মত-বিশ্লেষণ

কোমলমতি শিশুদের জন্য চাই এলাকাভিত্তিক বিদ্যালয়

ড. শিল্পী ভদ্র: জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ ২০১৯-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘এলাকাভিত্তিক প্রাইমারি স্কুলে’ সব শিশুকে ভর্তি নিতে হবে। স্কুলে যাওয়ার অধিকার প্রত্যেকের রয়েছে। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে, সাত বছর বয়স হলে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠায়, তার আগে পাঠায় না। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক ছোটবেলায় বাচ্চারা স্কুলে যায়। তারা যেন খেলতে-খেলতে, হাসতে-হাসতে সুন্দরভাবে নিজের মতো লেখাপড়া করতে পারে, সে ব্যবস্থাই করা উচিত। এলাকাভিত্তিক প্রত্যেকটি শিশু যেন খুব সহজে স্কুলে যেতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
উন্নত দেশগুলোয় আবাসিক এলাকায় বসবাসরত জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও ধরন প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো দেশে এটিকে ‘এলাকাভিত্তিক বা কমিউনিটি স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান’ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
কিন্তু আমাদের মতো জনবহুল দেশের শহরে স্কুলে যাতায়াত করতে গিয়ে পথিমধ্যে যানজট বা নানা সমস্যায় যত সময় নষ্ট এবং কষ্ট হয়, তাতে কোমলমতি শিশুদের হাসতে হাসতে শিক্ষাগ্রহণ আর হয়ে ওঠে না। আবার সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে এবং স্কুল ছুটির পর তাকে ফিরিয়ে আনতে অভিভাবকদের প্রচুর সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় হয়, যে অপচয়ের ক্ষতি সামষ্টিক ও জাতীয় হিসেবে ব্যাপক এবং অপূরণীয়। তাছাড়া পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল, হাওর-বাঁওড়, চা বাগান বা মঙ্গাপ্রবণ এলাকার শিশুদের দুর্গম-দূরবর্তী স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয় বলে অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারে না বা স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ঝরে পড়ে। সরকারের জোর প্রয়াস থাকা সত্ত্বেও এসব এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মঙ্গা ও দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন কারণে প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন পুরোপুরি সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন আবাসিক বাড়িতে ভাড়া হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো নেওয়া হয়, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ধারণার পরিপন্থি। শিশুদের জন্য নেই খেলার মাঠ, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগেও নেই কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ। অথচ দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে যে যার মতো করে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে। তাই শহরাঞ্চলে আবাসিক এলাকাগুলোয় যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড দেখা গেলেও মানসম্মত পাঠদান, খেলাধুলার পরিবেশ বজায় রেখে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম। ভাড়া বাড়িতে গড়ে ওঠা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সুন্দরভাবে পড়াশোনা করাটাও বিতর্কিত থেকে যায়।
দেখা যায়, একই এলাকায় কেজি স্কুল, বেসরকারি স্কুল, সরকার অনুমোদিত স্কুল, আবার সরকারি স্কুলও গড়ে তোলা হয়েছে। এর পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমসহ নানা ধরনের স্কুল, মাদ্রাসা, ক্যাডেট স্কুল, কওমি মাদ্রাসা, নুরানি মাদ্রাসা ইত্যাদিও দেখা যায়। এর অনেকগুলোয় পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষার্থীও নেই। বাংলাদেশ উš§ুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারীর দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২০০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৩০০-এর মতো কেজি স্কুল, ৬০টি মাদ্রাসা, ৫৯টি মাধ্যমিক স্কুল ও পাঁচটি কলেজ রয়েছে। বেশিরভাগ মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৫০ থেকে ৩০০-এর মধ্যেই ওঠানামা করছে। অথচ প্রতিটি মাদ্রাসা শিক্ষকের সংখ্যা ৩০ বা এর কম। মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭০০ থেকে ১২০০তে অবস্থান করছে। কলেজগুলোয় ৬০০ থেকে ১০০০ শিক্ষার্থী রয়েছে।
তার মতে, বাস্তবেই আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেভাবে গড়ে উঠছে ও পরিচালিত হচ্ছে, তার বেশিরভাগই শিক্ষা বিজ্ঞান সমর্থন করে না। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই চলছে ছাত্র সংকট। আবার কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাত্রের ভিড় সামলাতে পারছে না। শহরাঞ্চলে এলাকার চাহিদা মোতাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় সাধারণ মানুষকে সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে সবচেয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। লেখাপড়ার ব্যয়ভারও আকাশচুম্বী হয়ে পড়ছে দিনে দিনে।
কোচিং বাণিজ্য, মানহীন পাঠদান, অপ্রয়োজনীয় বই-পুস্তকের ভার, বিদ্যালয়গুলোর পরিচালনা পর্ষদের খামখেয়ালিপনা, শিক্ষাক্রম বহির্ভূত শ্রেণি ও বই-পুস্তকের ছড়াছড়ি আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহী না করে অনাগ্রহী করতেই বেশি ভূমিকা রাখছে। দেশে কতটি স্কুলের প্রয়োজন, সেটি জনবসতির পরিসংখ্যানভিত্তিক হওয়া বাঞ্ছনীয়, সে ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হওয়া একান্তই প্রয়োজন। দেশের কোনো উপজেলায়, কোনো শহরে, কোনো আবাসস্থলে কতটি উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের মহাবিদ্যালয় প্রয়োজন, তারও ম্যাপিং হওয়া আবশ্যক।
উন্নত দেশে মূলত প্রতিটি এলাকায় শিশুদের জন্য কেজি স্কুল, এর ওপরের কিশোরদের জন্য স্কুল, তার চেয়ে বড়দের জন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গড়ে তোলা হয়; যার ফলে অন্তত স্কুল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অন্য এলাকায় যেতে হয় না। অভিভাবকদেরও সন্তানদের স্কুল ও পড়াশোনা নিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় না। যখনই আবাসিক এলাকার পরিধি বড় হয়ে যায়, তখনই প্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা হয়। গ্রামাঞ্চলেও অনেকটা তাই। কোথাও বিদ্যালয়ের স্বল্পতা যেমন নেই, আবার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও কোথাও নেই। এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে সেসব দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ম্যাপিং হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে এমন বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও অপচয় রোধ করার এখনই প্রকৃত সময়। যদিও সরকার এ ব্যাপারে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত মানুষের চাহিদা মোতাবেক ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শহর ও গ্রামসহ সর্বত্র গড়ে তোলা। কেননা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেসব শিক্ষার্থী পড়তে আসে, তাদের মানহীন পাঠদান কিংবা লেখাপড়ার পাশাপাশি সহশিক্ষাক্রম না দেওয়ার কোনো অধিকার কোনো প্রতিষ্ঠানের থাকার কথা নয়। কোনো অবস্থায়ই প্রয়োজনের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা কাম্য নয়, আবার প্রয়োজনের চেয়ে কমসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও থাকা উচিত নয়।
বাংলাদেশে স্কুল-শিক্ষার পদ্ধতি ও কারিকুলামে বিভিন্নতা থাকায় শ্রেণিবৈষম্য প্রকটতর হচ্ছে। আবার বাংলাদেশের শিশুদের ৯১ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। তার মধ্যে ৪১ শতাংশ প্রাথমিক স্তরে এবং ৪২ শতাংশ মাধ্যমিক স্তরে তথা এসএসসির আগেই ঝরে পড়ে। শতচেষ্টা সত্ত্বেও এ ঝরে পড়া রোধ করা যাচ্ছে না। এ জাতীয় বহু সমস্যার সমাধান এবং প্রতিভাময় জাতি গঠনে স্কুলিং ব্যবস্থার সংস্কার তথা ‘এলাকাভিত্তিক স্কুলিং (অৎবধরিংব ঝপযড়ড়ষরহম)’ পদ্ধতিকে ঢেলে সাজানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
এলাকাভিত্তিক স্কুল দেশ ও জাতির জন্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে অতীব প্রয়োজন। স্কুল এলাকাভিত্তিক হলেÑস্কুলে যাতায়াতের জন্য যানবাহনের প্রয়োজন হবে না; ফলে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে, সড়ক দুর্ঘটনাও হ্রাস পাবে। জাতীয় ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল আমদানি ও গ্যাসের অপচয় রোধ হবে; বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং অর্থের অপচয় কমবে। যাতায়াত সংকট ও যাতায়াত ব্যয় কমে যাবে বিধায় শিক্ষার্থীর পেছনে অভিভাবকের টেনশন থাকবে না এবং অর্থ ব্যয় হবে না। ফলে দুর্নীতি হ্রাস পাবে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শ্রম ও সময়ের অপচয় রোধ হবে। সন্তানের স্বার্থেই অভিভাবকরা নিজ এলাকার স্কুলের উন্নয়নে তৎপর হবেন। ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য সন্তানকে অন্য শহরে পাঠাতে হবে না। ভর্তি-প্রতিযোগিতা না থাকায় ভর্তি-দুর্নীতি বন্ধ হবে। স্কুল পর্যায়ে কোচিং-ব্যবসা ও শিক্ষা-বাণিজ্য বন্ধ হবে। মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত হবে। শিশু-কিশোর বয়সেই শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, মূল্যবোধ, টিম-স্পিরিট, শেয়ারিং ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা লাভ সহজ হবে।
শিক্ষাব্যবস্থায় বিভাজন হ্রাসের ফলে সামাজিক শ্রেণিবৈষম্য হ্রাস পাবে। সামগ্রিকভাবে স্কুলে শিক্ষার মান ও পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে। শিশুর জš§ ও ক্রমবৃদ্ধির সঠিক ও যথাযথ পরিসংখ্যান রাখা সম্ভব হবে। ফলে সার্বিক অর্থে মেধাবী ও প্রতিভাবান জাতি এবং জ্ঞানভিত্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন সহজ হবে।
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার, যা প্রতিটি মানুষের সুন্দর জীবনের জন্য অপরিহার্য। শিক্ষা ছাড়া কোনো দেশ বা জাতিই সমৃদ্ধ হয়নি। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজšে§র জন্য আধুনিক ও গুণগত শিক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নে সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা থাকা বাঞ্ছনীয়। আর এসব বিষয় বিবেচনায় ‘এলাকাভিত্তিক স্কুল’ বিষয়টি অতি যৌক্তিক এবং সময়ের দাবি।
মুরগির খাঁচার মতো কাভার্ডভ্যান বা রিকশাভ্যানে করে শিশুকে স্কুলে নেওয়া-আনা করালে সে শিশুর কাছ?থেকে ঈযরপশবহ ঐবধৎঃ ছাড়া উদারতা আশা করা যায় না। শিশু-মেধার বিকাশকে রাস্তার যানজটে আটকে রেখে এবং শিশুকে গাড়ির ধোঁয়া ও ধুলাবালি খাইয়ে যেভাবে তার স্বাস্থ্য ও মেধা ধ্বংসের পাশাপাশি জাতির সর্বাধিক মূল্যবান সম্পদের ক্ষতি করা হচ্ছে, তা রক্ষার্থে এখনই প্রয়োজন এলাকাভিত্তিক স্কুলব্যবস্থার বাস্তবায়ন।
স্কুল শিক্ষাব্যবস্থা হবে অবশ্যই একমুখী ও বৈষম্যহীন। এলাকাভিত্তিক ও আধুনিক এ ধরনের স্কুলব্যবস্থা আমাদের জাতীয় বহু সমস্যার সমাধান এনে দেবে; আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হয়ে যাবে অর্থনৈতিক নানা সমস্যার। বর্তমান বিভাজিত শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের যেভাবে বিভক্ত করে ফেলছে, তা থেকেও রক্ষা পাবে জাতি।
এলাকাভিত্তিক স্কুলিং প্রবর্তিত হলে প্রাথমিক শিক্ষার মজবুত ভিতের ওপর তৈরি হবে উচ্চশিক্ষার কাঠামো, যে কাঠামোতে প্রবেশাধিকার থাকবে শুধু মেধাবীদের। শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত এ মেধাবী শ্রেণিই দেশের শিক্ষা-গবেষণা-সরকার ও রাজনীতি পরিচালনার জন্য তৈরি হবে। বাকি শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার পেছনে সময় ও অর্থের অপচয় না করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের মধ্য দিয়ে দক্ষ ও সুযোগ্য নাগরিকে পরিণত হবে। এলাকাভিত্তিক স্কুলিংয়ের মাধ্যমে এরূপ পরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা মেধাবী ছাত্র ও দক্ষ নাগরিকরাই পরিণত হবে প্রতিভাময় ও আলোকিত জাতিতে। এভাবে গড়ে ওঠা একটি মেধাবী প্রজš§ই সহজে বদলে দেবে সমাজ, দেশ এবং সমগ্রবিশ্ব।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..



/* ]]> */