খাদ্য অপচয় কমিয়ে বড় একটা অংশের ক্ষুধা দূর করা সম্ভব

জগন্নাথ বিশ্বাস: কী পরিমাণ খাদ্য আমরা নষ্ট করি প্রতিদিন, মাসে কিংবা বছরে আপনি ভাবতেও পারবেন না। সম্ভবত আপনার কল্পনার চেয়ে পরিমাণটা বেশিই হবে। প্রতিবছর, সারা পৃথিবীতে এক দশমিক তিনবিলিয়ন টন খাদ্য ফেলে দেওয়া হয়, যা উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ।

অন্তত দুটি কারণে এ তথ্য আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এই বিপুল খাদ্য অপচয় কমিয়ে আমরা নিদারুণ ক্ষুধার হাত থেকে জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশকে সুরক্ষিত করতে পারি। দ্বিতীয়ত, গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমাতে পারি।

প্রশ্ন হলো কীভাবে কমানো সম্ভব এই বিপুল খাদ্য অপচয়।

আমাদের দেশে প্রচুর খাদ্য নষ্ট হয় সংরক্ষণের অভাবে। কিছু বাজারজাতকরণের পথেও নষ্ট হয়। মার্কিন এক প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে, উপমহাদেশে উৎপাদিত ফুলকপির অর্ধেক নষ্ট হয় স্রেফ হিমায়িত সংরক্ষণাগার না থাকায়। উন্নত দেশে সমস্যাটা আবার অন্য রকম। কানাডা ও আমেরিকায় ৪০ ভাগ খাদ্য নষ্ট হয় শুধু ভোক্তার স্বেচ্ছাচারে। এই স্বেচ্ছাচার ব্যাপারটা কেমন তার কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরুন আপনি ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে এগরোল কিনেছেন। তারপর এক কামড় মুখে নিয়ে ‘উফ কী ওয়েলি’ বলে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিলেন। বাসায় কোনো রান্না আপনার মুখে রুচলো না, রেস্টুরেন্টে ছুটলেন। খাবারগুলো নষ্ট হলো। শুধু তাই নয়, যে হোটেল বা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ বা ডিনার খেতে গিয়েছিলেন, সেখানেও পরিমাণ না বুঝে ভুক্তাবশেষ ফেলে এলেনÑপরে যা ডাস্টবিনে গেল।

শুধু কানাডা-আমেরিকায় নয়, এভাবে আমরাও রোজ কত খাদ্য নষ্ট করি। প্রসঙ্গক্রমে গরিবের ক্লেশ মোচনে নিবেদিতপ্রাণ এক অর্থনীতিবিদের অভিজ্ঞতার কথা বলা যাক। জঁ দ্রেজ। তিনি অমর্ত্য সেনের সঙ্গে ‘অহ টহপবৎঃধরহ ষেড়ৎু : ওহফরধ ধহফ রঃং ঈড়হঃৎধফরপঃরড়হং’ বইটি লিখেছেন, যাকে ‘স্মৃতিকণ্ডূয়নের’ লেখক প্রণব বর্ধন ‘ল্যাপটপবাহী যিশুখ্রিষ্ট’ বলেন। সেই দ্রেজ একদিন প্রফেসর বর্ধনকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের কলকাতার দারিদ্র দেখতে আমি অভ্যস্ত, কিন্তু যে-দৃশ্য দেখলে আমার অসহ্য লাগে, সমস্ত শরীর গুলিয়ে ওঠে, সেটা হচ্ছেÑপাড়ায় কোনো বিয়েবাড়িতে হইচই করে ভূরিভোজ হচ্ছে, কিছুক্ষণ পরপর চাকরবাকররা এঁটো ফেলে-দেওয়া খাবার ঝুঁড়ি করে এনে ডাস্টবিনে ফেলছে, আর ওই জায়গায় জড়ো হওয়া ভিখিরিরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে।’ ঢাকাতেও এমন নিদারুণ দৃশ্য খুব দুর্লভ নয়।

এমন দৃশ্যের পাশে পৃথিবীব্যাপী দরিদ্র মানুষের ক্ষুধা ও অপুষ্টির কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরা যাক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পরিচালিত জরিপমতে, ৮৪২ মিলিয়ন  লোক ক্ষুধা ও অপুষ্টির শিকার। কোনো পরিসংখ্যানে অবশ্য কমিয়ে ৭৯৫ মিলিয়ন বলা হয়। মোটামুটি পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রতি ৯ জনের একজন ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভোগে। শুধু না খেতে পেয়ে পৃথিবীতে প্রতিবছর ৯ মিলিয়ন লোক মারা যায়। ‘খাদ্যের লড়াই: অন্নসংস্থানের সংঘাত’ প্রবন্ধে অমর্ত্য সেন লিখেছিলেন, ‘মানুষের সমাজজীবনের প্রাচীনতম বৈশিষ্ট্য, প্রাচীনতম ক্ষতের একটি হলো খাদ্যের জন্য নিরন্তর এক লড়াই, এক যুদ্ধ। তবু বেশিরভাগ সময়েই এই যুদ্ধ আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়। অবশ্যই কখনও কখনও আমাদের চোখে পড়ে ফসল নিয়ে মারামারি, লুঠ; রাস্তায় দেখি সারিবদ্ধ ভুখা মিছিল। কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় এই যুদ্ধ আমাদের চোখের আড়ালেই থাকে। আমরা কতখানি খাবার সংগ্রহ করতে পারি, সেটা যেসব সামাজিক বিধি আর আর্থিক নিয়ম দিয়ে পরিচালিত হয়, তাদের ভিত এতই দৃঢ় যে যুদ্ধের জায়গায় আমরা দেখি এক সামাজিক স্বীকৃতি, এক শৃঙ্খলা। এ এক অদ্ভুত মায়া যা বাস্তবেরই একটা অংশ, যা রূঢ় এবং সময়বিশেষে হিংস্র সত্যকে আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।’ এই অমানবিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য নীতি প্রণয়ন, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন জরুরি পদক্ষেপ হতে পারে। ক্ষুধা ও অপুষ্টির বিরাট সমস্যা মোকাবিলায় ভুক্তভোগী দেশের সরকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো এসব নিয়ে ভালো কাজও করছে। আমরা সেগুলো নিয়ে না ভেবেও ক্ষুদ্র পরিসরে যা করতে পারি তা নিয়ে এ লেখায় আলোকপাত করা যাক।

এশিয়ায় প্রতিদিন ৫৫৩ মিলিয়ন লোক ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাতে ঘুমাতে যায়। এর বড় অংশ দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দা। বাংলাদেশে এই সংখ্যাটা কত জানা নেই। তবে অর্ধাহারে ঘুমাতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা যে আমদের দেশেও কম নয়, তা আন্দাজ করতে পরিসংখ্যান লাগে না। ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূরীকরণের মহান দায়িত্বের ভান না করেও আমরা ছোট ছোট ব্যক্তি উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি, যা একসময় সামাজিক উদ্যোগও হয়ে উঠতে পারে।

কেমন হতে পারে সেই উদ্যোগ? বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই আছে। হয়তো কেউ কেউ অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত থেকেছি। ধরে নেওয়া যেতে পারে খাদ্য নষ্ট হতেও দেখেছি। প্রশ্ন হলো কেন খাদ্য নষ্ট হচ্ছে? আমন্ত্রিতরা সবাই আসছেন না তাই? উন্নত দেশগুলোয় একটা সৌজন্য প্রথা চালু হয়েছে। কেউ যদি নিমন্ত্রণে আসতে না পারেন, তিনি সেটা যথাসময়ে জানিয়ে দেন। তাতে অপচয়টা কমে। আমরা এখনও তেমন সৌজন্যে অভ্যস্ত নই। কাজেই সমাজিক অনুষ্ঠানে খাদ্য অপচয়ের ঝুঁকি থেকেই যায়। এর একটা সহজ সমাধান হতে পারে বেঁচে যাওয়া খাদ্য বিলিয়ে দেওয়া। নাগরিক অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে আয়োজিত সামাজিক অনুষ্ঠানে বেঁচে যাওয়া খাদ্য চাইলেই আশপাশের ক্ষুধাতুর মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া সম্ভব। এর জন্য দেওয়ার সদিচ্ছাটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু আমরা মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা প্লেটে নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতায় যে খাবার নষ্ট করি তার কী হবে? উচ্ছিষ্ট খাবার তো আর দান করা যায় না। এ ক্ষেত্রে নিজের স্বভাবটা বদলে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এত ম্লান ক্ষুধা-তৃষাতুর দিশাহারা মুখের দিকে তাকিয়েও কি নিজেকে বোঝানো যায় নাÑক্ষুধার রাজ্যে খাবারের একটা কণাও নষ্ট করা নৈতিক অপরাধ।

ঘরে হোক কিংবা বাইরে, পারিবারিক কিংবা সামাজিকÑযে কোনো ভোজসভায় খাবার নেওয়ার আগে ভাবুন ক্ষুধা মেটানোর জন্য যথেষ্ট খাবার এখানে আছে, কিন্তু নষ্ট করার মতো একটা কণাও নেই। আমাদের মানসিকতার ছোট এই বদলটুকু হয়তো অনেক মানুষের ক্ষুধা মেটাতে পারবে না, তবে খাদ্যের অপচয় কমাতে পারবে।

কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানের উদ্বৃত্ত খাদ্যের সদ্গতির জন্য ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ টাইপের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তেমন সহƒদয় ব্যক্তি কোথায়, যিনি বা যারা বেঁচে যাওয়া খাবার দ্বারে দ্বারে ঘুরে সংগ্রহ করে ক্ষুধার্তদের মাঝে বিলিয়ে দেবেন। গদ্যময় পৃথিবীতে এমন কাব্যিক পুণ্যকর্ম করতে কে এগিয়ে আসবে? কোনো কোনো দেশে নাকি কেউ কেউ শুরু করেছেন এমন পুণ্যকর্ম। মানবিক দায়বদ্ধতার তাগিদ হয়তো প্ররোচিত করেছে তাদের। তবে দায়বদ্ধতার লড়াইটা যে খুব তাড়াতাড়ি জিতে নেওয়া যাবেÑএমনটা আশা করা নির্বুদ্ধিতা।

তবু বুভুক্ষাতাড়িত বিশ্বে ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য মহোত্তম মানবিক উদ্যোগের প্রয়োজন কখনও ফুরিয়ে যায় না। অমর্ত্য সেনের মতো মহান অর্থশাস্ত্রীর কথায় আস্থা রাখা যেতে পারেÑ‘আমরা যে জগতে বাস করি সেখানে ব্যাপকভাবে ক্ষুধা ও অপুষ্টি বিদ্যমান এবং প্রায়ই দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। প্রচ্ছন্নভাবে হলেও প্রায়ই অনুমান করা হয় যে, পৃথিবীতে লোকসংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে এই অবস্থার আরও অবনতি ঘটবে। এই দুর্দশার প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একটা নৈরাজ্যকর মনোভাব দেখা যায়। দুর্দশামোচনের কোনো আন্তরিক চেষ্টা দেখা যায় না। এই নৈরাশ্যজনক মনোভাবের মূলে কোনো প্রকৃত সত্য নেই এবং ক্ষুধা ও বঞ্চনা যে চিরন্তন হবে তা ভাবারও কোনো সঙ্গত কারণ নেই। আধুনিক জগতে যথাযোগ্য কৌশল ও কার্যাবলির দ্বারা ক্ষুধার এই ভয়ঙ্কর সমস্যা নির্মূল করা খুবই সম্ভব।’

 

গণমাধ্যমকর্মী

নরংধিংলধমধহহধঃয৪৭Ñমসধরষ.পড়স