কেন তারা ঝরে গেল?

কোনো খাতে ব্যবসায় নেমে সবাই ভালো করবেন বা কেউই ঝরে যাবেন নাÑতা হয় না। কিন্তু কেন এর একাংশ ঝরে যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে বিজিএমইএ’র সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির জানিয়েছেন, গত চার বছরে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ১২০০ গার্মেন্ট কারখানা। তিনি এটাও জানাতে ভোলেননি যে, গত দুবছরে গার্মেন্ট খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ১৮ শতাংশ। তবে ব্যয় বৃদ্ধির চাপেই ওইসব কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলাটা বোধ করি সরলীকরণ হয়ে যাবে। উদ্যোক্তারা স্বভাবতই চান উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে, এমনকি তাকে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে। মুনাফা সর্বোচ্চকরণের সহজাত তাগিদেও তারা এমনটি চেয়ে থাকেন। আজকের দিনে যখন শ্রম অধিকারসহ নানা দিকে দৃষ্টি দিয়ে উৎপাদন পরিচালনা করতে হয়, তখন মুনাফা সর্বোচ্চকরণ কিন্তু কঠিন। যেসব গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো সম্ভবত স্বাভাবিক মুনাফাও অর্জন করতে পারছিল না।

কিছুদিন আগে একটি সহযোগী দৈনিকেও এমন শিরোনাম করা হয়েছিল যে, দেড় হাজার গার্মেন্ট কারখানা উৎপাদনে নেই। সেখানে এমন খবরও দেওয়া হয়, ক্রেতাগোষ্ঠী অ্যালায়েন্সভুক্ত মাত্র দুটি কারখানা নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করেছে। অন্য বড় ক্রেতাগোষ্ঠী অ্যাকর্ডভুক্ত কয়টি প্রতিষ্ঠান তা করতে সমর্থ হয়েছে, সেটি অবশ্য জানা যায়নি। বাংলাদেশে কর্মরত সব গার্মেন্ট কারখানাই শ্রম আইন মানতে বাধ্য। তাই জানতে চাইবÑবন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার সংখ্যা ১২০০ হলেও তার কত শতাংশ আসলে শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করেছে। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সংকটের সুযোগে শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ না করার প্রবণতা রয়েছে অনেকের। ওইসব প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করতেন, তারা এখন কোথায় কী করছেন আমরা জানি না। এদের সিংহভাগ কিন্তু হতদরিদ্র ও নারী। অন্যান্য গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান বা এ সম্পর্কিত ক্ষেত্রে তাদের একাংশের কাজের সুযোগ হবে হয়তো। বাকিরা কী অবস্থায় আছেন, তার খোঁজ সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা না নিলেও তাদের সংগঠন বিজিএমইএ’র নেওয়া উচিত।

রানা প্লাজা ধসের পর আমাদের গার্মেন্ট খাত সংস্কারের দাবি পূরণসহ কিছু চাপের মধ্য দিয়ে গেছে, সেটাও জানা। কমপ্লায়েন্স পরিপূরণ করতে না পারায় কিছু কারখানা বিজিএমইএ’র সদস্যপদও হারিয়েছে। বিদেশি ক্রেতাগোষ্ঠী দেখিয়েছে আরও কঠোর মনোভাব। গার্মেন্ট খাতে বড় দুর্ঘটনার বিষয়ে জাতীয়ভাবে সচেতন না থাকাতেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সন্দেহ নেই। সিংহভাগ প্রতিষ্ঠান কিন্তু তা কাটিয়েও উঠেছে। এ খাতের বিকাশ অব্যাহত নেই, তাও নয়। এর মধ্যে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝরে যাওয়াকে অনেকে ইতিবাচকভাবেও দেখতে চাইবেন। বলবেন, সক্ষমরাই টিকে থাকুক ও খাতটিকে এগিয়ে নিক। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, ১২০০-১৫০০ গার্মেন্ট কারখানা কেন বন্ধ হয়ে গেল! সংখ্যাটি আরও কম হতে পারত না? আর এগুলোর সব নিশ্চয়ই একই কারণে ঝরে যায়নি। একেক গ্রুপের ক্ষেত্রে একেক গুচ্ছ কারণ ছিল বলেই মনে হয়। এগুলো খতিয়ে দেখা দরকার এমন আরও কিছু প্রতিষ্ঠান যাতে ঝরে না যায়, তা নিশ্চিত করতে। এমনিতেই দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি ভালো নয়। তার মধ্যে দরিদ্র শ্রমিকদের এভাবে কাজ হারানোর ঘটনা নিতান্ত বেদনাদায়ক।