এসএমই

কেঁচো সারে হেলালের বিপ্লব

বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পা রাখেননি কোনোদিন। তবে প্রকৃতি থেকে পাঠ নিয়েছেন নিয়মিত। বলা যায়, প্রকৃতির বাধ্যগত ছাত্র তিনি। কিছু কিছু বিষয়ে প্রকৃতি তাকে এনে দিয়েছে পাণ্ডিত্য। রাসায়নিক সার পরিবেশের ক্ষতি করে। মাটির উর্বরাশক্তি কমিয়ে দেয়। মাটি শক্ত হয়ে যায় এ ধরনের সার ব্যবহারের ফলে। এসব বিষয় হেলাল উদ্দিনের কাছে সহজ পাঠ। এ কারণে তিনি রাসায়নিক সারের বিরুদ্ধে সংগ্রামও করছেন।
হেলাল উদ্দিন কেঁচো সার ব্যবহার করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে রাখছেন অগ্রণী ভূমিকা। এছাড়া অসহায় দরিদ্র নারীদের কেঁচো সার তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলার চার হাজার নারীকে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। নিজে বিক্রি করেছেন দুই লাখ টাকার কেঁচো ও কেঁচো সার। তার উৎপাদিত কেঁচো সার ব্যবহার করে সোনার ফসল ফলছে। লাভবান হচ্ছে কৃষক। ফসলের জমি ফিরে পাচ্ছে প্রাণ।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মহেশ্বরচান্দা গ্রামের অধিবাসী হেলাল উদ্দিন একসময় ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে ভাত চুরি করেছেন। অভাবের কারণে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। অভাবী বলে মানুষ তাকে থুতু দিয়েছে। তার পেছনে কেউ নামাজ পড়েনি। তার আরও গল্প রয়েছে। সেসব গল্প অন্ধকারের। আর এখনকার গল্প একজন আলোকিত মানুষের।
হেলাল উদ্দিনের বয়স এখন ৬৯ বছর। পিছিয়েপড়া অবহেলিত গ্রাম মহেশ্বরচান্দায় তার জš§। তাকে ভর্তি করানো হয় মাদরাসায়। বাবার আর্থিক সংগতি ছিল না। তাই বেশিদূর পড়ালেখা করতে পারেননি। কিছুদিন মসজিদে ইমামতি করেন।
হেলাল অতীত দিনের গল্প শোনালেন। বলেন, ১৯৭৪ সালে তাদের গ্রামে খেতে না পেয়ে ৩৫ জন মারা যায়। অথচ গ্রামে ৩৬০ একর জমি রয়েছে। তাতে মাত্র এক হাজার মণ ধান উৎপন্ন হয়। অনেকে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান। ১৯৮৮ সালের দিকে স্থানীয় যুবক ওমর আলী গ্রামের অধিবাসীদের নিয়ে মিটিং করেন। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের কথা বলেন। তিনি গ্রামে একটি কৃষি ক্লাব গড়ে তোলেন। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল কেটে ফসলের ক্ষেতে সেচের ব্যবস্থা করেন। শুরু হয় নতুন কৃষি বিপ্লব। ওমর আলীর নেতৃত্বে সেই কৃষি বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়েন হেলাল। তার ও গ্রামের মানুষের মুখে হাসি ফিরে আসে। সেই নিষ্ফলা গ্রামে বছরে উৎপাদিত হয় ৫০ হাজার মণ ধান।
১৯৯৩ সালে হেলাল সোনার বাংলা ফাউন্ডেশন ও হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের আওতায় প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণের মূলমন্ত্র ছিল: আত্মশক্তিতে বলীয়ান কোনো ব্যক্তি গরিব থাকতে পারে না। তিনি স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। এ সময় তার পরিচয় হয় কৃষিবিজ্ঞানী ড. গুল হোসেনের সঙ্গে। তিনিই প্রথম হেলালকে কেঁচো সারের কথা বলেন। হেলাল জানতে পারেন, ৯৮টি দেশে কেঁচো সার দিয়ে ফসল ফলানো হয়। ২০০১ সালে তিনি কেঁচো সার তৈরির ওপর প্রশিক্ষণ নেন। বাড়ি ফিরে মাটির নিচ থেকে ধরে নিয়ে আসেন দেশীয় ‘এন্টোসিদ’ কেঁচো। সেই কেঁচো দিয়ে তিনি সার তৈরি করেন। নিজের ১০ কাঠা জমিতে কেঁচো সার দিয়ে ধানের চাষ করে অন্যদের চেয়ে দুই মণ ধান বেশি পান। এ সাফল্যের কারণে তিনি কেঁচো সারের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
কেঁচো সার নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ইতিবাচক কাজ করার জন্য রাজধানীর কামাল কাদির ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে হেলাল উদ্দিনকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়। তিনি দ্বিগুণ উৎসাহে কেঁচো সার নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। জানতে পারেন, সাধারণ মাটির চেয়ে কেঁচো সারে ১০০ গুণ বেশি অণুজীব রয়েছে। পাঁaচ গুণ বেশি নাইট্রোজেন, সাতগুণ বেশি ফসফেট ও ১১ গুণ বেশি পটাশিয়াম রয়েছে এ সারে। কেঁচো সার জমিতে চার-পাঁচ বছর ব্যবহার করলে আর সারের প্রয়োজন হয় না। কেঁচো সার ব্যবহারে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। খরচও তুলনামূলক কম। এছাড়া রাসায়নিক সার মাটির উর্বরাশক্তি ও উৎপাদনক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পরিবেশ-প্রতিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি করে। তাই হেলাল রাসায়নিক সার থেকে বাঁচার জন্য নতুন উদ্যমে সংগ্রাম শুরু করেন। ২০০৯ সালে তিনি গাজীপুরের ‘বাসা’ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ছয় হাজার টাকার বিনিময়ে ভারতীয় এসিজিক ও অ্যানোসিক নামের দুই কেজি কেঁচো সংগ্রহ করেন। বাড়িতে এনে ওই কেঁচো চাষ ও সার তৈরিতে মগ্ন হন। বাড়ির উঠানসহ আশেপাশে তিনি সার তৈরির জন্য চাড়ি বসান। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে গরিব ও অসহায় মহিলাদের কেঁচো সার তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। এরই মধ্যে তিনি বরগুনা, সাতক্ষীরা, হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ফেনী, নরসিংদী, পঞ্চগড়, ভোলা, ঝিনাইদহ ও যশোরের চার হাজার নারীকে প্রশিক্ষণ দেন। সেসব নারী এখন কেঁচো সার তৈরি করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী।
নিজ গ্রামের ২৩০ পরিবারের মধ্যে ২০০ পরিবার হেলালের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফসল উৎপাদনে কেঁচো সার ব্যবহার করছে। তার বাড়িতে ১০০ চাড়ি আছে। এছাড়া বালতি, গামলা, মাটির পাত্রÑসবকিছুতেই কেঁচো আর কেঁচো। প্রতি মাসে তিনি আট থেকে ১০ মণ কেঁচো সার উৎপাদন করেন। এ সার বিক্রি করেন ১২ থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে। কেঁচো বিক্রি করেন প্রতি কেজি দুই হাজার টাকায়। চলতি বছর তিনি এক লাখ ৫০ হাজার টাকার কেঁচো বিক্রি করেন।
হেলাল এরই মধ্যে কয়েক লাখ টাকার কেঁচো ও কেঁচো সার বিক্রি করে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। পাকা বাড়ি তৈরি করেছেন। তিনি মনে করেন, কেঁচো সার বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব সবুজ বিপ্লব ঘটাবে। গ্রামীণ জনপদের মানুষের দারিদ্র্য দূর হবে। মাটি ফিরে পাবে প্রাণ। আর সাশ্রয় হবে রাসায়নিক সার কেনার শত শত কোটি টাকা।

নয়ন খন্দকার, ঝিনাইদহ

 

সর্বশেষ..