কেমন আছেন তৈরি পোশাকশিল্প শ্রমিকরা

এমএফ হোসেন: বাংলাদেশের অগ্রগতির শুরুটা তৈরি পোশাক খাত দিয়েই। বর্তমানে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি পোশাক খাত। এ খাতে সরাসরি ৪০ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। পরোক্ষভাবে আরও প্রায় ৬০ লাখ মানুষ এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করে দেশের রফতানি বাড়িয়ে অর্থনীতির চাকা বেগবান রেখেছেন, কেমন আছেন সেসব শ্রমিক?
বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ তৈরি পোশাক শ্রমিকদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে সম্প্রতি এক জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত ৭৭০ শ্রমিকের (নারী ও পুরুষ) মতামত নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়। এতে দেখা যায়, তৈরি পোশাক শ্রমিকরা খুব একটা ভালো আছেন তা বলা যাবে না। কারখানার নিরাপদ কর্মপরিবেশের উন্নতি হলেও তাদের সুযোগ-সুবিধা খুব একটা বাড়েনি। ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কর্মরত ৩২ শতাংশের বেশি শ্রমিক কারখানা থেকে কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধাই পান না। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে অবশ্য চিত্রটা একটু ভিন্ন। ওই এলাকার ৬১ শতাংশ শ্রমিক নিজের কর্মস্থল থেকে খাবার, ৩৬ দশমিক চার শতাংশ পরিবহন তিন শতাংশ শ্রমিক আবাসন সুবিধা পান। ঢাকায় (গাজীপুরসহ) খাবার সুবিধা ৫০ শতাংশ, পরিবহন সুবিধা ১৫ শতাংশ ও তিন শতাংশের কিছু বেশি শ্রমিক আবাসন সুবিধা পান।
বলা হয়ে থাকে, শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করতে হয় তার ঘাম শুকানোর আগে। বেতন-ভাতা পরিশোধের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক উন্নতি করেছে কারখানাগুলো। ঢাকা ও গাজীপুরে প্রায় ৯৮ শতাংশ শ্রমিকই ঠিক সময়ে বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে এ হার ঢাকার চেয়ে কিছুটা কম, প্রায় ৯৫ শতাংশ। তবে প্রতি মাসের সাত তারিখের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শ্রমিক বেতন পান না। ঢাকা ও গাজীপুরে ৪৩ এবং চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে মাত্র ৩৬ শতাংশ শ্রমিক মাসের সাত তারিখের মধ্যে বেতন পান। বাকিরা মাসের অনির্দিষ্ট যে কোনো সময়ে বেতন পান। অন্যদিকে যারা ন্যূনতম বেতন পান, তাদের অনেকের ক্ষেত্রে পুরো পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা না দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
এছাড়া কোনো কারণ ছাড়াই বেতন থেকে অর্থ কেটে রাখার ঘটনাও ঘটে কিংবা কি কারণে বেতন কাটা হয়েছে তা জানতে পারেন না প্রায় ৩০ শতাংশ শ্রমিক। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে এ হার অর্ধেকের বেশি। ওই অঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের ৫৮ দশমিক দুই শতাংশেরই বেতন কাটা হয় কোনো কারণ ছাড়া। কিংবা তারা জানতে পারেন না কেন তাদের বেতন কাটা হলো। আগাম কোনো নোটিস ছাড়াই শ্রমিকদের কারখানা থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও আছে। ঢাকা ও গাজীপুরে ২৮ দশমিক চার শতাংশ এবং চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে ৩৪ দশমিক ছয় শতাংশ শ্রমিককে আগাম কোনো নোটিস ছাড়াই কারখানা থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ ছাঁটাইয়ের পেছনে অন্যতম কারণ শ্রমিকদের সঙ্গে সঠিক চুক্তিপত্র না থাকা। শ্রমবিধি অনুযায়ী ঢাকায় চাকরির চুক্তিপত্র পান না প্রায় ৭৩ শতাংশ শ্রমিক। চট্টগ্রামে এ হার ৪১ শতাংশেরও বেশি।
তৈরি পোশাক শ্রমিকরা যে বেতন পান, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। তাই বাড়তি আয়ের আশায় বেশিরভাগ শ্রমিকই ‘ওভারটাইম’ করেন। ওভারটাইমে মূল বেতনের দ্বিগুণ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও সেটি বাস্তবে হয় না। ঢাকায় মাত্র ১৬ শতাংশ শ্রমিক ওভারটাইমে দ্বিগুণ অর্থ পান। চট্টগ্রামে এ হার সাড়ে ৩৫ শতাংশ। নিজেদের সুযোগ-সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে শ্রমিকরা যে সোচ্চার হবেন, তাতেও রয়েছে ঘাটতি। কারণ বেশিরভাগ শ্রমিকই শ্রম আইনের বিষয়ে কোনো ধারণা রাখেন না। কারখানাভিত্তিক শ্রমিক সংগঠনের তৎপরতা কম থাকা এর অন্যতম কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরিস্থিতি উত্তরণে শ্রমিকদের জন্য আরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
তৈরি পোশাক খাতে পুরুষের চেয়ে নারীদের সংখ্যাই বেশি। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীর ক্ষমতায়নে এ খাতের বড় ধরনের ভূমিকা আছে। বঞ্চিত ও অধিকারহারা নারীরা তৈরি পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়ে নিজেদের ভাগ্য গড়ছেন। তবে কর্মক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে অনেকটা লড়াই করে টিকে আছেন নারীরা। সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ মাতৃত্বকালীন সময়ে। এছাড়া সন্তান লালন-পালন কিংবা পরিবার সামলে এ খাতে নারীর টিকে থাকার সংগ্রাম চলছে প্রতিনিয়ত। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন বলছে, এ খাতে যাদের অবদান অর্ধেক, তারা পুরুষের চেয়ে সুযোগ-সুবিধায় রয়েছেন পিছিয়ে।
এখনও ঢাকা (গাজীপুরসহ) ও চট্টগ্রাম (নারায়ণগঞ্জসহ) অঞ্চলের প্রায় ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক মাতৃত্বকালীন ছুটি পান না। দুই এলাকায় ছুটি পাওয়ার হার যথাক্রমে ৭২ শতাংশ ও ৭৬ দশমিক ছয় শতাংশ। অন্যদিকে যারা ছুটি পান, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই চার মাসের কম পান। মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় বেতন পান না প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী শ্রমিক। ঢাকা ও গাজীপুরে সাড়ে ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় বেতন পান না। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে এ হার কিছুটা বেশি; ৩৩ দশমিক পাঁচ শতাংশ। বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে আগামীতে শ্রম আইন সংশোধন করা হবে। তখন হয়তো কারখানাগুলো মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি বেতন দিতেও বাধ্য থাকবে।
তবে আশার কথা হচ্ছে, ৭০ শতাংশের বেশি নারী শ্রমিকই বলেছেন, গর্ভকালীন সময়ে তারা কারখানায় নিজের অনুকূল পরিবেশ পান। গর্ভকালীন সময়ে অর্ধেক নারী শ্রমিককেই বেশি সময় দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয় না। তবে অনেককে ভারী জিনিস উত্তোলন করতে হয়। এক্ষেত্রে ঢাকা ও গাজীপুরের কারখানায় কর্মরতদের চট্টগ্রামের শ্রমিকদের চেয়ে বেশি কষ্ট করতে হয়। ঢাকা ও গাজীপুরে ৭৩ দশমিক ছয় শতাংশ নারী শ্রমিককে গর্ভকালীন অবস্থায় ভারী জিনিস উত্তোলন করতে হয়। চট্টগ্রামে এ হার ৪৮ শতাংশের কিছুটা বেশি। ঢাকার চেয়ে চট্টগ্রামের শ্রমিকরা কারখানা থেকে গর্ভকালীন সেবা বেশি পেয়ে থাকেন।
নারীদের সংগ্রামের কথা এখানেই শেষ নয়। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ও কর্মস্থলে তারা যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন। যদিও কর্মস্থলে এ হার কম; তারপরও এটা মেনে নেওয়া যায় না। কর্মস্থলে যৌন হয়রানির শিকার হলে কোনো শ্রমিকই অভিযোগ করার সাহস পান না; কারণ পাছে আবার চাকরি চলে যায়! কারখানার ভেতরে যৌন হয়রানির প্রসঙ্গটা তাই নারীরা এড়িয়ে যান। এছাড়া ব্যবস্থাপকদের কাছ থেকে খারাপ ব্যবহার, এমনকি মাঝে মাঝে চড়থাপ্পড়ের (নারী-পুরুষ উভয়) ঘটনাও ঘটে। কাজ করতে গিয়ে কোনো শ্রমিক পরিশ্রান্ত হয়ে পড়লে তার বিশ্রামের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে খুব কম ক্ষেত্রেই। ঢাকা ও গাজীপুরের ৪৩ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন, তাদের জন্য বিশ্রামাগার আছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে এ হার সাড়ে ৫৮ শতাংশ। তবে উভয় অঞ্চলেই ৯০ শতাংশের বেশি শ্রমিক কারখানায় সুপেয় পানি পানের সুবিধা পান। শ্রমিকদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য কারখানাগুলোয় সব সময় একজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও তা মানা হয় না। এক্ষেত্রে চাতুর্যের আশ্রয় নেওয়া হয় বলে শ্রমিকদের অভিযোগ। কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিদর্শক দল এলে শুধু কারখানায় ডাক্তার থাকেন, বাকি সময় তাদের দেখা মেলে না।
এই হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় খাতের শ্রমিকদের বাস্তব পরিস্থিতি। সরকার কিংবা বিভিন্ন পক্ষের চাপে পড়ে শুধু বেতন বাড়ালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, এটা মালিকপক্ষকে বুঝতে হবে। কারখানার নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করেই ক্ষান্ত হওয়া যাবে না, বরং একটি সুখী পরিবেশ থাকতে হবে। এতে বরং মালিকপক্ষই লাভবান হবে।
আমরা জানি, শ্রমিকের মনে সন্তুষ্টি থাকলে তিনি কাজে মনোযোগী থাকবেন। আর কাজে মনোযোগ বাড়লে উৎপাদন কিছুটা হলেও বাড়বে। পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি নারীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা তৈরিতে একটু বেশি মনোযোগী থাকা উচিত। একটি নিরাপদ ও সুখী কর্মপরিবেশ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দুই অংকে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে এমনটাই বিশ্বাস করতে চাই।

গণমাধ্যমকর্মী

mfhossain1971gmail.com