কোটা বাতিলের সুফল পাক সাধারণ মানুষ

নবম থেকে ১৩তম গ্রেডের (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি) সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করেছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এটি জারি করে। এর মাধ্যমে ৪৬ বছর ধরে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে যে কোটা ব্যবস্থা ছিল, তার অবসান হলো। পরিপত্রে বলা হয়, সব সরকারি দফতর, স্বায়ত্তশাসিত বা আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন করপোরেশনের চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার ভিত্তিতে সেটা করা হবে এবং বিদ্যমান কোটা বাতিল হলো।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সন্তানদের সুবিধা দেওয়ার জন্য এ কোটা চালু করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য এটা প্রযোজ্য হয়। ৬৪টি জেলার জন্যও কোটা আছে। মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি এবং দেশের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই কোটা চালু করা হয়েছিল।
কোটা ব্যবস্থার কারণে অনেক মেধাবী প্রার্থী সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে চায় না কিংবা সে ক্ষেত্রে অসুবিধায় পড়ে। এতে সরকারি প্রশাসনে মেধাবীর সংখ্যা কমে যাওয়ার শঙ্কা প্রকট হয়ে উঠছিল। শিক্ষার্থী বা চাকরিপ্রার্থীরা শুধু নন, বিশেষজ্ঞরাও কোটা সংস্কারের পক্ষে ছিলেন। বাতিলের পক্ষে নয়, কোটা সংস্কারের দাবিতেই আন্দেলন গড়ে উঠেছিল। এ বিষয়ে অঘোষিত জাতীয় ঐক্যমতও ছিল। কোটা নিয়ে আন্দোলনের শেষদিকে কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংসতা হলেও সরকারের সিদ্ধান্তে তা অবশেষে সফল হলো বলা যায়। তবে কোটা সংস্কারের দাবিকারীরাও এতে কিছুটা অবাক। তারা আসলে চেয়েছিলেন এটাকে যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে। আমরাও এর আগে বলেছিলাম, কোটা পুরোপুরি বাতিল নয়। কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি হলেও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটি পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। যৌক্তিকতা বিবেচনার সুযোগ সবসময়ই থাকে বলে আমরাও মনে করি।
সরকারি চাকরি বা কোনো ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা চিরদিনের জন্য নয়; এটি সাময়িক। নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ পিছিয়ে পড়া মানুষকে সমপর্যায়ে আনতেই কোটার কথা ওঠে এবং এর বিকল্প নেই। সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ের ২৯ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ তবে সেখানে এও বলা ছিল, ‘নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা হইতে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না’। এ সুবাদেই আনা হয় কোটা সুবিধা। তবে তা মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়াতেই প্রশ্ন জোরালো হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি অল্প সুদে বড় অঙ্কের গৃহঋণ প্রদান এবং চাকরিরত অবস্থায় মারা গেলে ঋণ পরিশোধ করতে হবে না সরকারি চাকরিজীবীদের- এমন ব্যবস্থা হয়েছে। সরকারি দফতর, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন করপোরেশনে চাকরি এভাবে ক্রমে আকর্ষণীয় হচ্ছে। শুধু সুবিধা, নিশ্চয়তার জন্যই নয়; দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য প্রভৃতির জন্যও সরকারি চাকরিতে আগ্রহ বেশি। ‘সরকারি চাকরি না পেলে জীবন শেষ’, তা কিন্তু নয়। এ খাতে চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি সেভাবে সম্ভবও নয়। আমাদের কর্মসংস্থানের বড় উৎস বেসরকারি খাত। কর্মপরিবেশ নিশ্চিত এবং শ্রম আইন বাস্তবায়ন করা গেলে বেসরকারি খাতের প্রতিও চাকরিপ্রার্থীরা আকৃষ্ট হবে। নিজ উদ্যোগে তারাও অনগ্রসরদের জন্য কিছু কোটার চর্চা করতে পারে।
সাধারণভাবে কোটার বিলুপ্তি সুফল বয়ে আনবে বলেই প্রত্যাশা। এখন নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উৎকোচের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা জোগানোর অভিযোগ পুরোনো। এটি কঠোরভাবে মোকাবিলা করা না গেলে জনপ্রশাসনে অযোগ্যদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাবে না। কোটা সংস্কার পক্ষের সবারই মূল দাবি ছিল ‘মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ’। নিয়োগের কোনো পর্যায়ে অনিয়ম-দুর্নীতি হলে মেধাবীরা আগের মতোই বঞ্চিত হবে। তাই কোটা বাতিলই সমাধান নয়, এর সুফল যাতে দেশবাসী পায়- সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে সরকারি চাকরিজীবীরা সাধারণ মানুষকে সেবা দিয়ে থাকেন। জনকল্যাণে নিয়োজিত এ কর্মীদের মান নিয়ে যাতে প্রশ্ন না ওঠে, সেটা তাই নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। শুধু সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মীদের দায়িত্বানুভূতি জাগ্রত করা যাবে না। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলেই তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তবে সব দিক থেকে যোগ্য হলেও প্রশাসনে দলীয়করণ থাকলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের প্রত্যাশিত সেবা পাবে না সাধারণ মানুষ। এদিকে সবিশেষ দৃষ্টি রাখা চাই।