ক্ষতি পোষাতে খড় বিক্রি!

এবার বোরোর ভালো ফলন হলেও কৃষক স্বস্তিতে নেই বলে খবর মিলছে। ফসল তোলার মাসদুয়েক পরও ধানের দাম আশানুরূপ বাড়েনি। অন্যদিকে শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও হয়েছে তুলনামূলক বেশি। এখন লোকসান এড়াতে খড় বিক্রি করে খরচ ওঠানোর চেষ্টা করছেন ময়মনসিংহের চাষি। ধানের কম দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার চাষিও।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বেশিরভাগ বোরো উৎপাদনকারী অঞ্চলে এবার ভালো ফলন হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধার কারণে সেচেও তেমন সমস্যা হয়নি। কোনো কোনো অঞ্চলে অবশ্য ক্ষেতে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। শিলাবৃষ্টিতেও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বোরো। তা সত্ত্বেও প্রায় সব অঞ্চলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। পাশাপাশি এ বছর ব্যাপক পরিমাণ জমিতে বোরো রোপণের আরেকটি কারণ ছিল গত আমন মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় তেমন লাভজনক হয়নি এবারের বোরো চাষ। এ অবস্থায় গরু-মহিষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহƒত খড় বিক্রি করে খরচ ওঠানোটা কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না। দেশের একাংশে হলেও বোরোর অস্বাভাবিক দরপতনের প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখাটাও এখন জরুরি।
কৃষকরা দৃশ্যতই নিজেদের মতো করে লোকসান থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে নিচ্ছেন। কিন্তু এসব উপায় তাদের নিরাপত্তা জোগানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে এসে কৃষিজাত পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। চালের কুঁড়া থেকে ভোজ্যতেল তৈরির মতো ধান থেকে বিভিন্ন উপজাত সংগ্রহের সম্ভাব্যতা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। এতে মোটা দাগে ধান বা চালের ওপর চাষির নির্ভরতা কমানো যাবে। অর্থাৎ ধান-চালের দাম কিছুটা কমলেও তা সহজে কাটিয়ে উঠতে পারবেন তারা। তাদের বহুমুখী আয়ের সংস্থান হবে। ধানের বহুমুখী উপযোগিতা থেকে লাভবান হবে ভোক্তাও।
ভালো ফলন সত্ত্বেও লোকসান গুনতে হলে স্বাভাবিকভাবেই বোরোর ফলন বৃদ্ধিতে উৎসাহ হারাবেন চাষিরা। তাছাড়া উৎপাদন খরচ বাড়লে তা শেষমেশ ভোক্তার জন্যও বোঝা হয়ে ওঠে। ধান চাষে লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়া। শ্রমিক সংকট দূর করতে কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার ও সার্বিক আধুনিকায়ন বাড়াতে হবে।
আরেকটি ব্যাপার হলো, প্রতিবারের মতো এবারও সরকার বোরো ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছিল। দাম এবার কিছুটা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। এতে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েরই স্বার্থরক্ষার ব্যাপারটি মাথায় রাখা হয়েছে বলে মনে হয়। নির্ধারিত এই দামে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার কথা থাকলেও সরকার এবার কৃষি বিভাগের সরবরাহ করা কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ফসল সংগ্রহ করবে বলে জানা গেছে। এ প্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের সংশ্লিষ্টতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বোরোর বাজারদর কম থাকার পেছনে এটি কোনো প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে কি না, তাও স্পষ্ট হওয়া দরকার। দেশের প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলের কৃষকরা বিভিন্ন কারণে সরাসরি সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেন না, এটা সর্বজনবিদিত। এর অবসান হওয়া দরকার। আশা করা যায়, সরকারি খাদ্যগুদামে কৃষকের সরাসরি ধান বিক্রির সুযোগ অবারিত থাকলে তাদের প্রাপ্য মূল্য নিশ্চিত করা যাবে।