‘কোম্পানি সচিব পেশার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সেবা করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার প্যাসিফিক ডেনিমস লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মুহাম্মদ ছোরহাব আলী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মুহাম্মদ ছোরহাব আলী প্যাসিফিক ডেনিমস লিমিটেডের কোম্পানি সচিব। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

মুহাম্মদ ছোরহাব আলী: ক্যারিয়ার শুরু করি ২০০৪ সালে হোটেল আল ফয়সাল ইন্টারন্যাশনালের অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার হিসেবে। ওই প্রতিষ্ঠানে প্রায় দুবছর কাজ করার পর ২০০৬ সালে যোগ দিই সিমেক্স টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগে ম্যানেজার হিসেবে। সেখানে প্রায় পাঁচ বছর কাজ করার পর ২০১০ সালে ডিএনএস সফটওয়্যার লিমিটেডে অ্যাসিসট্যান্ট অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করি। এরপর ২০১১ সালে প্যাসিফিক ডেনিমস লিমিটেডে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড অডিট ম্যানেজারের দায়িত্ব পাই। ২০১৩ সালে একই প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত কাজ হিসেবে কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব পালন করি। ২০১৬ সাল থেকে প্যাসিফিক ডেনিমসের কোম্পানি সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে কোম্পানি সচিবকে কেন বেছে নিলেন?ছোরহাব আলী: কোম্পানি সচিব পেশায় ক্যারিয়ার গড়ব এমন পরিকল্পনা ছিল না। অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের সুবাদে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগে কাজ শুরু করি। ২০১১ সালে প্যাসিফিক ডেনিমসে যোগ দেওয়ার পর কোম্পানির ব্যাংকিং ট্রানজেকশন, ট্যাক্সেশন ও সেক্রেটারিয়াল কাজ দেখাশোনা করতাম। আমার ওপর অর্পিত এসব দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করি। এছাড়া প্যাসিফিক ডেনিমস পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সময় যাবতীয় কাজ করতে সক্ষম হই এবং ম্যানেজমেন্ট আমাকে কোম্পানি সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেয়। তাছাড়া কোম্পানি সচিব পেশার দায়িত্ব, মর্যাদা ও চ্যালেঞ্জ আমার ভালো লাগে, যে কারণে এ পেশায় চলে আসা।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একজন কোম্পানি সচিবের সম্পর্ক কেমন?ছোরহাব আলী: প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোম্পানি সচিবের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। সচিবের মাধ্যমেই বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করেন। একইভাবে ম্যানেজমেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদের মধ্যেও সেতুর মতো কাজ করেন তিনি।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে কোম্পানি সচিবের ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই

ছোরহাব আলী: আইন-কানুন মেনে প্রতিষ্ঠানকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য সচিবের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সচিব ছাড়া কোম্পানির লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্সের কাজ সুন্দরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। টপ ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সচিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কারণ সচিবের কাছে প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্সের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্সের তথ্যসহ অন্য সব ধরনের তথ্য থাকে। যেহেতু কোম্পানি সচিবের পদটি সাংবিধানিক, তাই যাবতীয় বিধি ও নীতিমালা পালনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি। একই সঙ্গে পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করেন। কোম্পানি ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিধিমালা পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বিধায় কোম্পানি সচিবের পদটি অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সচিব যদি সঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তবে প্রতিষ্ঠানে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সচিবের ভূমিকাই মুখ্য।

শেয়ার বিজ: কোম্পানি সচিবের জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

ছোরহাব আলী: কোম্পানি সচিব একটি চ্যালেঞ্জিং পদ। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধানের মধ্য দিয়ে চলতে হয়। একই সঙ্গে নানা ধরনের কমপ্লায়েন্সের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সিকিউরিটিজ আইন ও বিধিমালা এবং জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ ও ফার্মের যাবতীয় রিটার্ন-সংক্রান্ত কার্যক্রম মেনে সঠিক সময়ের মধ্যে কমপ্লায়েন্স কমপ্লাই করাটা চ্যালেঞ্জের।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে আপনার পরামর্শ

ছোরহাব আলী: সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। যে কোনো সময় যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, যে কোনো তথ্য জানতে চাইতে পারেন। প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তিনি কী ধরনের তথ্য চান সেটা বুঝে ইতিবাচক জবাব দিতে হবে। মধুর ও আন্তরিক ব্যবহারের পাশাপাশি ধৈর্য ও সহনশীলতাই পারে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করতে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমস্যা জানতে হবে, বুঝতে হবে। প্রয়োজনে সমাধানের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। অন্যকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শুনতে হবে। মনে রাখতে হবে, সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে পারলেই সফল হওয়া যায়। তাহলেই সবার আস্থা অর্জন ও সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে কোম্পানি সচিবকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?ছোরহাব আলী: প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে এ পেশায়। অন্য অনেক পেশারও টপ ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তবে কোম্পানি সচিব পেশায় যেভাবে ম্যানেজমেন্টকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা যায়, অন্য পেশায় ততটা নেই। খুবই সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল পেশা এটি এবং প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদও। তাছাড়া এ পেশার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে সেবা করার যথেষ্ট সুযোগ আছে।

 শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন

ছোরহাব আলী: কোম্পানি সচিব হিসেবে যদি কেউ কর্মজীবন গড়তে চান, তবে তাকে স্বাগত জানাই। পেশা হিসেবে কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব অনেক। সচিব পেশায় আসার আগে মনকে নরম করতে হবে। অর্থাৎ কেউ কোনো শক্ত কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা জবাব দেওয়ার মানসিকতা থাকলে এ পেশায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। কারণ অনেক সময় আপনার চিন্তার বাইরের মানুষ আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে, নানা কথা বলবে। সবকিছু ইতিবাচকভাবে না নিতে পারলে সচিব পেশার কাজ আপনার জন্য কঠিন হয়ে যাবে।

শেয়ার বিজ: সফল কোম্পানি সচিব হতে হলে আপনার পরামর্শ কী?ছোরহাব আলী: যোগাযোগে দক্ষ হতে হবে। কোম্পানি সচিবকে সৎ, সদালাপী ও কর্মঠ হতে হবে। তার চরিত্রে বিনয় ও শিষ্টাচার থাকতে হবে। বিষয়ভিত্তিক সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি। সব ঘটনাকে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সময়ের কাজ সময়ে শেষ করতে হবে। সফল হওয়ার ইচ্ছা থাকতে হবে। ইচ্ছা থাকলে উপায় বের হবেই। জানার আগ্রহ থাকতে হবে। রেগুলেটরি অথরিটিগুলোর যাবতীয় আইন ও বিধিবিধান জানতে হবে এবং তা যথাসময়ে পালন করতে হবে। দায়িত্বশীল হতে হবে।