ক্রীড়া ক্ষেত্রে বৈষম্য ঘোচাতে হবে

রোববার এশিয়া কাপ ফাইনালে ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে তিন উইকেটে হারিয়ে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর কিনরারা একাডেমি ওভাল মাঠে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটাররা যে ইতিহাস রচনা করলেন, তার তুলনা হয় না। বিজয়টি আমাদের কাছে আরও মধুর ঠেকেছে বিশেষত সম্প্রতি আফগানিস্তানের কাছে পুরুষ ক্রিকেটারদের সিরিজ হারের ঘটনার কারণে। সেজন্য বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট টিম এবং তৎসংশ্লিষ্ট সবার জন্য রইল আন্তরিক অভিনন্দন। তাদের এ স্মরণীয় জয় হয়তো প্রশংসা ঘিরেই আবর্তিত হতোÑযদি না গতকালের শেয়ার বিজে ছাপা হতো ‘সালমা-রুমানাদের ম্যাচ ফি মাত্র ৬০০ টাকা’ শিরোনামের প্রতিবেদন। খবরটিতে নারী ও পুরুষ ক্রিকেটারদের জন্য প্রদত্ত আর্থিক সুবিধা-সংক্রান্ত যে বাস্তবতার প্রকাশ ঘটেছে, তা অত্যন্ত তিক্ত। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে ম্যাচ ফি ৫০ হাজার টাকা। ছেলেদের জাতীয় লীগে ম্যাচ ফি স্বভাবতই কম। তাও সেখানে প্রথম স্তরে ম্যাচ ফি ২৫ হাজার; দ্বিতীয় স্তরে ২০ হাজার টাকা। অথচ মাত্র ৬০০ টাকা মেয়েদের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ ফি! এখানে পুরুষ ক্রিকেটারদের মাসিক বেতনের কথা তুলে এ সম্পাদকীয় আমরা না হয় বেশি ভারাক্রান্ত না-ই করলাম। তবু এ প্রশ্ন সচেতন পাঠকের মনে জাগ্রত না হয়ে পারে নাÑ‘এ প্লাস’ ক্রিকেটাররা যেখানে মাসে চার লাখ টাকা বেতন পান; ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ ক্যাটাগরির ক্রিকেটাররা যেখানে পান যথাক্রমে তিন, দুই, দেড় ও এক লাখ টাকা, সেখানে নারী ক্রিকেটারদের বেতন কত? বেদনার সঙ্গে জানাতে হয়, কেন্দ্রীয় চুক্তির বাইরে নারী ক্রিকেটারদের অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা নেই; আর তিনটি গ্রেডে তাদের দেওয়া হয় যথাক্রমে ৩০, ২০ ও ১০ হাজার টাকা বেতন। এশিয়া কাপ জয়ের পর সালমা-রুমানাদের পাশে এ অঙ্কগুলো খুব বেমানান বৈকি।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি আলোচ্য বৈষম্য বিষয়ে এ দৈনিকের কাছে যে মন্তব্য দিয়েছেন, তা হতাশাজনক। তার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত যুক্তির খুঁঁত আমরা ধরছি না; কিন্তু তার সারাংশটি দুর্ভাগ্যজনক। অবশ্যই আমাদের মাথায় রয়েছেÑপুরুষ ক্রিকেটারদের সঙ্গে নারী ক্রিকেটারদের আর্থিক সুবিধা তুল্য নয়; জনপ্রিয়তা আর ব্যবসার খাতিরেও। পুরুষদের ক্রিকেট নিয়ে এখানে যে অঙ্কের ব্যবসা হয়, তার ধারেকাছেও নেই নারী ক্রিকেট। এখন কেউ যদি বলেন, তাহলে নারী ক্রিকেটকে প্রমোট করা হোকÑসেক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, এ ক্রিকেটের তুলনায় পুরুষ ক্রিকেটের বেশি জনপ্রিয়তা একটি বৈশ্বিক চিত্র। ফলে পুরুষ ক্রিকেট ব্যবসা নিয়ে আমাদের তো আপত্তি নেইই; সেটি আরও বাড়ুক এবং ক্রিকেটাররা তার সুফল ভোগ করুন, এমনটাই কাম্য। আমরা মূলত যে বিষয়টি দেখাতে চাই, সেটি হচ্ছেÑসব কিছুর পরও নারী ও পুরুষ ক্রিকেটারদের এত বৈষম্য কেন? এর সম্প্রসারিত ভাব এদিকেও ইঙ্গিত করে যে, অন্যান্য খেলার সঙ্গেই বা ক্রিকেটের এত বৈষম্য কেন? বস্তুত নারী ও পুরুষ ক্রিকেটের মধ্যকার বৈষম্যটি অন্যান্য খেলার সঙ্গে খোদ ক্রিকেটের বৈষম্যকেই তুলে ধরে। কেউ কেউ মনে করেন, সেক্ষেত্রে আরও করুণ চিত্র বিদ্যমান। অথচ ক্রীড়ায় বিনিয়োগ না হলে প্রত্যাশিত সাফল্য আশা করা কঠিন। হতে পারে, ক্রিকেট বা পুরুষদের ক্রিকেট এক্ষেত্রে বেশি সফল। তাই বলে অন্যান্য ক্রীড়াকে একেবারে উপেক্ষা করা যায় না। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নেওয়া যায়Ñসে চিন্তা বহুদিন পর্যন্ত এ দেশের মানুষ স্বপ্নেও ভাবেননি। ক্রিকেট সেই সুযোগ আমাদের এনে দিয়েছে। সেজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। একই সঙ্গে নারীসহ অন্য ক্রীড়াবিদরা যেন নিজ নিজ পছন্দের ক্ষেত্র থেকে তার যোগ্যতা ও প্রচেষ্টা অনুযায়ী আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা লাভ করতে পারেন, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়াও আমাদের কর্তব্য নয় কি?