কৃষিতে বাড়তি প্রণোদনা দরকার

সাইফুল হুদা: খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন যে কোনো দেশের জন্যই গৌরবের বিষয়। প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের জন্য যদি অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়া না লাগে, তবে এতে যে কেবল অর্থ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয় তা-ই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতা, সময়ে-অসময়ে তাদের খবরদারি এড়ানো, এমনকি অন্যায্য বাড়তি চাওয়াও এড়ানো যায়। এছাড়া খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হয়ে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকলে তা অনেক সময় সার্বভৌমত্বের ওপরও আঘাত হানে। গত কয়েক বছর ধরে প্রতিবেশী দেশ নেপাল ভারতের অবরোধের মুখে পড়ে বিষয়টি ভালোভাবেই টের পেয়েছে। দেশের উৎপাদন অবস্থা যা-ই হোক, মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের সরবরাহ নির্বিঘœ রাখা যে কোনো সরকারের, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে দেশের সার্বভৌমত্ব টিকে থাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা সব দেশেরই রয়েছে।

এটা সত্য, বর্তমানে উন্নয়নের জন্য শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের মতো ছোট কিন্তু বহুল জনসংখ্যার দেশগুলোর জন্য কৃষি ও শিল্পÑদুটি ক্ষেত্রেই সমান মনোযোগ দিতে হবে। গত বছর হাওর অঞ্চলে আকস্মিকসহ গোটা দেশে তীব্র বন্যায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতির কারণে চালের দাম ৭০ এবং পেঁয়াজের দাম ১২০ টাকা ছাড়ানো থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট। যদি কয়েক বছর টানা এমন সমস্যা দেখা দেয়, তবে হাতে টাকা থাকার পরও দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যেতে পারে দেশে। অন্তত গত বছরের বন্যায় চালের দাম বাড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে চালের জন্য সবচেয়ে হন্য হয়ে পড়া ক্রেতা বাংলাদেশ হওয়া তো তা-ই প্রমাণ করে। আমাদের সরকারগুলো ক্ষমতায় থাকাকালে নিজেদের উন্নয়ন ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দাবি তুলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আকস্মিক কোনো বিপর্যয় সামনে এলে দেখা যায় যে, তাদের সে দাবি পুরোপুরি না হলেও অনেকাংশে বাস্তবতার সঙ্গে মিল রাখে না।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কৃষকের ছেলেদের উচিত নয় চাষাবাদের পেশা ছেড়ে দেওয়া। যে কারও নিজের পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও কৃষি যেহেতু বাস্তবিক জ্ঞাননির্ভর, তাই ছোটবেলায় বাপ-দাদাদের কাছ থেকে শেখা পেশায় জড়িত থাকলে যে কেউ ভালো করতে পারবে, এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রপাতি আসার কারণে প্রায়োগিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে কৃষিতে ভালো করা সম্ভব। আধুনিক ও উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণ কৃষিতে নিজেদের নিয়োজিত করে ভালো ফল দেখাচ্ছেও। এ অবস্থায় কৃষি বাতায়ন ও কৃষকবন্ধু ফোনসেবা উদ্বোধন করে কৃষকের ছেলেদের কৃষি ছাড়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি দ্রব্য তথা চাল, ডাল, তরি-তরকারি, মসলা ও মাছের বাজার যেমন চড়া, তেমন উচ্চমূল্যের বাজারে কেন কৃষকের পুত্র, এমনকি খোদ কৃষকই নিজের পেশা ছেড়ে দিচ্ছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।

দুজন কৃষকের কাজ ও আয়-ব্যয় নিয়ে একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। সিলেট অঞ্চলে ক্ষেতে ধান কাটছেন এমন একজন কৃষকের কাছে তার অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, চার একর জমি চাষ করে সব খরচ বাদ দিয়ে তার লাভ হলো কেবল খোরাকির ধান। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে নিজের শ্রমও। তার দাবি তিনি যদি এগুলো না করে অন্যের জমিতে কাজ করতেন, তাহলেও আরও ভালো থাকতে পারতেন। অবস্থা যদি এমনই হয়, তবে একজন মানুষ কেন কৃষি কাজ করবে? নিজের সন্তানদের কৃষিতে রাখা বা পড়ালেখার পর তাদের কৃষিতে জড়িত করা তো দূরের বিষয়। আরেক কৃষক জানালেন তারও সব বাদ দিয়ে কেবল খোরাকি টিকে কৃষি থেকে। তিনি বলেন, আধুনিক চাষাবাদ এসেছে, ধানের উৎপাদন বেড়েছে, এমনকি বেড়েছে ধানের দামও। কিন্তু সে দাম তো তারা চোখে দেখছেন না।

এখন প্রশ্ন হলো, সরকারের শীর্ষমহলের লোক ও রাজনীতিবিদরা অনেক সময় বলেন, চালের দাম কমানো হচ্ছে না কৃষক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। কিন্তু আমরা তো দেখছি ভোক্তা বেশ চড়া দামে কিনলেও কৃষক কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে সামান্য দামই পাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধুর বাবা উত্তরবঙ্গের কৃষক। ভালোই জমি আছে তাদের। মাত্র বছর তিনেক আগে ঢাকায় বেড়াতে এসে বললেন, ছেলেটার চাকরি হলেই কৃষিকাজ ছেড়ে দেব। কেনÑজিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘বাবা, পোষায় না’। এ তো গেল একদিক। অন্যদিকে যখন বাম্পার ফলন হয়, বাতাসে ফসলের নাচন দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফোটে সত্য; কিন্তু ফসল তোলার পর সে বাম্পার ফলনই হয়ে যায় বিড়ম্বনার কারণ। খুব দূরে যাওয়ার দরকার নেই, এ বছরই উত্তরবঙ্গে দাম না পাওয়াতে মাঠ থেকে না তুলে গাছে রেখেই বহু কৃষকের টমেটো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়াই এর জ্বলন্ত প্রমাণ। অথচ মাস দুয়েক পরেই ঢাকার ভোক্তাদের শতাধিক মূল্যে কিনতে হবে সবজিটি।

এ অবস্থা থেকে যে কয়টি বিষয় বেরিয়ে আসে তা হলো কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, কৃষকের লাভের অংশ খেয়ে ফেলছে মাঝখানের ফড়িয়া-মধ্যস্বত্বভোগীরা, কৃষিপণ্যের সুষ্ঠু বণ্টন ব্যবস্থা নেই দেশে, মৌসুমে উৎপাদিত পণ্য ভালোভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও নেই, সর্বোপরি সরকার যে কৃষির পেছনে ভর্তুকি দেয় তা প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষক পায় না, বণ্টনের সঙ্গে জড়িতরাই খেয়ে ফেলে। এসব কারণে লাভ তো দূরের কথা, প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক তার বিনিয়োগ ও শ্রমের মূল্যই তুলতে পারে না। ফলে কৃষক কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন, তার ছেলেকে অন্য পেশায় যেতে উদ্বুদ্ধ করবেন, এটিই স্বাভাবিক। আর এ সুযোগ কৃষি উৎপাদক বড় দেশগুলো নিচ্ছে প্রয়োজনের সময়ে অপরিহার্য কৃষিপণ্যের রফতানি স্থগিত ও দাম বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। অন্যদিকে দেশের বড় উৎপাদকরাও তা-ই করছে। চালের দাম আকাশছোঁয়ার সময় রশিদের অটো রাইস ও অন্য বড় রাইস মিলগুলো চালের মজুদ হাওয়া করে দিয়ে বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।

তাহলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে হাঁটার উপায় কী। সহজ পথ হলোÑসবারই জানা, ১৬ কোটির বেশি মানুষের দেশে লাভজনক কোনো পথ পেলেই মানুষ তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সরকার যদি কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম খোদ উৎপাদকের পাওয়া, পরিবহন ব্যবস্থা ভালো, প্রযুক্তি ও ই-কৃষি খাতের প্রসার, ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া, কৃষিঋণের ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করতে পারে, তবে আমাদের তরুণরা নিজেদের স্বার্থেই কৃষিকাজে উৎসাহী হবে। এছাড়া রফতানিতে অবদানের জন্য যেমন পাঁচ শতাংশ ইনসেনটিভ দেওয়া হয়, তেমনই অধিক কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী কৃষককে তার মোট উৎপাদিত পণ্যের দাম ধরে পাঁচ শতাংশ নগদ ইনসেনটিভ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে ছোট-মাঝারি ও বড় কৃষকরা কৃষি কাজে উৎসাহী হবেন। এ ইনসেনটিভ তাদের পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদনের মূলধন হতে পারে। এমনটি হলে কৃষকের সন্তান তো পেশা ছাড়বেই না, বিপরীতে অন্যরাও কৃষিকাজে উৎসাহী হবে।

 

গণমাধ্যমকর্মী

saifulh92Ñgmail.com