোথাও কম, কোথাও বেশি। এমন নয় যে, অন্যত্র কৃষিকাজ অর্থাৎ অন্য ফসল লাভজনক। সাধারণভাবে তা নয়। তবু কৃষক লাভের আশায় ফসল পরিবর্তন করছে। কিন্তু সে লাভের মুুখ দেখে না। অথচ কৃষক যদি লাভের মুখ না দেখে, তাহলে এই বাজার অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। বাজার অর্থনীতিতে জিনিসের দাম নির্ধারিত হয় চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে। চিৎকার করা হলেও মূল্যবৃদ্ধি ঘটে এবং তা বাজারই করে। ধরা যাক একটি উদাহরণের কথা। যাদের বয়স ষাটের ঊর্ধ্বে, তারাই জানেন পাকিস্তান আমলে এক সের (কেজি থেকে সামান্য কম) চালের দাম কত ছিল। বেগুন, পটোল, আলু, মুলা, লাউ, কচু, উস্তা, শসা ইত্যাদির সের কত ছিল। মাছের দাম কত ছিল, তাও তারা জানেন। ফলমূল, দুধ-মাংস, মুরগি ইত্যাদির দাম কত ছিল, তাও জানা। এখন এ মুহূর্তে এসবের দাম কত? ২০১৮ সালে শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস, দুধ-ডিমের দামের সঙ্গে পাকিস্তান আমলের দাম বিচার করলে দেখা যাবে, এসব জিনিসের দাম ১০০ থেকে তিনশ-চারশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃদ্ধি পায়নি কেবল চালের দাম। চালের দাম মোটামুটি ৪০-৬০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ বাজার অর্থনীতি চালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে এর দাম কেজিপ্রতি হতে পারত অনেক বেশি। এর পরিমাণ কত? পরিমাণ কত হওয়া উচিত তা হিসাব করতে হবে। তবে একটি হিসাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত সপ্তাহের কোনো এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ৪০ টাকা কেজি চালের দাম হলে কৃষকের পুষিয়ে যাবে। দেখা যাচ্ছে, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও একই কথা বলছেন। তিনিও বলছেন ৪০ টাকার কথা। খাদ্যমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীদ্বয় এ ব্যাপারে কিছু বলেননি। অথচ তারা দুজন এ বিষয়ে খুবই সম্পৃক্ত মন্ত্রী। তবু যেহেতু সরকারের দুজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ৪০ টাকা দরের চালের কথা বলেছেন; অতএব এর ওপর ভিত্তি করেই আলোচনা করা যাক। আসলে চালের দর ৪০ টাকা হবে না ৫০ টাকা হবে, না ৩০ টাকা হবে এটা আমার কাছে বিবেচ্য নয়। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কৃষি পেশা। দেখা যাচ্ছে, যুগের পর যুগ কৃষকরা বঞ্চিত। তারা কখনও তাদের পণ্যের মূল্য পাচ্ছে না। সরকার ভর্তুকিতে সার, বীজ, সেচের জল, কীটনাশক ও বিদ্যুৎ দেয়। এবং প্রত্যেক বছর কৃষকের কাছ থেকে ধান-পাট-গম ইত্যাদি একটা নিন্মতম দামে কিনে নেয়। যদিও এ কার্যক্রম ততটা দক্ষ নয়, তবু এতে কিছুটা স্বস্তি কৃষক পায়। কিন্তু এতে কেউ সন্তুষ্ট নয়। না চালের সাধারণ ক্রেতা, না কৃষক। নানাবিধ অভিযোগে বিদ্ধ এসব প্রক্রিয়া। এখন প্রশ্ন, চালের দাম বাজারের দামের মতো করলে সাধারণ ক্রেতা তা কিনতে পারবে না। আবার চালের দাম নিচু থাকলে কৃষকের পোষায় না। এটা কাম্য পরিস্থিতি নয়। দেশবাসীর সামনে প্রশ্ন কীভাবে কৃষককে বাঁচানো যায় এবং কীভাবে চাল ভোক্তাদেরও বাঁচানো যায়। দৃশ্যত দেখা যাচ্ছে, লোকসানি কারবার কৃষিতে এখন কৃষকের ছেলেরা যুক্ত থাকতে চায় না। গ্রামের কৃষকের ছেলেরা একটু বেশি আয়ের আশায় চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলোতে সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান ও দুবাইতে। পুবের দেশ মালয়েশিয়ায়ও যাচ্ছে অনেক কৃষকপুত্র। এদিকে যেসব কৃষকপুত্র বিএ-এমএ পাস করেছে, তারা চায় চাকরি। চাকরি, বিশেষ করে সরকারি চাকরি কত লোভনীয়Ñতারা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। রাতারাতি ভাগ্য পরিবর্তন। চাকরি যায় না, পদোন্নতি নিয়মিত। শুক্র-শনিবার নয়, সারা সপ্তাহ বাড়িতে থাকলেও ছুটির কোনো প্রয়োজন নেই। তাই সবাই চায় সরকারি চাকরি। বোঝাই যাচ্ছে, কৃষির সঙ্গে কৃষকপুত্ররা আর জড়িত থাকতে চায় না। অভিভাবকরাও চায় না তাদের ছেলে কৃষির সঙ্গে জড়িত হোক। বাড়িতে থাকলেও দেখা যায় ছেলেরা ‘লায়েক’ হলেই জমি বিক্রি করে দালালের পেছনে ঘোরে মধ্যপ্রাচ্য যাওয়ার জন্য। এই যে বর্ণনা দিলাম, তা মনগড়া নয়। গ্রামাঞ্চলের যে কারও সঙ্গে কথা বললে এ অবস্থার কথাই জানা যাবে। কৃষি যে লোকসানি কারবার, এর কথা তারা অকপটে বলবেন। কৃষকরা ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠে আজানের আগে। লাঙল ও বলদ নিয়ে ছোটে মাঠে। সকালের নাশতা ক্ষেতেই তারা খায়। পড়ন্ত বিকালে বাড়ি ফিরে গা-গোসল করে তারা। প্রদীপ জ্বালার আগেই দুমুঠো ভাত খেয়ে নিদ্রা যায়। সেচের জলের অভাব, বিদ্যুৎ নিয়মিত নয়, সার পেতে কষ্ট, হাতে নগদ টাকা নেই, বীজ আনতে হয় বাজার থেকে। এদিকে ফসল বিক্রির সময় দুর্দশা। বাজারে ক্রেতা নেই। ক্রেতা থাকলে দাম নেই। কলা, লাউ, ফুলকপি ইত্যাদি বাজারে ফেলে রেখে বাড়ি ফিরতে হয়। এত বিড়ম্বনার পরও তারা লাঙল ধরে রেখেছে। ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াচ্ছে, পরাচ্ছে। তাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে যারা বিদেশ গিয়েছে, তারা নিয়মিত টাকা (ডলার) দেশে পাঠাচ্ছে। তাদের টাকা তারা বিদেশে রাখে না।

এমন একটা পেশা কৃষি ও কৃষক ডজন ডজন বছর ধরে অবহেলিত। যাদের কোনো বিকল্প নেই, তারাই আজ লাঙল ধরে রয়েছে। কত আশ্বাস, কত কথা, কথা আশার বাণী কত লোক জানাল আজও তার কোনো ফলোদয় হয়নি। কবে হবে কৃষি লাভজনক পেশা? কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণের কথা বলা হয়। সারা দেশে বাজার প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখান থেকে সরাসরি পণ্য কিনবে সরকার। কৃষিপণ্যের জন্য হবে বিমার ব্যবস্থা। কৃষকের জন্য হবে বিমা। কৃষিপণ্য রাখার জন্য হবে কোল্ডস্টোরেজ। আরও কত আশ্বাস বাণী। কিন্তু তার বাস্তবায়ন কোথায়? কৃত্রিম সার ব্যবহার করতে করতে জমির উপরিভাগ ধীরে ধীরে হয়ে পড়ছে বালুভর্তি। জৈব সারের ব্যবস্থা নেই। গরু নেই যে গোবর ব্যবহৃত হবে। বৃক্ষ নেই যে তার পাতা পচে সার হবে। ঘাস নেই যে গরু পালা যাবে। সবই ধীরে ধীরে কৃষকের আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। বীজধানের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে নেই। বীজ সব পাইকারের হাতে। নতুন কৃষি, নতুন সব ব্যবস্থা। বড় শখ করে ফুলওয়ালাদের কাছ থেকে কিছুদিন আগে এনেছিলাম গাঁদাফুলের একটা টব। কী সুন্দর চার-পাঁচটা গাঁদাফুল! দাম খুবই কম। আছে বেশ কিছু কলি। বাড়িতে যতœ করে রাখলাম। দেখা গেল, কলি আর ফুটছে না। সব শুকিয়ে গেছে। যে চার-পাঁচটা গাঁদাফুল প্রথমে ফোটা অবস্থায় ছিল, তাই শেষ ভরসা। কৃষিতেও এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বলে অনেকের শঙ্কা। অথচ কৃষিকে কৃষকের আয়ত্তে আনা দরকার, তার নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। কথা উঠেছে যান্ত্রিকীকরণের। পর্যাপ্ত কৃষিশ্রমিক গ্রামে পাওয়া যায় না। অতএব কৃষিজাতীয় সব কাজে যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু আমাদের জমি তো খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত। মালিকানা ছোট ছোট। জমির পরিমাণ বেশি না হলে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করে বাণিজ্যে পরিণত করা কঠিন নয় কি? এছাড়া কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হলে, কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ করতে হলে দরকার প্রচুর বিনিয়োগ। অথচ দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি বিনিয়োগ কৃষিতে তেমন নেই। সরকারি বিনিয়োগও দিন দিন হ্রাসমান। আমরা ‘মেগা প্রজেক্টে’ মনোনিবেশ করেছি। ছোটখাটো কোনো জিনিস আর কারও নজরে পড়ছে না। এদিকে কৃষকের হাতে টাকা নেই, উদ্বৃত্ত নেই। তার পুঁজি কোত্থেকে আসবে? সে তো ফসলের ন্যায্যমূল্যই পায় না। সে ঋণও পায় না। সরকারি ব্যাংক কিছু ঋণ দেয়। বেসরকারি ব্যাংক ঋণ দেয় এনজিওর মাধ্যমে। ঋণের ওপর সুদের হার বেশি। শিল্পঋণ, রফতানি ঋণে সুদের হার কত? কৃষিঋণের ওপর সুদের হার কত? দেখা যাবে, এখানেও বৈষম্য। কৃষক ও কৃষি ঠকছে সর্বত্র। এর শেষ কোথায়? কবে, কীভাবে, কে করবে কৃষিকে লাভজনক পেশা?

 

অর্থনীতি বিষয়ের কলাম লেখক

সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়