‘কেলেঙ্কারিমুক্ত ব্যাংক খাত দেখতে চাই’

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুরশিদ কুলি খান। দেশের ব্যাংকিং জগতে ‘ক্যামেলস রেটিং’-এর জনক হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত। জনতা, কৃষি ও ওরিয়েন্টাল (বর্তমান আইসিবি) ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও চেয়ারম্যান পদে থেকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এই ব্যাংকার।

মুরশিদ কুলি খান সম্প্রতি প্রস্তাবিত বাজেট ও ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন শেয়ার বিজের সঙ্গে। অবসরে থাকা বিশিষ্ট এ ব্যাংকারের সঙ্গে কথা বলেছেন শেয়ার বিজের নিজস্ব প্রতিবেদক নিয়াজ মাহমুদ

শেয়ার বিজ: ব্যাংকার হলেন কীভাবে?

মুরশিদ কুলি খান: ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। তখন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখলাম বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগের। সে পদের বর্তমান নাম ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর’। পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হই। তখনকার কৃষি ব্যাংকের এমডি হেমায়েত উদ্দিন আহমদের অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগদান করি। সেখান থেকেই কর্ম ও ব্যাংকিং জীবনের সূচনা।

শেয়ার বিজ: এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন ৩৮ বছর। এ সময়ের মধ্যে ব্যাংক খাতে অনেক অবদান রেখেছেন। সেসব বিষয়ে যদি কিছু বলেন…

মুরশিদ কুলি খান: সব সময় পেশাগত কাজকে গুরুত্ব দিতাম। অনেক সময় পরিবারের কাজের চেয়েও প্রাধান্য দিতাম ব্যাংকের কাজকে। এমনকি আমার বাবার মৃত্যুর শেষ মুহূর্তেও ব্যাংকের কাজের জন্যই বাবাকে দেখতে যেতে পারিনি।

আমি তফসিলি ব্যাংকগুলোর উন্নয়নে ‘ক্যামেলস রেটিং’ পদ্ধতি বাংলাদেশে চালু করি। ব্যাংককে ভালো রাখার জন্য এ পদ্ধতি দেশে-বিদেশে প্রশংসা অর্জন করেছে। এছাড়া অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেছি।

শেয়ার বিজ: ব্যাংকের মান নির্ধারণে ক্যামেলস রেটিং পদ্ধতির আইডিয়াটা কীভাবে আসে?

মুরশিদ কুলি খান: ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তখন তাদের দুর্বল ব্যাংকগুলোর প্রতি যে বিশেষ নজর ও উন্নয়ন কার্যক্রম তা দেখেই এই ব্যতিক্রমধর্মী আইডিয়াটা আসে।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি আর কোন কোন ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করেছেন?

মুরশিদ কুলি খান: আমার ক্যারিয়ার শুরু ও শেষÑদুটিই হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। এর পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করেছি দেশের বিশেষায়িত খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের। তখন সাধারণ মানুষ ও কৃষকের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়েছিল। বেশ এনজয় করেছি। তাদের জন্য টানা ২৪ ঘণ্টাও কাজ করেছি। লোকসানি ব্যাংককে মুনাফার মুখ দেখিয়েছি। এছাড়া জনতা ব্যাংকের এমডি নিযুক্ত হয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রতিযোগিতা শুরুর অবস্থান তৈরি করেছিলাম। ওরিয়েন্টাল ব্যাংককে বাঁচানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে এমডি ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছি।

শেয়ার বিজ: ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মুরশিদ কুলি খান: প্রস্তাবিত বাজেট উচ্চাভিলাষী নয়। বড় বাজেট না হলে আমরা কীভাবে বড় হবো! আমাদের বাজেট জিডিপির ১৮ শতাংশ; যা খুব বেশি নয়। অন্যান্য দেশে এরচেয়ে বেশি বাজেট করে। আমাদের অর্থনীতি অনেক বড় হচ্ছে। বড় অর্থনীতির জন্য বড় বাজেট দরকার।

শেয়ার বিজ: এ বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা কী আমাদের আছে?

মুরশিদ কুলি খান: বাজেট বাস্তবায়নই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের আমলাতন্ত্র দক্ষ কি-না! সেখানে আমাদের দক্ষতা আরও বাড়াতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। কারণ এটা মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারের এটাই পূর্ণাঙ্গ শেষ বাজেট। কাজেই এ মেয়াদের মিশন-ভিশন বাস্তবায়নের শেষ বাজেট এটি। সরকার কিছু মেগা প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে; যা দেশের জন্য ভালো। অর্থনীতির স্বার্থে এসব প্রকল্পের কাজ খুব দ্রুত শেষ হওয়া দরকার।

শেয়ার বিজ: প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক কর্তনের বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

মুরশিদ কুলি খান: এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সঞ্চয়কে আরও উৎসাহিত করা দরকার। ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক থেকে সরকারের আয় কিন্তু সীমিত। সীমিত এ আয়ের জন্য বড় ক্ষতি করা ঠিক হবে না। এর ফলে ব্যাংকে সঞ্চিত সঞ্চয় খুব দ্রুত কমে যেতে পারে। যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে। কাজেই সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে আশা করছি।

শেয়ার বিজ: বর্তমান ব্যাংক খাতের অবস্থা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মুরশিদ কুলি খান: দেশের ব্যাংক খাতে অনেক সিস্টেম লস হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেখানে সরকারকে লভ্যাংশ দেবে, সেখানে ব্যাংকগুলোকে সরকারের মূলধন পূরণ করতে হচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলোয় অব্যবস্থাপনার জন্যই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

শেয়ার বিজ: বাজেটের টাকায় সরকারি ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি পূরণের কারণ কী?

মুরশিদ কুলি খান: ব্যাংকগুলোয় ক্যাপিটাল শর্ট ফল্ট হচ্ছে। লোনের জন্য প্রভিশন রাখা হচ্ছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এগুলোর জন্য দায়ী ব্যাংকগুলোর অব্যবস্থাপনা। আর এ অব্যবস্থাপনার সঙ্গে ব্যাংকার ও পরিচালনা পর্ষদ জড়িত।

শেয়ার বিজ: এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?

মুরশিদ কুলি খান: এ বিষয়ে বাজেটে একটি দিকনির্দেশনা থাকা দরকার ছিল। মন্দা ঋণ বা খেলাপি ঋণ কিংবা কেলেঙ্কারির অর্থ কীভাবে আদায় হবে? এজন্য কোনো স্পেশাল রিকভারি অ্যাক্ট হবে কি নাÑসে বিষয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি ছিল।

শেয়ার বিজ: ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে আর ফেরত দিতে হয় না। ঋণগ্রহীতাদের এমন মানসিকতা দূর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

মুরশিদ কুলি খান: এখানে ব্যাংকারসহ বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কঠোর হতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ সমগ্র আর্থিক খাতের জন্য উদ্বেগজনক। খেলাপি ঋণ আদায় ও ব্যাংক খাতে সুশাসন বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সর্বস্তরের সক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে। এছাড়াও ব্যাংকারদের আরও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। একই সঙ্গে সৎ মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

শেয়ার বিজ: নতুন ব্যাংকার সম্পর্কে কিছু বলুন। 

মুরশিদ কুলি খান: এ পেশায় যারা নতুন আসছে, তারাও বেশ ভালো করছে। আইটির দিক দিয়ে তারা অনেকটাই এগিয়ে। তারা নিজেরাই সফটওয়্যার তৈরি করছে। তবে সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যাংকারের বেশ সংকট। নতুন ব্যাংকারদের উদ্দেশে বলতে চাই, কাজ জেনে দক্ষ হলে শত্রুও চাকরি বা কাজের জন্য ডাকবে।

শেয়ার বিজ: দেশের ব্যাংক খাতকে কীভাবে দেখতে চান?

মুরশিদ কুলি খান: কেলেঙ্কারিমুক্ত সমৃদ্ধশালী ব্যাংক খাত দেখতে চাই।

শেয়ার বিজ: মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মুরশিদ কুলি খান: ধন্যবাদ আপনাকে এবং শেয়ার বিজ পরিবারকেও।