দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

‘খেলাপিদের বিশেষ সুবিধার সুফল নিয়ে সংশয় আছে’

নিজস্ব প্রতিবেদক: বড় খেলাপি গ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান।
গতকাল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে (বিআইবিএম) অনুষ্ঠিত গবেষণা অ্যালামনাকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মনিরুজ্জামান বলেন, ‘দুই শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে নির্দিষ্ট সুদে দীর্ঘ মেয়াদে খেলাপি ঋণ পরিশোধের একটি উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। আমরা এর আগে ৫০০ ও এক হাজার কোটি টাকার ওপরের খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই উদ্যোগে কতগুলো প্রতিষ্ঠান সফল হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এখন নতুন করে এই সুবিধা দিয়ে আমরা যদি সম্ভাবনাময় কিছু প্রতিষ্ঠানকে তুলে আনতে পারি আমাদের সবারই ভালো হবে, ব্যাংকের ভালো হবে। কিন্তু যদি আবারও পিছিয়ে আসি তাহলে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।’
তৃতীয়বারের মতো এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করল বিআইবিএম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসএম মনিরুজ্জামান আরও বলেন, ‘আমরা অনেক ধরনের গবেষণা করি। এখান থেকে আমরা যেসব ফলাফল পাই, তা নিয়ে যখন কাজ করতে যাই তখন দেখা যায় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার মধ্যে অনেক তফাত। অনেক কিছুই বলা যায়, ভাবা যায়। কিন্তু অনেক কিছু করা যায় না; যা অনেক সময় শেয়ারও করা যায় না।’
ব্যাংক ব্যবসায় লোকসান নেই বলে এখন অনেকেই এ ব্যবসায় ঝুঁকছেন বলেও মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। দেশের ব্যাংক খাতের ঋণ ব্যবস্থাপনার ত্রুটি নিয়েও কথা বলেন তিনি। মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা যেসব অর্থায়ন করে থাকি তার জামানত ঋণের সঙ্গে কতটুকু সম্পৃক্ত? বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতে বন্ধকি জামানত নিলাম করলে কেউ কিনতেও আসবে না।’ গ্রাহকদের মধ্যে আর্থিক স্বাক্ষরতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমানত রাখার ক্ষেত্রে নিরাপদ প্রতিষ্ঠান খুঁজে নিতে হবে গ্রাহককেই। প্রতিটি কোম্পানির সব তথ্যই উš§ুক্ত।’
রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটোরিয়ামে ‘বিআইবিএম রিসার্চ অ্যালামনাক-২০১৯’ অনুষ্ঠানে ব্যাংক ও আর্থিক বিষয়ে ১৯টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। ২০১৮ সালে এসব গবেষণাপত্র আলাদাভাবে সেমিনার, রিসার্চ ওয়ার্কশপ এবং রাউন্ডটেবিল ডিসকাশনে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী, গবেষকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের জন্য সংক্ষিপ্তভাবে এক অনুষ্ঠানে এসব গবেষণাপত্রের প্রাপ্ত ফলাফল ও সুপারিশগুলো উপস্থাপন করা হয়। তিনটি কারিগরি সেশনের মাধ্যমে গবেষণাপত্রগুলো উপস্থাপনসহ প্রত্যেকটির ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানটিতে সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের ড. মোজাফফর আহমদ চেয়ার প্রফেসর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিআইবিএমের অধ্যাপক এবং পরিচালক (গবেষণা, উন্নয়ন ও পরামর্শ) ড. প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং এবং আর্থিক খাতের বিভিন্ন বিষয়ে মানসম্পন্ন গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ সময় তিনি কোন কোন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে তাও গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করার পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেন, বিদেশি ঋণ পরিশোধে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য বিদেশি ঋণ গ্রহণে আরও সতর্ক হতে হবে। নইলে রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সেশন-১-এর গবেষণাপত্রের মধ্যে রয়েছে আইটি সিকিউরিটি অব ব্যাংকস ইন বাংলাদেশ: থ্রেটস অ্যান্ড প্রিপেয়ার্ডনেস; প্রডাক্ট ডাইভার্সিফিকেশন অব ইসলামিক ব্যাংকস: প্রসপেক্টস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জস প্রভৃতি।
কারিগরি সেশন-২-এর সভাপতিত্ব করেন সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস. এ. চৌধূরী। তিনি ব্যাংকারদের ঋণ প্রদানে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকারদের প্রশিক্ষণে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। এটিকে ব্যয় বিবেচনা না করে বিনিয়োগ ভাবতে হবে বলে মত দেন তিনি।
এ সেশনের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র হচ্ছে ইন্টারনাল অডিট অ্যান্ড পারফরম্যান্স অব ব্যাংকস ইন বাংলাদেশ; মানি লন্ডারিং ভালনারেবিলিটিস ইন পেমেন্ট সিস্টেমস: বাংলাদেশ কনটেক্সট প্রভৃতি।
সেশন-৩-এ সেশনের সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ। এ সেশনের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র হচ্ছে ডেভেলপমেন্ট অব বন্ড মার্কেট ইন বাংলাদেশ; কস্ট ফর কমপ্লায়েন্স উইথ রেগুলেশনস ইন ব্যাংকস প্রভৃতি।
উপস্থাপিত ‘প্রাইভেট কমার্শিয়াল বোরোইং ফর্ম ফরেন সোর্সেস ইন বাংলাদেশ: অ্যান এনাটমি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক, সোয়েটার, ডায়িং, নিটিং এবং টেক্সটাইল খাতে বিদেশি বাণিজ্যিক ঋণের অর্ধেকের বেশি। প্রায় ১৬ শতাংশ ঋণ নিয়েছে প্লাস্টিক, সার্ভিস এবং ফার্মাসিউটিক্যাল। তৈরি পোশাক খাত রফতানির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় বিদেশি ঋণ পরিশোধে ঝুঁকি কম। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের আয় বৈদেশিক মুদ্রায় হয় না। এ কারণে ঋণ পরিশোধের সময় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এছাড়া বিদেশি বাণিজ্যিক ঋণে কিছু ঝুঁকি থাকায় আরও অধিকতর বিবেচনার তাগিদ দিয়েছেন গবেষকরা।

সর্বশেষ..