কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ে কেন এমন বিতর্কিত ঘটনা?

এমএফ হোসেন: আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে যে কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে। মুদ্রানীতির মাধ্যমে বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে বা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বাজেট বাস্তবায়নে সহায়তা করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ। সেসঙ্গে জনগণের আমানত সুরক্ষায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করাও তার বড় দায়িত্ব। এর বাইরে উন্নত দেশগুলোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম খুব একটা নেই। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, আরও বেশি মানুষকে আর্থিক সেবা নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব রয়েছে। সেই দায়িত্বও সুনামের সঙ্গে পালন করে যাচ্ছে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গত এক দশকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি নিশ্চিত করতে জোরালোভাবে কাজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিনিয়োগ বাড়াতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে নীতিগত সহায়তা প্রদান, কৃষিঋণের সহজলভ্যতা, কৃষকের ১০ টাকার অ্যাকাউন্ট, পথশিশুদের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়ের মানসিকতা গড়ে তুলতে স্কুল ব্যাংকিং সেবা চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিং সুবিধা চালুর অনুমোদন দিয়ে গ্রামাঞ্চলের আনাচকানাচে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার পেছনে কৃতিত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই। অন্যদিকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা তো বিশ্বের অনেক দেশের জন্য একটি বড় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এত সফলতার পরও কিছু অনাকাক্সিক্ষত বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এবার এমন এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিষয়ে জনমনে বড় ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে কি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টও নিরাপদ নয়? গত ১৭ জুলাই দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, শুল্ক গোয়েন্দা, কাস্টমসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে বিভিন্ন সময়ে জব্দ হওয়া স্বর্ণ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উপস্থিতিতে যাচাই করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা রাখা হয়। কিন্তু শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে, ভল্টের ৯৬৩ কেজি স্বর্ণের মধ্যে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ভরের একটি স্বর্ণের চাকতিতে অনিয়ম পাওয়া গেছে। জমা হিসেবে স্বর্ণ রাখা হলেও প্রকৃত যাচাই বাছাইয়ে স্বর্ণ পাওয়া যায়নি।
অন্যক্ষেত্রে জমাকৃত স্বর্ণালঙ্কারের ক্যারেটে এবং ওজনে তারতম্যেরে কথা তুলে ধরে বলা হয়, ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ হয়ে গেছে ১৮ ক্যারেট। উভয় ক্ষেত্রে প্রায় ৩ কোটি টাকার স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গত ২৫ জানুয়ারি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকে রাজস্ব বোর্ডের কাছে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করা হয়। ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে বালাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠিও দেয় রাজস্ব বোর্ড। এত দিন এসব কিছু গোপন থাকলেও বিষয়টি গণমাধ্যমে চলে আসায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছে, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাদের ভল্টের নিরাপত্তা অত্যন্ত সুপার। বরং ক্লারিক্যাল মিসটেক তথা করণিক ভুলের কথা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্বর্ণ গচ্ছিত রাখার সময় স্বর্ণকার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ৪০ শতাংশ স্বর্ণের কথা বললেও ইংরেজি বাংলা সংমিশ্রণের কারণে সেটি ৮০ শতাংশ নথিভুক্ত হয়ে যায়। এ ভুল ছাড়া স্বর্ণে কোনো ধরনের হেরফের হয়নি দাবি করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রতিবেদনের যথার্থতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে প্রতিবেদন যে সঠিক, এ দাবি করে আসছেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
এর আগে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে ৫ লাখ টাকা চুরির ঘটনা। যদিও পরে সেই অর্থ উদ্ধার হয়, কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শোনা যায়নি। এই ঘটনার কয়েক মাস পরই বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাইবার হামলার শিকার হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে অজানা হ্যাকাররা। ওই ঘটনায় সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি দল তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করলেও এখনও তা প্রকাশ করা হয়নি। ফিলিপাইন থেকে অর্থ উদ্ধারে আইনি প্রক্রিয়ার স্বার্থে কৌশলগত কারণে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে জানিয়ে আসছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এদিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) যে তদন্ত করছে, সেটির প্রতিবেদন দেওয়ার তারিখও বারবার পেছানো হচ্ছে।
রিজার্ভ চুরিকে হয়তো একটি দুর্ঘটনা বলা যেতে পারে, তাই বলে ভল্ট থেকে টাকা চুরির ঘটনার পর স্বর্ণে হেরফের? কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গচ্ছিত সম্পদ নিরাপদ না থাকলে অন্য ব্যাংকের পরিস্থিতি কী হবে? নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যদি দুর্বল হয়, তাহলে অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সমালোচনা বারবার ঘুরে ফিরে আসছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, ভল্টে নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ফলে স্বর্ণ হেরফের হওয়ার সুযোগই নেই। তবে করণিক ভুল হতে পারে, কিন্তু সেই ভুল গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি সংস্থায় এ ধরনের করণিক ভুল কেন হলো, তা খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে সেই তদন্তের প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করার পরামর্শ তাদের। এতে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্ন ও সন্দেহ দূর হবে বলে তাদের বিশ্বাস।
মানুষ বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে ব্যাংকের কাছে নিজের সম্পদ গচ্ছিত রাখে। এ সম্পদ তাদের কাছে আমানত। কিন্তু আমরা দেখেছি, জালিয়াতি করে অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এমনকি অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তারা সিন্ডিকেট করে অনেকের অ্যাকাউন্ট খালি করে দিয়েছেন। বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে মানুষ নিজের সম্পদ যেখানে গচ্ছিত রাখবে, সেখানেই নিরাপত্তার অভাব দেখা যাচ্ছে। এমনিতেই একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ হওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ দেশের ব্যাংক খাত। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতেও বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না বলে সমালোচনা হচ্ছে। সম্প্রতি ব্যাংকমালিকদের চাপে সিআরআর ও ঋণ-আমানত অনুপাত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আবার ব্যাংকমালিকরাই বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সুদেহার কমানোর। কিন্তু সেটিও তারা বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। গত ১৫ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির স্বীকার করেছেন ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমছে।
সব কিছু মিলিয়ে এখন ভাবমূর্তির সংকটে দেশের ব্যাংক খাত, সেসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও। সাধারণ মানুষের মনে নানা ধরনের প্রশ্নের উদয় হচ্ছে। এসব প্রশ্নের জবাব কেন্দ্রীয় ব্যাংককেই দিতে হবে। শুধু সংবাদ সম্মেলন করে করণিক ভুলের কথা অস্বীকার করে দায় এড়ানো যাবে না। ভল্ট ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি থাকলে তা দ্রুত সমাধান করা জরুরি। নিরাপত্তাজনিত কোনো দুর্বলতা থাকলে তাও দূর করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ইতিমধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান ঘোষণা দিয়েছেন, যদি স্বর্ণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কারও বিরুদ্ধে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো অন্যতম শীর্ষ ও কেপিআইভুক্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থার ইতিবাচক ভাবমূর্তি জনগণ দেখতে চায়। তাই জনগণের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির যোগাযোগ বাড়ানো যায় কি না, সেটিও ভেবে দেখতে হবে।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]