খেজুর গাছে সমৃদ্ধি

প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ আন্দোলন ও বৃক্ষমেলা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য বৃক্ষনিধন বন্ধ করা, গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করা। এজন্য অনেক ধরনের ঔষধি ও ফলবান গাছ রোপণ করা হয়। এর পাশাপাশি খেজুর গাছ লাগানো যেতে পারে। কষ্টসহিষ্ণু এ গাছ গরু-ছাগলেও খায় না।

পার্ক, স্টেডিয়াম, রাস্তার দুপাশ, বাঁধ, রেললাইনের ধার কিংবা পুকুরপাড়ে এ গাছ রোপণ করা যায়। পুরুষ খেজুর গাছে রস কম হয় বলে গাছ কেটে ইটভাটায় বিক্রি করা হয়। এছাড়া মৌসুমের সময় ইজারাদারের ছাঁটাই কাজে অদক্ষতার কারণে এবং বেশি রসের আশায় কাণ্ডের শেষপ্রান্ত চেঁছে গর্ত করে ফেলায় অকালে অচল হয়ে পড়ে অনেক গাছ। এমন পরিস্থিতি উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলার।

উত্তরাঞ্চলে মরুময়তা রোধে ১৯৮১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে ১৬ হাজার ৩০৭ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান এবং ১৫ হাজার ৬৯৫ হেক্টর উডলট ও কৃষি বনায়ন করা হয়। এতে সাত কোটি তিন লাখ চারা রোপণ করা হয়। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জনসাধারণও এতে অংশ নেয়। এটা ছিল একটি স্মরণীয় ঘটনা, কিন্তু তখন উপেক্ষিত থাকে খেজুর গাছ।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সুপরিকল্পনা নিলে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় অনেক খেজুর চারা রোপণ করা সম্ভব। একটি খেজুর গাছ থেকে বছরে যে দুই থেকে তিন কুইন্টাল রস পাওয়া যায়, তা থেকে অনায়াসে ১৫ থেকে ২০ কেজি গুড় উৎপাদন সম্ভব। এর মধ্য দিয়ে গুড়ের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে। সেইসঙ্গে খেজুরের রস দিয়ে চিনি উৎপাদন করা সহজতর হয় কি না তারও গবেষণা দরকার। খেজুর গাছ চাষে জমিতে আলাদাভাবে সারি, সেচ বা পরিচর্যার দরকার পড়ে না। কৃষকের সীমিত জ্ঞান থাকায় খেজুর গাছ বাড়ানোর সৎ উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও অনেকে রস উৎপাদনের ব্যাপারে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। কেউ কেউ আবার ইটভাটা মালিকের সঙ্গে চুক্তি করে খেজুর গাছ নিধনযজ্ঞে মেতে উঠেছেন। তাই স্বল্প মেয়াদে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রস উৎপাদন কৌশল, সংরক্ষণ ও পাটালি গুড় তৈরির বিজ্ঞানভিত্তিক নিয়মকানুন কৃষককে অবগত করা দরকার।

গত শতকের এক সরকারি পরিসংখ্যানে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রাজশাহীর অনেক জমিতে খেজুর গাছ লাগানো হয়েছে। পরেই রয়েছে বৃহত্তর বগুড়ার স্থান। তৃতীয় স্থানে রয়েছে পাবনা।

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে জানা গেছে, এখানে প্রায় ৫৩ হাজার খেজুর গাছ আছে। এর মধ্যে ঈশ্বরদীতে ১৬ হাজার, সাঁথিয়ায় সাত হাজার, পাবনা সদর ও বেড়া উপজেলায় সাড়ে ছয় হাজার, চাটমোহর ও ফরিদপুরে দুই হাজার, আটঘরিয়া, সুজানগর ও ভাঙ্গুড়ায় প্রায় চার হাজার গাছ আছে। বৃহত্তর রংপুরের ৫৭ হেক্টর ও দিনাজপুরে ৫৩ হেক্টর জমিতে রয়েছে খেজুর গাছ।

গ্রাম বনায়নের সঙ্গে কৃষকদের মধ্যে খেজুর চারা বিতরণ কর্মসূচি আজও চালু হয়নি। জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ বৃক্ষরোপণ উৎসবে সাধারণত ঔষধি, ফলদ ও জ্বালানি কাঠ এই তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করে জনসাধারণকে উৎসাহিত করে থাকে। এর পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অনেক বাঁধের পাশে খেজুর গাছ রোপণ করা যেতে পারে। এজন্য দরকার যথাযথ পরিকল্পনা ও উদ্যোগ। জমির আইলে, বাঁধে ও বসতবাড়ির আনাচে-কানাচে অনায়সে খেজুর গাছ রোপণ করা সম্ভব।

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক বিভূতি ভূষণ সরকার জানান, খেজুর ও তাল গাছ আমাদের কৃষিতে একটি সম্ভাবনার নাম। খরচ নেই বললেই চলে, অথচ একটু যত্ন ও পরিকল্পনায় আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন কৃষক। বজ্রপাত থেকে বাঁচতে খেজুর ও তালগাছ বিশেষ ভূমিকা রাখে।

 

শাহীন রহমান, পাবনা