কৃষি যন্ত্রাংশ শিল্পের পাশে দাঁড়াতে হবে

সাইফুল হুদা: ব্যাপক সম্ভাবনা ও দেশজুড়ে চাহিদা থাকার পরও বর্তমানে সংকটে রয়েছে বগুড়ার ফাউন্ড্রি ও কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন শিল্প। এটাকে দেশের কৃষি, কৃষি অর্থনীতি, এমনকি গোটা অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য দুর্ভাগ্যই বলা যায়। কেবল ব্যক্তি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে স্বাধীনতার আগে থেকেই ছোটখাটো যন্ত্রাংশ তৈরি শুরু হলেও আশির দশক থেকে বগুড়ায় গড়ে ওঠে ফাউন্ড্রি ও কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন শিল্প। হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে বর্তমানে সেখানে ছোট-বড় প্রায় এক হাজার কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন কারখানা ও একশটির মতো ফাউন্ড্রি কারখানা ছাড়াও আরও কিছু কলকারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় শ্যালো ইঞ্জিনের সেচপাম্প, লায়নার, পিস্টন, টিউবওয়েল, পাওয়ার টিলারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, লেদ মেশিন, গাড়ির ব্রেক ড্রাম, করাতকল, ফ্লাওয়ার মিল, টেক্সটাইল মিল, অয়েল মিল, এমনকি ধানকাটা মেশিনসহ অন্যান্য মেশিনের যন্ত্রাংশ প্রভৃতি তৈরি করা হয়। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষি সরঞ্জাম সরবরাহ করতে সক্ষম বগুড়ার কৃষিশিল্প। এতে বিভিন্ন পর্যায়ে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, যাদের ওপর পরিবারের সদস্যসহ কয়েক লাখ মানুষ নির্ভরশীল।
কৃষি, কর্মসংস্থানসহ গোটা অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখার পরও নানা কারণে বর্তমানে এ শিল্প সংকটের মুখে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ হলোÑকম শুল্ক বা ক্ষেত্রবিশেষে নামমাত্র শুল্কে চীন ও ভারতের তৈরি কম দামি কৃষিযন্ত্রে দেশের বাজার সয়লাব হওয়া, একসময় এ খাতের যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানিতে মাত্র ১৯ হাজার টাকা শুল্ক দিতে হতো, বর্তমানে সেটা এক লাফে আট লাখে তুলে নেওয়া, দেশে তৈরি যন্ত্রাংশ থেকে বিদেশের গুলো কম টেকসই হলেও কম দামের কারণে কৃষকের সেগুলোর দিকে ঝোঁক এবং বহুজাতিক বড় কোম্পানিগুলোর অধিক মুনাফার আশায় বিদেশি কৃষি যন্ত্রপাতি কিস্তিতে বিক্রির সুযোগ করে দেওয়া প্রভৃতি। এছাড়া ভালো-খারাপ বিবেচনা না করে বিদেশি পণ্যের প্রতি বাঙালির এক ধরনের অন্ধ প্রবণতা তো আছেই। এসব কারণে সম্ভাবনাময় বগুড়ার কৃষিশিল্প হুমকির মুখে পড়েলেও বিষয়টিতে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না। আমরা মনে করি, কৃষিসহ অন্য যেসব শিল্পের সম্ভাবনা ভালো এবং দেশে তৈরির সক্ষমতাও রয়েছে, সেগুলোতে বিশেষ প্রণোদনা যেমন দেওয়া দরকার, তেমনই এসব শিল্পে উৎপাদিত হয় এমন পণ্য বিদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে উচ্চশুল্ক ও বিধিনিষেধ আরোপ করা দরকার। অন্যথায় শিল্পের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন তো সম্ভব হবেই না, উল্টো কৃষির মতো অপরিহার্য খাতে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা হুমকিতে পড়তে পারে।
একসময় তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে বিবেচিত হওয়া বাংলাদেশ যে আজ অন্যতম অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দেশ, তার পেছনে যে তিনটি খাত খুব বেশি অবদান রেখেছে সেগুলো হলো কৃষি, তৈরি পোশাক ও বিদেশে কর্মসংস্থান। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কাক্সিক্ষত খাদ্য উৎপাদন ও প্রয়োজনীয় বিদেশি মুদ্রার জোগান দেওয়ার পেছনে কম শিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত বা একেবারেই অশিক্ষিত কৃষক, শ্রমিক ও প্রবাসী কর্মীদের যে অবদান, শিক্ষিত আমলা ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি পেশায় নিয়োজিতদের তার সিকিভাগ তো নেই-ই, বরং দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে খেটে খাওয়া মানুষের অর্জনকে ম্লান করে দেওয়ার পেছনে এ শ্রেণির বহু মানুষ ব্যতিব্যস্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। আমলা-ঠিকাদারদের বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি, প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনায় না নিয়ে হঠাৎ কোনো পণ্যে আমদানি শুল্ক বাড়ানো-কমানো প্রভৃতির কারণে কৃষি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে। বিদেশি বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রের আমদানি শুল্ক কম এবং দেশে এগুলো তৈরি করতে প্রয়োজনীয় কাঁচামালে অধিক শুল্কারোপে যেমন এখন সংকটে বগুড়ার কৃষিযন্ত্র উৎপাদন শিল্প। অবশ্য কেবল এ খাতেই নয়, বিভিন্ন খাতে সুদূরপ্রসারী চিন্তা ছাড়া বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় অতীতেও অনেক খেসারত দিতে হয়েছে আমাদের। বর্তমানে আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। সামনে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশের হাতছানি আছে। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ যে কোনো শিল্পের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী। বিষয়টি সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে জড়িতদের বিবেচনায় রাখতে হবে।
সরকারের কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, এমনকি শিক্ষক প্রকৌশলী ছাড়াই কেবল ব্যক্তি উদ্যোগে দেশের অভ্যন্তরে যে কয়টি শিল্প গড়ে উঠেছে তার মধ্যে বগুড়ার কৃষি ও ফাউন্ড্রি শিল্প, জিঞ্জিরার ইলেকট্রনিক শিল্প এবং যশোরের গাড়ির বডি ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি তৈরি শিল্প অন্যতম। দেশের সরকার ও প্রশাসনের যেখানে অন্যতম দায়িত্ব ছিল এসব শিল্পের প্রসারে এগিয়ে আসা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, স্বল্প সুদে ঋণ, প্রণোদনা প্রভৃতির ব্যবস্থা করা সেখানে সহায়তা তো দূরের কথা, বিভিন্ন সময় নকল, অবৈধ তৎপরতা ও লাইসেন্স না থাকার অভিযোগ এনে এগুলোকে নাজেহাল করা হয়েছে। একদিকে শিল্পের প্রসার চাওয়া হবে, অন্যদিকে শিল্প উদ্যোক্তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হবে, তা তো হতে পারে না। ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন কম দামি ও নকল পণ্যে চীনের বিশ্বব্যাপী একচেটিয়া বাজার থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত কোনো উদ্যোক্তা এগিয়ে এলে তাকে দমন নয়, সহায়তার হাত বাড়াতে হয়। চীন তার কৃষিপণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে তো ছাড় দেয়-ই, কৃষিপণ্য রফতানিতেও দেয় নগদ সহায়তা। আমরা যদি সহজ শর্তে ঋণসহ প্রয়োজনীয় সব সুবিধা বগুড়ার কৃষিশিল্পের জন্য নিশ্চিত করতে পারি, তবে একদিন এ খাতও রফতানির দুয়ার খুলে দেবে, অবশ্যই।
একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করি। ২০০৩ কিংবা ২০০৪ সালে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় একটি সচিত্র প্রতিবেদন পড়েছিলাম। তাতে বলা হয়, আমাদের গাড়ির বডি নির্মাতারা বিদেশ, বিশেষত জাপান থেকে প্রাইভেট কারের যে বডি আমদানি করেন, তেমন বডি তৈরি করে সরকারের অনুমোদন চেয়েছিলেন। কিন্তু জাপান আমাদের প্রধান দাতাদেশ হওয়ায় তারা নাখোশ হবে ভেবে অনুমোদনটি দেওয়া হয়নি। একে কী বলা যায় কর্মক্ষম না হয়ে খয়রাতি থেকে যাওয়ার প্রতিই মনোযোগী নয় কি! সরকারের নীতিনির্ধারকরা এটা ভালোভাবেই জানেন যে, দাতারা সব সময় দাতা থাকে না। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে বা যে কোনো কারণে তারা সহায়তার হাত সরিয়ে নিতে পারে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের তৈরি পোশাকে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুুবিধা (জিএসপি) তুলে নিয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে সরকারের নীতিনির্ধারকরা দেশপ্রেম নিয়ে বগুড়ার কৃষি যন্ত্রাংশ শিল্পসহ যেকোনো শিল্পের পাশে থাকবে, এটিই প্রত্যাশা। নিজেদের স্বার্থেই উদ্যোক্তারা মাটি কামড়ে দেশের জন্য সফলতা বয়ে আনবে, যার সুফল প্রজন্মে পর প্রজন্ম ভোগ করবে দেশের মানুষ।

গণমাধ্যমকর্মী

saifulh92Ñgmail.com