কেবল ঘুষমুক্ত নয়, সরকারি সেবায়ও চাই পেশাদারিত্ব 

 

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন: দুর্নীতি ও অনৈতিকতাÑদুটি ভিন্ন শব্দ। তা সত্ত্বেও অনেক সময়ই শব্দ দুটিকে সমার্থক মনে হয় । দুর্নীতি ও অনৈতিকতার প্রায়োগিক অর্থের ফলটা সমাজে একই ধরনের কুফল বহন করে। এখানে অবশ্য ‘অনৈতিকতা’ বা ‘দুর্নীতি’ শব্দ দুটির আভিধানিক ব্যাখ্যা বা বুৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করছি না। তবে এ দুটি শব্দই যে অপরাধপ্রবণতাকে নির্দেশ করে, তা সবার জানা। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক সরকারি অফিসে একটি ব্যানার দেখা যায়। তাতে লেখা থাকে আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত। তবে ব্যানারে অফিসটি যা লিখেছে, বাস্তবে তাতে কতটুকু সত্যতা রয়েছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় না। অবশ্য ভেতরের সত্য যা-ই হোক, বাইরে থেকে এমন ব্যানার যারা দেখেন, তাদের মনটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। যাদের কোনো কাজের জন্য অফিসটিতে যেতে হয়নি, তারা ভাবেন যাই হোক, ৪৭ বছর পর হলেও বাংলাদেশ স্বাধীনতার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে তাহলে।

ঘুষকেই অফিস-আদালতে দুর্নীতির মধ্যে প্রধান মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়। এর বাইরেও অন্যান্য অনেক অপরাধ সংঘটিত হয়। তবে সেগুলোকে অনেকেই দুর্নীতির বলে গণ্য করেন না। জনগণের কাজ করে দেওয়ার বিনিময়ে সরকারি অফিসের কর্মীরা ঘুষ গ্রহণ করেন। এ রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। এটি বন্ধের লক্ষ্যে অতীতে বহুবার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কার্যত ফল কতটুকু হয়েছে, তাও সবার জানা। সরকারি দফতরে কর্মরতদের বেতন কম এ অজুহাতটিও চলে আসছিল দীর্ঘকাল ধরে। বর্তমান সরকার ঘুষ ও দুর্নীতি রোধে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুণ করেছে। এই বেতন বাড়ানো প্রক্রিয়ায় কি সরকারি দফতরগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ হয়েছে? বরং অফিসগুলোর অনৈতিকতা ও দুর্নীতির বিষয়টি ‘ওপেন সিক্রেট’। বেতন বাড়ানোর ফলে দুর্নীতি দূর হয়নি। বরং সরকারি অফিসের অনিয়মগুলো আগের মতোই বহালতবিয়তে আছে। এখানে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রটি প্রয়োগ হয়নি। বাহির হতে বল প্রয়োগের ফলে বস্তুর গতিপথটা পরিবর্তিত হয়নি। অর্থাৎ দুর্নীতি কমেনি। তবে বেতন বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনিয়মটা যেন বেড়ে গেছে। কিছুদিন আগের একটি ঘটনা। সরকারি অফিসের এক কর্মকর্তা এক গ্রাহকের কাজ করে দেওয়ার বিনিময়ে কিছু অর্থ নেবেনÑএমন শর্ত স্থির হলো। তবে এক পর্যায়ে কর্মকর্তা ওই গ্রাহকের কাছে আগের চেয়ে একটু বেশি অর্থ দাবি করে বসলেন। কেন বেশি দিতে হবেÑতার ব্যাখ্যায় কর্মকর্তা বললেন, এখন তার বেতন দ্বিগুণ হয়েছে। সুতরাং সে বিবেচনায় তিনি দ্বিগুণ চেয়েছেন। বিষয়টি এমন যে, বেতন বাড়ায় ঘুষের পরিমাণও দ্বিগুণ হয়ে গেল!

এভাবে সরকারের ঘুষ নিরোধকল্পে নেওয়া ঐকান্তিক চেষ্টাটা এক বিন্দুও বাস্তবায়িত হলো না। এর জন্য যারা দায়ী, তাদের মধ্যে শুভবোধের উদয় হওয়া দরকার। ঘুষের এই ব্যাধি সরকারি সব সেক্টরেই ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সরকারি অফিসে বিচিত্রভাবে ঘুষের হার নির্ধারণ করা হয়ে থকে। ঘুষ গ্রহণ প্রক্রিয়াটা দেখলে মনে হয় এটা বুঝি প্রথা বা নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে। কোনো অফিসের পিয়নও এখন ২০০ টাকার কম ঘুষ দাবি করেন না। অথচ একজন চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মীও চাকরির শুরুতে সাকুল্যে প্রায় ১৫-১৬ হাজার টাকা বেতন পান। আর ওপরের স্তরে যারা কাজ করছেন, তাদের বেতনের হার সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য যথেষ্টই মনে করি। তারপরও কেন এ অপরাধের লাগাম টানা যাচ্ছে না?

অফিসভেদে ঘুষ আদান-প্রদানের ভিন্নতা প্রসঙ্গে বলছিলাম। কিছু দফতর আছে, যেখানে জনসাধারণের যাতায়াত কম। তাই ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার সুযোগও কম। ফলে এসব দফতরের কর্মকর্তারা নিজেদের সৎ হিসেবে দাবি করেন। বাস্তবে তারা কতটুকু সৎ, তাও দেখার বিষয়। সততার সঙ্গে নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ ধরনের অফিসে কর্মীরা প্রায় দিনই আট ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেন না। প্রশ্ন হলো, যদি কেউ নির্ধারিত সময় অর্থাৎ প্রতিদিনের পূর্ণ শ্রমঘণ্টা কাজ না করেন, তাহলে তিনি কি যথাযথ নিয়মে ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন? এখানে নৈতিকতার বিষয়টি বাদ দিয়ে চিন্তা করার সুযোগ নেই। কাজে ফাঁকি দেওয়াটা অনৈতিক। অনৈতিকতা ও দুর্নীতির মধ্যে পার্থক্যই বা কতটুকু? দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক, বিশেষত কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা শিক্ষকতা করেন, তাদের মুখে নানা নীতিকথা শোনা যায়। এই নীতিবান মানুষগুলো দৈনিক আট ঘণ্টা হিসেবে নির্ধারিত বেতন স্কেলে বেতন নিচ্ছেন; বাস্তবে কত ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেন তারা? কেবল ক্লাস নেওয়াই কি তাদের কাজ? শিক্ষাঙ্গনের উন্নয়ন ও ছাত্রদের সময় দেওয়া কি তাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না? দুই বা তিন ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করে যদি কেউ আট ঘণ্টার বেতন নেন, তাহলে তার সঙ্গে ঘুষখোর সরকারি কর্মীর কি কোনো পার্থক্য থাকে? এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষগুলো যখন নীতিকথার বয়ান দেন, তা কি শুনতে ভালো লাগে?

বাংলাদেশের পুলিশ সম্পর্কে এদেশের মানুষের বেশ নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।  পুলিশের কনস্টেবল থেকে শুরু করে আইজিপি পর্যন্ত প্রত্যেক স্তরে কর্মরতদের কিন্তু আট ঘণ্টার অধিক সময় দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। অপরদিকে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আট ঘণ্টা শ্রমের নির্ধারিত বেতন নিয়ে থাকেন। তারপরও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়ে বা নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন কোর্স চালিয়ে বাড়তি উপার্জন করেন অনেকেই। এ ধরনের শিক্ষকের সঙ্গে পুলিশের নৈতিকতার তুলনামূলক পার্থক্য করাটা কি খুব অযৌক্তিক? বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে বলতে গেলে, এসব শিক্ষক ও কিছু অসৎ পুলিশ সদস্য উভয়েই নৈতিকতার দিক থেকে এক ও অভিন্ন। প্রশাসনসহ সরকারি সব কর্মকর্তার মতো শিক্ষকদের বেতনও বেড়েছে। তবুও অন্যরা যেমন ঘুষ ছাড়তে পারছেন না, ঠিক তেমনি শিক্ষকরাও কোচিংবাণিজ্য ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া ছাড়ছেন না। তাই নৈতিকতা মাপার স্কেলে সবাইকে একই মানদণ্ডে মাপা দরকার। শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক কোন্দল, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি কেনাসহ বিভিন্ন ন্যক্কারজনক ঘটনায় শিক্ষকদের সংশ্লিষ্টতার খবর শিরোনাম হয়েছে পত্রিকার পাতায়। তাদের এসব অপকর্মের সঙ্গে ‘গডফাদার’ হিসেবে চিহ্নিতদের অপরাধকেও তুলনা করা যায়।

এবার সরকারি অফিসে কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য প্রসঙ্গে। সরকারের বিভিন্ন দফতরে কর্মরতদের লজিস্টিক সাপোর্ট পাওয়ার বিষয় নিয়ে প্রায়ই অভিযোগ পাওয়া যায়। গ্রেড বা পদ অনুসারে সবাই সমভাবে লজিস্টিক সাপোর্ট দাবি করেন। এ বিষয়টির যৌক্তিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। একজন পুলিশ বিভাগে বা প্রশাসনে কর্মরত কর্মীর দায়িত্ব পালনকালে বা তার বাসস্থানে যে ধরনের সরকারি লজিস্টিক সাপোর্টের প্রয়োজন, সে রকমই প্রয়োজন অন্য বিভাগের কর্মরত কর্মীদেরও। কিন্তু অনেক সময়ই এক্ষেত্রে বৈষম্য লক্ষ করা যায়। পুলিশের সার্বক্ষণিক গাড়ির দরকার পড়ে। কিন্তু সরকারের অনেক দফতরের কর্মীর দায়িত্ব পালনে এরকম গাড়ির প্রয়োজনীয়তা নেই। এটা যুক্তিসংগত। তবে সার্বক্ষণিক গাড়ির সুবিধা অনেক দফতরের শীর্ষ বা মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তারা ভোগ করে থাকেন। কোনো দফতরে সার্বক্ষণিক গাড়ি সুবিধা পাওয়া কতটুকু প্রয়োজন বা আদৌ প্রয়োজন আছে কি না তা নির্ধারণ করা দরকার। যদি প্রয়োজন না থাকে, তাহলেও সার্বক্ষণিক গাড়ি সুবিধা ভোগ করাটা কি নৈতিক?

শিক্ষকদের বেতন নিয়ে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তার কর্মক্ষেত্রে যে মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করেন, সে তুলনায় তার নির্ধারিত বেতন অন্যান্য স্তরে কর্মরত শিক্ষকদের তুলনায় অনেক কম। কারণ একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে একটি কোমলমতি শিশুর মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো বিচার করে তার মাঝে শিক্ষণ প্রক্রিয়া চালাতে হয়। মাধ্যমিক বা তদূর্ধ্ব স্তরের শিক্ষকদের চেয়ে তার কাজটিই বেশি কঠিন বলে মনে হয়। কিন্তু প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের বেতন কম হওয়ায় একদিকে তারা যেমন পেশাগত দায়িত্ব পালনে উৎসাহী হন না, অন্যদিকে মেধাবীরাও এ পেশায় আগ্রহী হন না। ফলে একটি শিশু তার জীবনের প্রথম শিক্ষাস্তরেই ভালোমানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

পেশাগত নৈতিকতার অভাব, ঘুষ গ্রহণ, দুর্নীতিসহ সব অপরাধেরই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। সততারও রয়েছে অনেকগুলো উপাদান। আর এরকম ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার মানদণ্ডে সরকারি কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে হবে। দেখা যায় একজন সরকারি কর্মী সকাল ৮টায় অফিসে যান আর ফেরেন রাত ৮টায়। তিনি এ দীর্ঘ সময় অফিসে দায়িত্ব পালন করেন বটে; কিন্তু ঘুষও গ্রহণ করেন। অপরদিকে ঘুষ নেন না এমন একজন সরকারি কর্মকর্তা তার পেশাগত দায়িত্বে অবহেলা করেন। তাহলে এ দুইয়ের মধ্যে কাকে ভালো বলব আমরা? এ দুজনের মধ্যে পার্থক্য কি আসলে খুব বেশি? অপরাধ কিন্তু উভয়েরই সমান। তবে অনেক সময়ই তাদের মধ্যে সমাজে কেউ কেউ অহেতুক ‘নীতিবান’ আখ্যা পেয়ে যান।

ঘুষ গ্রহণ যেমন অনৈতিক, ঠিক তেমনই কাজে ফাঁকি দেওয়া বা পেশাগত দায়িত্বে অবহেলা করাও অনৈতিক। সব অনৈতিকতার কারণে সম্মিলিতভাবে দুর্নীতি বাড়ছে। তাই সব অনৈতিকতা দূর করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় নিয়ম-কানুন সমানভাবে প্রয়োগ করা দরকার।

 

ফ্রিল্যান্স লেখক