কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার উল্টোপথে বেসরকারি ব্যাংক

বন্ধ হচ্ছে না আগ্রাসী ব্যাংকিং

শেখ আবু তালেব: আগ্রাসী ব্যাংকিং বন্ধ ও বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে আমানত অনুপাত সমন্বয় করার জন্য আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ-আমানত অনুপাত বাড়িয়েও দেওয়া হয়েছে। ফলে জানুয়ারি মাস থেকেই ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে লাগাম টানার কথা। এত উদ্যোগেও আগ্রাসী ঋণ বিতরণ কমাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। ফলে ব্যাংক খাতে সুশাসন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত এক বছরে ব্যাংক খাতে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৪ হাজার ৯৫৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ৮৩ দশমিক পাঁচ শতাংশ ঋণ বিতরণ করলে ঋণ বিতরণ হওয়ার কথা ৭০ হাজার ৯৩৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। কিন্তু একই সময়ে ঋণ বিতরণ হয়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ৫২৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এ হিসাবে আমানত সংগ্রহের চেয়ে ঋণ বিতরণ বেশি হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার চেয়ে বেশি বিতরণ হয়েছে ৬১ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা।
ফলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে এডিআর দাঁড়িয়েছে শতভাগের অনেক উপরে। অথচ গত জানুয়ারি থেকে এই পরিমাণ কমিয়ে আনার কথা ছিল ব্যাংকগুলোর।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে শক্ত অবস্থান নেওয়ার দরকার ছিল। এটিকে একটি ইস্যু শক্ত ইস্যু করার কথা ছিল। আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু করা হয়নি।
ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব লোকজনকেই ঋণ দিচ্ছে। এখন যে ঋণ যাচ্ছে তা সবই বড় ঋণ, যা অপব্যবহার হচ্ছে। এসব ঋণ সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে আসছে না। এক সময়ে এ ঋণগুলো খেলাপি হয়ে যাবে, আদায় করা সম্ভব হবে না। এমনিতেই এখনই যদি নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতে আরও অরাজকতা তৈরি হবে। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি দুর্বল হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই শেষে এক বছরে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত সংগ্রহ হয়েছে ৯ লাখ ৬৭ হাজার ৬২৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা। গত জুন মাসে ছিল ৯ লাখ ৬৮ হাজার ৩০৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে আমানত কমেছে ৬৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গত বছরের জুলাইয়ে ছিল আট লাখ ৮২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে গত এক বছরে ব্যাংক খাতে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৪ হাজার ৯৫৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
অন্যদিকে গত বছরের জুলাই শেষে ব্যাংকগুলো মোট ঋণ বিতরণ করেছে ৯ লাখ ৪৪ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। এক বছর পরে গত জুলাই শেষে ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৭৭ হাজার ১০৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি পেয়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ৫২৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এ হিসাবে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ শতাংশ। অথচ আমানত সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলো সংগৃহীত মোট আমানতের মধ্যে সিআরআর ও বিধিবদ্ধ অর্থ জমা রেখে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারে ব্যাংকগুলো। আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো থাকা সাপেক্ষে ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এ হার সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ।
গত বছরের শুরু থেকেই মূলধন সংকটে ভুগতে থাকা ও নতুন প্রজšে§র কয়েকটি ব্যাংক আগ্রাসী ব্যাংকিং শুরু করলে এর প্রভাব পড়ে পুরো ব্যাংক খাতে। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামতে গিয়ে প্রয়োজনীয় জামানত ছাড়াই ঋণ বিতরণ করে অনেক ব্যাংক। আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের ফলে আমানত-ঋণ (এডি) অনুপাত বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত সীমার বাইরে চলে যায়।
পরবর্তী সময়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত জানুয়ারিতে আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের লাগাম টেনে ধরতে এডি অনুপাত এই হার ৮৫ থেকে কমিয়ে ৮৩ দশমিক পাঁচ শতাংশ ও ৯০ থেকে কমিয়ে ৮৯ শতাংশ করেছে। তিন দফা সময় বৃদ্ধি করে এডিহার অনুপাত নির্দিষ্ট সীমায় ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোকে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ নিয়ম অনুসরণ করা হলে আমানতের চেয়ে ঋণ বিতরণ বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু উল্টো ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের হার কমে আসার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। সূত্র জানিয়েছে, গত জানুয়ারি থেকে জারি হওয়া এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে অনেক ব্যাংকই। কিন্তু এখনও ২০টিরও বেশি ব্যাংক তা মানছে না। দেশের বেসরকারি খাতে প্রথম পর্যায়ে অনুমোদন পাওয়া এক ব্যাংকের বর্তমান এডি অনুপাত হচ্ছে ৯৬-এর উপরে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, গত জানুয়ারি থেকেই কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। হয় বিনিয়োগ কমাতে হবে, নয় আমানত সংগ্রহ বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমানে আমানত পাওয়া দুষ্কর। তবে সব ব্যাংক যদি উদ্যোগ নেয়, তাহলে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। একক কোনো ব্যাংকের পক্ষে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে এ প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল পর্যায়ের কর্মকর্তারাও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। তাদের মতে, এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপিত মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। মুদ্রানীতিতে সংকটের সৃষ্টি করবে।
প্রসঙ্গত, গত কয়েক বছর ধরে ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ব্যাংক খাতে হল-মার্ক, বিস্মিল্লাহ ও সর্বশেষ অ্যানন টেক্সটাইল কেলেঙ্কারির জš§ হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলো থেকে বেরিয়ে গেছে হাজার হাজার কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ও বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংকের নানা জালিয়াতি এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পূর্ববর্তী এক বছরের তথ্য অনুযায়ী গত জানুয়ারি শেষে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক দুই শতাংশ ও ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ।