ক্রিস্টাল গ্রুপ: রূপালী ব্যাংকেও খেলাপি ঋণ ১১৩ কোটি টাকা

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: নিলামে উঠছে চট্টগ্রামের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান ‘ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকার্স লিমিটেড’-এর বন্ধকি সম্পত্তি। গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের কাছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের মালিকানাধীন এ প্রতিষ্ঠানের সুদাসলে মোট দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। যা পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিটি। এ প্রেক্ষিতে ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা ১১৪ শতাংশ জমিসহ স্থাপনা নিলামে বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ব্যাংক। আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে উš§ুক্ত নিলাম অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।

একাধিক ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান ও অদক্ষতার কারণে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চট্টগ্রামের ক্রিস্টাল গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকার্স লিমিটেড, আইজি নেভিগেশন লিমিটেড, ক্রিস্টাল নেভিগেশন লিমিটেড, বে নেভিগেশন লিমিটেড, আইজি নেভিগেশন লিমিটেড, ক্রিস্টাল ল্যান্ডমার্ক লিমিটেড, ইব্রাহিম ফার্মস লিমিটেড, ম্যাক ট্রেড লিমিটেড, ক্রিস্টাল ফিশারিজ লিমিটেড, এমআরএফ ফিশারিজ, ফারুক অ্যান্ড সন্স লিমিটেড এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ক্রিস্টাল গ্রুপ। গ্রুপটি বাণিজ্যিকভাবে জাহাজ পরিচালনা ব্যবসা, মাছ ধরার ট্রলার, প্লাস্টিক পণ্যের রি-সাইকেলিং, ট্রেডিং ব্যবসা, জাহাজ ভাঙার শিপইয়ার্ড ব্যবসার প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে।

রূপালী ব্যাংক ছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক থেকেও গ্রুপটির একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাংকে খেলাপি ঋণের তালিকায় আছে আইজি নেভিগেশন লিমিটেডের নামে ১৪১ কোটি এক লাখ ৪৬ হাজার ১০৫ টাকা ১১ পয়সা ঋণ, ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকার্সের নামে ১৩৪ কোটি ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার ১৮৫ টাকা ১৭ পয়সা, বে নেভিগেশনের ১২০ কোটি টাকা, এমআরএফ ট্রেড হাউজের নামে ৬২ কোটি টাকা। এছাড়া গ্রুপ পরিচালক ফয়সাল মোরশেদ ইব্রাহিমের ফারুক অ্যান্ড সন্স লিমিটেডের কাছে প্রাইম ব্যাংকের ২২ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের পাঁচ কোটি টাকা। এসব ঋণ আদায় নিয়ে বিপাকে আছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, বেসিক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডসহ আরও বেশ কিছু বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় গ্রুপটি। আর এসব ঋণের পাওনা নিয়ে চিন্তিত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে দুদক ও বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক অনুসন্ধানে ক্রিস্টাল গ্রুপের একাধিক অপকর্মের অনুসন্ধানে নামে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অসংগতির প্রমাণ পায়। এসব ক্ষেত্রে শাখা ব্যবস্থাপক ও ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া পায়। এ জন্য মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের মাত্রাতিরিক্ত ঋণ দেওয়ার পেছনে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে দায়ী করা হয়। এতে একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনাকে জরিমানাসহ কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। পাশাপাশি বেসিক ব্যাংক লিমিটেড আগ্রাবাদ শাখা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গত ২৮ আগস্ট এবং প্রাইম ব্যাংক ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে।

রূপালী ব্যাংকের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ব্যবসার প্রয়োজনে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করলেও ধারাবাহিকভাবে পাওনা পরিশোধ করতে না পারায় ব্যবসায়ী মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার পরিবারের মালিকানাধীন ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপব্রেকার্স লিমিটেড খেলাপি গ্রাহকে পরিণত হয়। এ প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে সুদাসলে গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট পাওনা রয়েছে ১১৩ কোটি ৮৩ লাখ ২২ হাজার ৭৪৮ টাকা। আর আইন অনুসারে এ পাওনা আদায়ে বন্ধকিতে থাকা সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, পাঁচলাইশ, ডবলমুবিং এলাকায় এক হাজার ১১৪ শতাংশ জমিসহ স্থাপনা নিলামে বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করে ব্যাংক, যা আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে এ নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তীকালে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ পরিস্থিতি অনুসারে নেওয়া হবে।

প্রাইম ব্যাংক সিডিএ অ্যাভিনিউ শাখার ব্যবস্থাপক তৌহিদুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, গ্রুপ পরিচালক ফয়সাল মোরশেদ ইব্রাহিমের ফারুক অ্যান্ড সন্স লিমিটেডের কাছে প্রাইম ব্যাংকের ২২ কোটি ২২ লাখ টাকার অধিক ঋণ পাওনা আছে। এক বছর ধরে ঋণ পরিশোধে বারবার তাগাদা দিলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি। ফলে আমরা বন্ধকিতে থাকা এমবি ক্রিস্টাল-৯ নামে একটি ফিশিং ট্রলার নিলামে বিক্রি দরপত্র আহ্বান করেছিলাম। পরে মামলা করি।

প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আগ্রাবাদ শাখা ব্যবস্থাপক শফিউর করিম মজুমদার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোরশেদ মুরাদের ভাই ফয়সাল মোরশেদের কাছে আমরা পাঁচ কোটি টাকা পায়। এ ঋণ আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আর ফোনে তো পাওয়াই যায় না। ফলে এ পাওনা আদায়ে খুব চিন্তিত আছি। এক্ষেত্রে কয়েকবার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিস দেওয়া হলেও কোনো সাড়া মিলছে না। ফলে মামলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকেনি। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত চিন্তায় দিন কাটে।

খেলাপি ঋণের ব্যাপারে গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জাতীয় পার্টি নেতা মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে জানা যায়, তিনি নিয়মিত অফিসে বসেন না। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, বেসিক ব্যাংকের পৌনে ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য বেগম মাহজাবিন মোরশেদ ও তার স্বামী ব্যবসায়ী মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম এবং বেসিক ব্যাংকের সাবেক দুই ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) আরও তিনজনকে আসামি করে পৃথক দুটি মামলা করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাদী হয়ে মামলাটি করে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায়।

 

সূত্র জানিয়েছে, কিছু জটিলতার জন্য এ মার্কেট গঠনের কাজ থমকে রয়েছে। জটিলতা কেটে গেলেই স্বল্প পুঁজির মার্কেট গঠনের বিষয়টি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। এর পরপরই শুরু হবে মার্কেট গঠনের কাজ।