কোম্পানির মালিকরা কারসাজিতে জড়ালে তা বেশি ক্ষতিকর

বাজারে বড় বিনিয়োগকারীদের গ্রুপ যে কারসাজি করে, তারচেয়ে বেশি ক্ষতিকর যখন কোম্পানির মালিকরা কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকে। কারসাজি করে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে মালিকরা নামে-বেনামে শেয়ার কেনেন। আবার একটি নির্দিষ্ট সময়ে ভালো ইপিএস দেখিয়ে নামে-বেনামে সেসব শেয়ার বিক্রি করে দেন এবং ইপিএস ভালো দেখিয়েও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেন না। এটি প্রায় ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বিএসইসিকে কড়া নজরদারি করতে হবে। তা না হলে বাজার সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের নেতিবাচক ধারণা বাড়বে। গতকাল এনটিভির মার্কেট ওয়াচ অনুষ্ঠানে বিষয়টি আলোচিত হয়।
খুজিস্তা নূর-ই-নাহারীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বালি সিকিউরিটিজ লিমিটেডের পরিচালক সৈয়দ সিরাজ উদ দৌলা, পুঁজিবাজার বিশ্লেষক মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী, এফসিএ এবং আইআইডিএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও মো. সালেহ আহমেদ। অনুষ্ঠানটি গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেন হাসিব হাসান।
সৈয়দ সিরাজ উদ দৌলা বলেন, শেয়ারবাজার একটি স্পর্শকাতর জায়গা। একটি দেশের পুঁজিবাজার সে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। পুঁজিবাজারের অবস্থা দেখে বোঝা যায় দেশের অর্থনৈতির অবস্থা কোনদিকে যাচ্ছে। কোম্পানি লাভের দিকে যাচ্ছে, না লোকসানের দিকে যাচ্ছে। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সেদেশের রাজনৈতিক বিষয়গুলো জড়িত থাকে। সামনে নির্বাচন। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে একটি অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিনিয়োগকারীর ওপর পড়ে। তবে এটি সাময়িক। আবার ধীরে ধীরে বাজার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসে। একটি গ্রুপ যে কারসাজি করে, তারচেয়ে বেশি ক্ষতিকর যখন কোম্পানির মালিকরা কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকে এবং কারসাজি করে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে মালিকরা নামে-বেনামে শেয়ার কেনেন। আবার একটি নির্দিষ্ট সময় ভালো ইপিএস দেখিয়ে নামে-বেনামে শেয়ার বিক্রি করে দেন এবং ইপিএস ভালো দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেয় না। এক্ষেত্রে বিএসইসিকে কড়া নজরদারি করতে হবে।
মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ২০১০ সালে সূচক চার হাজার পয়েন্টে অবস্থান করে। এখন সাড়ে পাঁচ হাজারের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ ২০১০ সালের পর অনেক কোম্পানি পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং বাজার মূলধনও বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় সূচক বাড়েনি। তবে বাজার এখন স্থিতিশীলতার মধ্যে রয়েছে। শেয়ারের দাম বাড়বে, আবার কমবেÑএটাই পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক নিয়ম কিন্তু সেটি দেখা যাচ্ছে না। একটি মৌলভিত্তি কোম্পানির শেয়ার যে হারে বাড়ার কথা, সে হারে বাড়ছে না। এতে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরছে না। বাজারের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে গুজবভিত্তিক বিনিয়োগ। সব দেশের পুঁজিবাজারে গুজব আছে, তবে আমাদের দেশে তুলনামূলক বেশি। বিনিয়োগকারীদের যতই বিনিয়োগ সম্পর্কে সচেতন করুন না কেন, গুজবভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিরোধ করা না গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
মো. সালেহ আহমেদ বলেন, কয়েক মাস ধরে কয়েকটি কোম্পানি ভালো করছে; বাকিগুলো তেমন ভালো করছে না। যে কোম্পানিগুলো ভালো করছে এবং যারা ওই কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছেন, তারাই একটু লাভবান হচ্ছেন। আর বেশিরভাগ সাধারণ বিনিয়োগকারী লোকসানের মধ্যে আছেন। আবার কেউ কেউ পুঁজি হারিয়েছেন। বর্তমানে বাজার তেমন একটা ভালো অবস্থানে নেই। এটিকে স্থিতিশীল বাজার বলা যায় না। অবশ্য বাজার একটি ধীরগতির স্থিতিশীলতার মধ্যে রয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিল না। বিএসইসি, ডিএসই ও সিএসই সম্মিলিতভাবে বিনিয়োগকারীদের বিভিন্নভাবে বাজার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। আসলে পুঁজিবাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকলেও কাজ হচ্ছে না। আমরা একটি কারসাজির মধ্যে আটকে আছি। শুধু যে বড় বিনিয়োগকারীরা কারসাজি করে তা কিন্তু না। বাজারে যেসব কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, ওইসব কোম্পানির মালিকরাও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কারসাজির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। একটি কোম্পানির ফেস ভ্যালু ১০ টাকা এবং যার ইপিএস এক দশমিক ৩৮ পয়সা। কিন্তু সে লভ্যাংশ দিল না। এটা যদি প্রতিরোধ করা না যায়, সেক্ষেত্রে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।
এখানে আরেকটি সমস্যা হচ্ছে স্পট মার্কেট নিয়ে। যে কোম্পানিগুলো স্পট মার্কেটে যায়, সেখানে বেশি সুবিধা পায় ‘জেড’ গ্রুপের কোম্পানি। যেখানে আগে ‘জেড’ গ্রুপের কোম্পানির শেয়ার ম্যাচিউরড হতে সময় লাগত ৯ দিন। আর স্পট মার্কেটে ম্যাচিউরড হতে সময় লাগে একদিন এবং পরদিন বিক্রি করতে পারে। দীর্ঘ সময় স্পট মার্কেটে থাকায় ‘জেড’ গ্রুপ কারসাজির সুযোগ বেশি পাচ্ছে। এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারিতে রাখা দরকার।

শ্রুতিলিখন: শিপন আহমেদ