কোম্পানির দুঃসময়

শামসুন নাহার: পরিদর্শনকারী দল আরেক দফা তলব করে রিলায়ান্স টিমকে। রিলায়ান্সের কিছু সিনিয়র অফিসার গিয়ে একটি প্রেজেন্টেশনসহ তাদের রিপোর্ট পেশ করে। এ রিপোর্ট আবার পাঠানো হয় কাস্টমস্্ সার্ভিসে। তারা রিলায়ান্সের তখন পর্যন্ত যাবতীয় ইকুইপমেন্ট আমদানির তথ্য যাচাই করে। এর তিন মাস পর রিলায়ান্সের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানো নোটিস জারি করে বোম্বে কাস্টমস্। তাদের অভিযোগ, কোম্পানিটি ১১৪ কোটি ৫০ লাখ রুপির স্পিনিং মেশিন ও অননুমোদিত শিল্প উপকরণ চোরাকারবারি করেছে। এছাড়া মোট ১১৯ কোটি ৯৬ লাখ রুপি শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ দিয়ে ‘কেন এ অর্থ পরিশোধ করতে রিলায়ান্সকে বাধ্য করা হবে না’ তার কারণ দর্শাতে বলেছে শুল্ক বিভাগ। এছাড়া অভিযুক্ত চোরাচালানির পণ্য বাজেয়াপ্ত করা ও বকেয়া শুল্কের পাঁচগুণ অর্থ জরিমানার আশঙ্কাও রয়েছে। উপরন্তু আমদানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে এ শো কজ নোটিসে।

একটি কোম্পানির জন্য এর চেয়ে বড় দুঃসময় হয়তো আর হতে পারে না। গুরুমূর্তির রিপোর্টের ফলে আম্বানির ক্রমবর্ধমান অগ্রগতিতে বিরাট বাধা তৈরি হলো। প্রেসের শক্তি দেখিয়ে দিয়েছেন গোয়েঙ্কা। আর ‘অপেশাদার সাংবাদিক’ গুরুমূর্তির রিপোর্টগুলো অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের জগতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বটে। মূলত তার প্রতিবেদনগুলোর কারণেই অন্তত তখনকার মতো বাণিজ্যের বৈধ পথ আম্বানির জন্য প্রায় বন্ধই হয়ে গেল।

আম্বানি উপাখ্যানের এ পর্যায়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। তিনি ভুরে লাল। লোদী গার্ডেন এলাকায় সবাই তাকে একরোখা লোক হিসেবেই চেনে। তার মিলিটারি গোঁফ ও তীক্ষè চোখ দেখেই যে কেউ বুঝতে পারবে কড়া ধাঁতের মানুষ এই ভুরে লাল। সরকারি এ অফিসার শখ করে মিলিটারি গোঁফ রাখেননি অবশ্য। ১৯৬২ সালে ভারতের পূর্বাংশে চীন যখন আক্রমণ হানে তখন ইন্ডিয়ান আর্মির একটি স্বল্পমেয়াদি কমিশনে যোগ দিতে হয়েছিল তাকে। পরে ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের (আইএএস) পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পাওয়ায় আর্মি থেকে ক্যাপটেন র‌্যাঙ্ক নিয়ে অবসর নেন ১৯৭০ সালে। উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রশাসকের দায়িত্ব পালনের পর একপর্যায়ে ভিপি সিংয়ের সচিব পদ অর্জন করেন। সিং তখন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী।

১৯৮৫ সালের মার্চে সিং কালোবাজারি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তখন ভুরে লালকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেন অর্থমন্ত্রী ভিপি সিং। ১৯৮৬ সালের মধ্যে ভুরে লালও ধীরুভাইয়ের ওপর আক্রমণে শামিল হন। এ কাজে বেশ মজা পান তিনি। যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয় তাদের ওপর ক্ষমতার আধিপত্য খুবই উপভোগ করেন ভুরে লাল। এ কাজে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ফলাতেন তিনি। তদন্তের রিপোর্ট ও ফাইল তার অফিস থেকে বাইরে যেত না। ফলে প্রতিটি তদন্তের ওপর নজরদারি রাখতে পারতেন। পাশাপাশি ভুরে লালের এক ধাপ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব সচিব বিনোদ পাণ্ডের সঙ্গেও তার চমৎকার সুসম্পর্ক ছিল। আর বিনোদ পাণ্ডে ছিলেন ভিপি সিংয়ের একান্ত আস্থাভাজন। সুতরাং সব মিলিয়ে ধীরুভাইয়ের বিরুদ্ধে সরকারের ওপরমহলে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল তখন।

ধীরুভাইয়ের ব্যাপারে সবার আগে ১৯৮৬ সালের মে-তে রিলায়ান্সের গোপন অর্থায়ন কেসটি নিয়ে উঠেপড়ে লাগলেন। তিনি লন্ডনে গেলেন আইল অব ম্যানের কোম্পানি মালিকদের খুঁজতে। কিন্তু ওই ‘ট্যাক্স হেভেন’-এ বিনিয়োগকারীদের তথ্য কঠোর গোপনীয়তার বেড়াজালে আবদ্ধ। এরপর তিনি গেলেন ল্যাচেস্টারে, শাহদের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু গিয়ে দেখলেন ক’দিন আগেই শাহ পরিবারের কর্তা কৃষ্ণকান্ত শাহ মারা গেছেন। কারলস্কর গ্রুপের সন্ধানে গেলেন জার্মানি। সেখানেও ব্যর্থ হলেন। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনালের (বিসিসিআই) মুম্বাই ব্রাঞ্চেও অভিযান চালিয়েছে। এর স্থানীয় মহাপরিচালককে অর্থপাচারের বিশেষ আইনের আওতায় অভিযুক্ত করে ইডি। বিসিসিআইয়ের এশীয় কার্যক্রমের প্রধান সল্ক নাকভির সঙ্গে আলাপ করেন ভুরে লাল। নাকভিকে তিনি প্রস্তাব দেন, যদি তারা রিলায়ান্সের সন্দেহজনক লেনদেনের ব্যাপারে তথ্য দিয়ে সাহায্য করে ইডি ব্যাংক অফিসারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে না। রাজি হয়ে গেলেন নাকভি। কিন্তু ক’দিন বাদেই আবার ফিরে এসে জানালেন লুক্সেমবার্গভিত্তিক ব্যাংক হওয়ায় বিসিসিই ভারতীয় আইন মেনে চলতে বাধ্য নয়।

কোনোভাবেই যখন কিনারা করতে পারছিলেন না, তখন গুরুমূর্তির শরণাপন্ন হলেন ভুরে লাল। ১৯৮৬ সালের জুলাইতে তারা প্রথম দেখা করলেন। এরপর বছরের বাকি অর্ধেক সময়ে যখনই দিল্লি গেছেন গুরুমূর্তি প্রতিবারই ভুরে লালের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। গোয়েঙ্কার ব্যাকআপ, এক্সপেসের তথ্যভাণ্ডার ছাড়াও গুরুমূর্তি নিজেই ইংল্যান্ডে গিয়ে সেখানকার গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসেছেন। এছাড়া ওয়াদিয়ার মাধ্যমে কিং’স গোয়েন্দা বাহিনীও এ কেসটি নিয়ে তদন্ত করছিল। মোটকথা, সরকারি, বেসরকারি, বিদেশি সংস্থা ও প্রেসÑঅনুসন্ধান চলছিল সবদিক থেকে।

ওদিকে নুসলি ওয়াদিয়াও রিলায়ান্সের ব্যাপারে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে নিয়মিত আলাপ করতেন। তাদের দুজনের মধ্যে চমৎকার সখ্যও তৈরি হয়েছে। দুজনের বয়সও প্রায় কাছাকাছি। দুজনের বাবাই পারসি বংশোদ্ভূত। আশেপাশের অন্য সবার চেয়ে তারা দুজন একটু বেশিই কসমোপলিটান। তাই মনের দিক থেকে এটা সাযুজ্য গড়ে উঠেছে তাদের মধ্যে। ওয়াদিয়া রাজীবকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, রিলায়ান্সকে লক্ষ করে জোর তদন্ত করা দরকার। একটি কোম্পানির মনোপলি বন্ধ করতে পারলে আরও অনেক কোম্পানি বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। রাজীবও বুঝলেন চোরাকারবারি ও বেনামি অর্থায়নের অভিযোগই ধীরুভাইকে কোণঠাসা করার সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র। এবার রাজীব নিজেই গুরুমূর্তির কাছ থেকে রিলায়ান্সের পুরো কাহিনি শুতে চাইলেন। ওয়াদিয়া নিজে আগস্টে এক সপ্তাহব্যাপী সিরিজ বৈঠকের ব্যবস্থা করে দিলেন। কিন্তু তখন কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রপ্রধানদের একটি বৈঠকে অংশ নিতে জিম্বাবুয়ে যাওয়ার প্রোগ্রাম ঠিক হয়। ফলে গুরুমূর্তিকে নিয়ে বসার সময় পাননি প্রধানমন্ত্রী। তার পরিবর্তে এ কাজের দায়িত্ব দিয়ে যান গান্ধী পরিবারের বিশ্বস্ত কংগ্রেস নেতা মোহাম্মদ ইউনুসকে।

সেপ্টেম্বরে নুসলী ওয়াদিয়া ব্যবসায়িক কাজে নিউইয়র্ক গিয়ে নিজেই কিছুটা গোয়েন্দাগিরি করেন। তিনি খোঁজ নেন আমেরিকার নাগরিক প্রফল্ল শাহর ব্যাপারে। প্রফুল্ল আইল অব ম্যানের শেয়ারহোল্ডার তালিকায় থাকা একজন বিনিয়োগকারী। অথচ তার ব্যাপারে তেমন কিছুই জানা যায়নি। ওয়াদিয়া নিউইয়র্কভিত্তিক অ্যাকাউনটেন্সি ফার্ম ক্রনিশ, লিয়েব, ওয়েইনার অ্যান্ড হেলিম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তাদের খোঁজ নিতে বলেন, প্রফুল্ল শাহ কোনোভাবে আমেরিকান আইন লঙ্ঘন করছেন কি না, কারণ শাহর মতো আমেরিকার কোনো নাগরিকের নামে যে কোনো আয়ের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। এতে সে আয়ের অংশ হাতে পান কি না পান, সেটা ধর্তব্য নয়। এ ব্যাপারে না জানালে তা কর আইনের পরিপন্থি হবে।

অক্টোবরে গুরুমূর্তি গেলেন লন্ডনে। সেখান থেকে ফায়ার ফক্স নামে নতুন একটি গোয়েন্দা গ্রুপের সন্ধান পান তিনি। ওয়াশিংটনভিত্তিক এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সরকারি অ্যান্টি-ফ্রড ইনভেস্টিগেটর মাইকেল হার্শম্যান। হার্শম্যান অনেক বড় বড় তদন্তের কাজ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডাল। এ স্ক্যান্ডাল নিয়ে কাজ করতে ভারতেও এসেছিলেন হার্শম্যান। তখন তার পরিচয় হয় গোয়েঙ্কার সঙ্গে। মাদ্রাজি অ্যাকাউনট্যান্ট গুরুমূর্তি আমেরিকায় গিয়ে হার্শম্যানকে পর্যন্ত খুঁজে বের করেছেন। কথা বলেছেন গোয়েঙ্কার পক্ষ থেকে।