কেমন আছে গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়া?

সোহেল রানা: লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে রাগুবা তেলক্ষেত্রের অবস্থান। এখান থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করা হয়। সম্প্রতি এই তেলক্ষেত্রে অবরোধ দেয় একদল লিবীয় যুবক। তারা তেল উৎপাদন বন্ধ করে দেয় এবং দেশের অন্যান্য অংশেও তেল সরবরাহে বাধা দেয়। কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল স্থানীয়রা। তারা উন্নত স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুবিধা, পরিবহন সুবিধা ও কর্মসংস্থানের দাবিতে তেলক্ষেত্রটিতে অবরোধ দিয়েছিল। গাদ্দাফি পরবর্তী লিবিয়াতে নাগরিক সমস্যা ও চাকরির সংকট কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, এটি তার একটি নমুনা মাত্র। পুরো লিবিয়াজুড়েই সংকটে অর্থনীতি, আর্থিক কাঠামো বিপর্যস্তÑকারণ সুশাসনের অভাব ও একক নেতৃত্বহীনতা।
লিবিয়ায় শান্তি ফেরেনি। নানা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত দেশটির জনগণ। গাদ্দাফি আমলের সুযোগ-সুবিধা বহাল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে ক্ষয়িষ্ণু সেখানকার অর্থনীতি। অবশ্য গাদ্দাফি একনায়ক ছিলেন, তার আমলে ভিন্নমত সহ্য করা হতো না, কেউ সরকারবিরোধী সমালোচনা বা আন্দোলন করার সাইসই পেত না। কিন্তু পশ্চিমা অবরোধ সত্ত্বেও তিনি লিবিয়াকে একটি সুশৃঙ্খল অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন এটা বোধহয় গাদ্দাফির শত্রুরাও অস্বীকার করেন না। লিবীয় জনগণকে তার সরকারের দেওয়া নাগরিক সুবিধা আফ্রিকার অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রশংসনীয় ছিল। ২০১৪ সালের নভেম্বরে কানাডাভিত্তিক গবেষণা ও গণমাধ্যম সংস্থা গ্লোবাল রিসার্চ গাদ্দাফির শাসনকালের কিছু ভালো দিক নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপায়। এতে বলা হয়, প্রত্যেক লিবীয় নাগরিকের বাড়িঘর থাকাকে একটি মৌলিক অধিকার বলে গণ্য করত গাদ্দাফি প্রশাসন। শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা ছিল সম্পূর্ণ ফ্রি। এমনকি যদি কোনো লিবীয় নাগরিক দেশে কাক্সিক্ষত চিকিৎসা বা শিক্ষা না পেতেন সেক্ষেত্রে তাকে বিদেশে যাওয়ার অর্থ সরবরাহ করত রাষ্ট্র। কেউ যদি খামার ব্যবসা করতে চাইতেন তাহলে তাকে সরকারের পক্ষ থেকে বাড়ি, খামার, গবাদিপশু ও বীজ সরবরাহ করা হতো। কোনো মহিলার ঘরে নবজাতক জš§ নিলে মা ও বাচ্চার জন্য সরকার পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার সরবরাহ করত। লিবিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংক থেকে শূন্য শতাংশ হারে ঋণ দেওয়া হতো এবং এর কোনো বৈদেশিক ঋণ ছিল না। গাদ্দাফির শাসনামলে দেশটিতে পেট্রোলের দাম খুব কম ছিল, প্রতি লিটার দশমিক ১৪ ইউএস ডলার। এছাড়া তেল বিক্রি করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে অর্থ আসত তা প্রত্যেক লিবীয় নাগরিকের ব্যাংক হিসেবে আনুপাতিক হারে চলে যেত। প্রত্যেক লিবীয় দম্পতিকে বিয়ের পর ৫০ হাজার ডলারসহ নতুন বাসা কিনে দিত সরকার।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি যথেষ্ট ভঙ্গুর। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, লিবিয়া কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? হিসাবটা খুব জটিল। কারণ দেশটি ঐক্যবদ্ধ কোনো কমান্ডে চলছে না। গাদ্দাফি পরবর্তী লিবিয়ায় এখন একক কোনো কর্তৃত্ব নেই। বিশাল আরব ভূখণ্ডজুড়ে রয়েছে নানান গোষ্ঠী, অস্ত্র এখন প্রায় সবার হাতে হাতে। দীর্ঘ শাসনামলে এসব গোষ্ঠীকে দমিয়ে রেখে প্রচণ্ড প্রতাপে দেশ চালিয়েছেন কর্নেল গাদ্দাফি। কিন্তু পশ্চিমা ছকে গাদ্দাফির পতন ও হত্যাকাণ্ডের পর লিবিয়া গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের এক আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। লিবিয়ার ক্ষমতা এখন অন্তত তিনটা বড় শক্তির হাতে। রাজধানী ত্রিপলিসহ একাংশ চালাচ্ছে একটা সরকার, বন্দরনগরী বেনগাজিসহ অপর এক অংশের নিয়ন্ত্রণ আরেকজনের হাতে। এর বাইরে ইসলামপন্থিরা দখল করে রেখেছে লিবিয়ার বিশাল একটি অংশ। এসব শক্তির পেছনে বাইরের কোনো না কোনো বড় শক্তির সমর্থন রয়েছে। এই তিন শক্তির বাইরেও লিবিয়ায় অসংখ্য সশস্ত্র গ্রুপের উত্থান হয়েছে, যারা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছেন।
বেনগাজিসহ পূর্বাঞ্চলের বিশাল এলাকা ইসলামিস্টদের কাছ থেকে দখলে নিয়ে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠান করেছেন গাদ্দাফি আমলের সেনা কর্মকর্তা খলিফা হাফতার। এই এলাকা খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাফতারের লোকজন ইসলামপন্থি ও অন্যান্য বিদ্রোহীদের সমর্থক ও স্থানীয় অনেককে তাড়িয়ে বাসাবাড়ি আর ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো দখলে নিয়েছেন। আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাফতারের পেছনে রয়েছে মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এমনকি রাশিয়ার মৌন সমর্থন। বিশেষ করে মিসরের সিসির সঙ্গে তার গলায় গলায় ভাব।
লিবিয়ার সামনে নির্বাচন। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিলে এ বছরের শেষ দিকে লিবিয়াতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা চালাচ্ছে। আর এই নির্বাচন আয়োজন নিয়ে নতুন করে আলোচনায় দেশটি। লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে জাতিসংঘ সমর্থিত জাতীয় ঐক্যের যে সরকার রয়েছে, এটি এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। হাফতার এরই মধ্যে এ সরকারকে অবৈধ বলেছেন। হাফতার যে সরকারকে অবৈধ বলেছেন, এই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফায়েজ আল সারাজ। ফায়েজের আহামরি কোনো রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নেই, তার বাবা গাদ্দাফির মন্ত্রিসভার একজন সদস্য ছিলেন। তবে মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত ফায়েজের জনসমর্থন রয়েছে। আগামী নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবেই ভোটার টানতে পারবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর বাইরে আর কারা কারা হচ্ছেন প্রার্থী? শোনা যাচ্ছে প্রার্থী হতে পারেন পূর্বাঞ্চলের একক ক্ষমতাবান খলিফা হাফতারও। কিন্তু হাফতার নির্বাচনে অংশ নেবেন কিনা অথবা নির্বাচনে অন্য কোনো পক্ষ জয়ী হলে তা তিনি মানবেন কিনা, এ নিয়ে আশঙ্কা আছে। হাফতারের সুস্থতা নিয়েও মিডিয়ায় নানা ধরনের গুঞ্জন আছে। এপ্রিলের মধ্যভাগে তিনি প্যারিসের একটি হাসপাতালে কোমায় ছিলেন। এমনকি এও প্রচার হয়েছিল, হাফতার জীবিত নেই। তবে গুঞ্জন ভুল প্রমাণ করে দেশে ফিরেছেন তিনি। ৭৫ বছর বয়সী হাফতারের লক্ষ্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমর্থিত জাতীয় ঐক্যের সরকারকে হটিয়ে রাজধানী ত্রিপোলির দখল নেওয়া। আর তা সম্ভব হলে তিনিই হবেন গোটা লিবিয়ার একক কাণ্ডারি। প্রতিবেশী চাদে ব্যর্থ অভিযানের দায়ে হাফতারকে কর্নেল গাদ্দাফি সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। এরপর থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে একরকম নির্বাসিত জীবনযাপন করছিলেন। ২০১১ সালের অক্টোবরে গাদ্দাফির পতনের পর দেশে ফেরেন হাফতার। আনসার আল শরিয়াসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থি গোষ্ঠী তখন লিবিয়ায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তারা পশ্চিমাদের বিভিন্ন অবস্থানে হামলা শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো জোট মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। এক পর্যায়ে ইরাক, সিরিয়ার মতো লিবিয়াতেও ইসলামিকে স্টেটের তৎপরতা শুরু হয়। হাফতার মিসর ও আমিরাতের সামরিক সহযোগিতায় এসব জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানে নামেন। তার বাহিনী লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা এলএনএ বলে পরিচিত। ২০১৪ সালে ইসলামপন্থি ও জঙ্গিদের হটিয়ে বন্দরনগরী বেনগাজিসহ পূর্বাঞ্চলে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন খলিফা হাফতার। এই সময় বহু সাধারণ লিবীয়ও ভিটেমাটি হারান।
আসছে নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে গাদ্দাফির ছেলে ডক্টর সাইফ আল ইসলামের নামও শোনা যাচ্ছে। তবে সাইফ প্রার্থী হবেন কিনা তা নিশ্চিত নয়। চলতি বছরের মার্চ মাসে তিউনিসিয়াতে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেওয়া হয়, আসছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল ইসলামও প্রার্থী হচ্ছেন। কিন্তু এ ঘোষণা সাইফ নিজে দেননি, ঘোষণাটি এসেছিল লিবিয়ান পপুলার ফ্রন্ট পার্টির নেতা আয়মান আবু রাসের পক্ষ থেকে। ঘোষণার পরদিন সাইফের অনুগত জিনতান মিলিশিয়ারা জানায়, সাইফ আল ইসলাম এ ধরনের ঘোষণা দেওয়ার জন্য তার পক্ষে কাউকে নিয়োগ করেননি।
সাইফ ছিলেন বাবা গাদ্দাফির পছন্দের ব্যক্তি, তাকে তার পিতার উত্তরাধিকার ভাবা হতো। পশ্চিমা শিক্ষায় সুশিক্ষিত সাইফ অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ইস্যুতে বাবা গাদ্দাফির একজন পরামর্শক হয়ে উঠেছিলেন। তার অর্থনীতি জ্ঞান ভালো ছিল। ২০১১ সালে গাদ্দাফির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হলে সাইফ বাবার পক্ষ নেন। নিজ দেশের আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাইফের অবস্থান এখন কেউ বলতে পারছে না। উচ্চ আদালত থেকে দণ্ডাদেশ বাতিল না হলে সাইফ কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। গাদ্দাফি যুগে মানুষ বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা আর শিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছে। আগেই উল্লেখ করেছি, এসব নাগরিক সুবিধা বর্তমান লিবীয় প্রশাসন দিতে পারছে না। তাই সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও দেশটির অর্থনীতি নিয়ে যারা ক্ষুব্ধ, তাদের ভোট টানতে পারবেন গাদ্দাফি পুত্র সাইফ।
তবে লিবিয়াতে যারাই ক্ষমতায় বসবেন, ঐক্যবদ্ধ লিবিয়া প্রতিষ্ঠা করাই তাদের জন্য হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা কি লিবিয়ায় গোষ্ঠীগত বিবাদ মেটাতে পারবেন? সশস্ত্র মিলিশিয়াদের কবল থেকে রাষ্ট্রীয় তেলের খনিগুলো উদ্ধার করতে পারবেন? বিপুল বেকার নাগরিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবেন? এসবের সমাধান যদি না হয়, তাহলে লিবিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল কোনো গুরুত্বই বহন করবে না। তারপরও সেখানে একটা ঐক্যবদ্ধ সরকার দরকার, পথ যত বন্ধুরই হোক যাত্রা তো শুরু করতে হবে!

গণমাধ্যমকর্মী

sohel.shalbanÑgmail.com