ধারাবাহিক

গঠিত হলো বিডিসি

ঢাকার পতিত নগর পরিসরে সহসা রাজধানী জেগে ওঠায় আবাসন ও নির্মাণ খাত হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। সেই বাতাবরণে জহুরুল ইসলামের সৃজনী পদক্ষেপ ছিল তুরুপের তাস। ক্ষুদ্র ঠিকাদারি দিয়ে শুরু। দেশের সীমানা মাড়িয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে তিনি গড়েছেন আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সড়ক-মহাসড়ক, কল-কারখানা; এমনকি দেশের আঙিনায় বুলন্দ করেছেন বিদেশি বড়-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক ও শৌখিন গাড়ির সমৃদ্ধি। রাজধানী ঢাকার নির্মাণ, আবাসন ও বিস্তৃতির বিবর্তনিক ইতিহাসের ধারাক্রমে জহুরুল ইসলাম তাই এক অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিকতা। পর্ব-৩১

মিজানুর রহমান শেলী: জহুরুল ইসলামের সিঅ্যান্ডবির নির্মাণ খাতে চাকরি আর বাবার সাহচর্যে ঠিকাদারি ব্যবসার অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে সাহস করেন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার। শুরুর সময়ের ছোটখাটো ঠিকাদারি তার প্রতিজ্ঞাকে বাগে দলিত করতে পারেনি। আর পেছনে তাকানো নয়। দিনে দিনে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তাড়া। পুঁজিও যেমন বাড়ছিল, তেমনি ব্যবসার সুনাম ও পরিধি। এই সময়টাতে রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে সাজানো-গোছানো আর নবরূপে গৌরবান্বিত করতে সরকার যেমন ছিল ব্যস্ত, তেমনি মুসলিম মানসে ছিল স্বপ্নের অগাধ উত্তেজনা।
কার্যত, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ ছিল বর্তমান বাংলাদেশের জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার একটি ধাপ। এর সঙ্গে এদেশের স্থাপত্যে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। দীর্ঘ ইংরেজ শাসনের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতায় এদেশে মুনি-ঋষি ও স্থপতির অনুপস্থিতি সৃষ্টি হয়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের স্থাপত্যে তৈরি হয় এক শূন্যতা। এ সংকট নিরসনে পাকিস্তান সরকার ও দেশীয় স্থপতিরা ১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। তারা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে অগ্রগামী হন। ১৯৪৭-৭১ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল রাজনৈতিকভাবে খুব সংকটাপন্ন। তবে এ সময়ে পাকিস্তান তার পূর্ব ও পশ্চিম দুই ভূখণ্ডেই দুই শতকের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নাগপাশ থেকে জেগে ওঠে। এর ভৌতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে বহুদূর এগিয়ে যায়।
পাকিস্তান রাষ্ট্র তখন স্থাপত্য রীতিকে কোনো সীমার ডোরে বাধতে চায়নি। বরং দেশকে ভোক্তা বিবেচনা করে যে কোনো সুবিধা তারা যে কোনো সীমানা বা প্রান্ত থেকে নিজের দেশে এনে হাজির করেছেন। অবশ্য এ সময়টাই ছিল বিশ্বব্যাপী শিল্পকলার দেশানুরাগ ছিন্ন হওয়ার সময়। তাই পাকিস্তান নিজেদের এবং ইউরোপ-আমেরিকার স্থপতি ও অ-স্থপতি সবাইকেই নিজেদের উন্নয়নকল্পে হাজির করেছেন নিজ দেশে। আর এই উদ্দেশ্যে আমদানি, নির্মাণ ও ভৌতিক উন্নয়নের প্রধান হোতা হিসেবে পাকিস্তানে সৃষ্টি হয়েছিল গণপূর্ত বিভাগ।
ফলে পাকিস্তান উপস্থাপন করতে পেরেছিল বিভিন্ন নাম-পরিচয়হীন নতুনধারার স্থাপত্য নিদর্শন। তবে তখন সারা দুনিয়াজুড়েই চলছিল শিল্পকলার ছদ্মবেশী আচরণ। তাতে কোনো জাতীয় পরিচয় থাকত না। বিশের দশকে ইউরোপে এ ধারার সূচনা হয়েছিল। তবে তা অজানা রয়ে গিয়েছিল ১৯৪৭-এর আগ পর্যন্ত। এমনকি মধ্য-পঞ্চাশের পরে পাকিস্তান তথা আজকের বাংলায় তার চর্চা শুরু হলো।
এরই ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশ স্থপতি, এডওয়ার্ড হিকস ও রোনাল্ড ম্যাককোনেল ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের চাকরিতে যোগ দেন। এদের মধ্যে সিনিয়র সহকারী স্থপতি হিসেবে কর্মরত রোনাল্ড উপদেষ্টা স্থপতি হিসেবে নিযুক্তি হন। হিকস ‘ঢাকা পুনঃপরিকল্পনা’ করেন। তিনি তাতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার ভবিষ্যৎ ভূমির ব্যবহার নির্দিষ্ট করে দেন। তার পরিকল্পনার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, নওয়াবপুর বিপণিবিতান এবং আজিমপুর ও ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা। হিকস হোটেল শাহবাগ, নিউমার্কেট, আজিমপুর আবাসিক এলাকাসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পের নকশা প্রণয়নের কাজ হাতে নেন। হিকস অবশ্য স্থায়ী হননি। তারপরে ম্যাককোনেল পদোন্নতি পান। পরবর্তী সময়ে তিনি উপদেষ্টা স্থপতি ও নগর পরিকল্পক হিসেবে কাজ করেন। তিনি সরকারি স্থপতি এবং সবশেষে প্রধান স্থপতিও হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তার দীর্ঘ চাকরি জীবনে ম্যাককোনেল হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল, ভিকারুননিসা গার্লস স্কুল, ৯ তলা সচিবালয় ভবন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি ইমারতের প্ল্যান তৈরি করেন। এভাবে পাকিস্তান তার নব্য সৃষ্টি জাতিসত্তার উন্নয়ন সাধনে আর জনগণের জাতিয়তাবাদী চেতনার খোড়াক হিসেবে উন্নয়নে সচেষ্ট হলেন।
ইতিহাসের পাতায় প্রতীয়মান হয় ১৯৪৭-এর পরে প্রতি বছর ঢাকার আয়তন বেড়েছে। ১৯৫১ সালে ঢাকার আয়তন গিয়ে দাঁড়ায় ৭২.৫২ বর্গকিলোমিটার। তারই এক বছর পর ১৯৫২ সালে ঢাকা শহরের আয়তন আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮৫ বর্গকিলোমিটার। এমনকি এই আয়তন বাড়তেই থাকে। ১৯৫৬ সালে সেকালের ডিআইটি প্রণীত স্ট্রাকচারাল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে ঢাকার আয়তন ধরা হয়েছিল ৬২১.৬ বর্গকিলোমিটার। এরকম প্ল্যানে এগিয়ে চলা ঢাকার আয়তন ১৯৬১ সালে হয় ৯০ দশমিক ৬৫ বর্গকিলোমিটার।
উল্লেখ্য, এ সময় ঢাকার জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। আগে অধ্যায়ে দেখানো হয়েছে, মোগল আমলের পরিসমাপ্তি আর কোম্পানি আমলের শুরুতে ঢাকা থেকে মানুষ কীভাবে গ্রামগঞ্জে কিংবা অন্য কোনো বড় শহরের দিকে ছুটতে থাকে। এমনকি ঢাকায় শেষ পর্যন্ত ১০০ ভাগের মধ্যে মাত্র ২৮ ভাগ মানুষ অবশিষ্ট থাকল। একইভাবে পাকিস্তান গঠনের পরে ঢাকা যখন আবার রাজধানীর মর্যাদা পেল তখন উন্নয়নের ত্বরন বেগের সঙ্গে জনসংখ্যাও বাড়তে থাকে। ১৯৫২ সালে এই জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় চার লাখ ১১ হাজার ২৭৯ জন। জনসংখ্যা যেমন বেড়ে চলেছিল, তেমনি বহুমুখী প্রতিষ্ঠান এই ঢাকার আভিজাত্যকে বাড়িয়ে তুলছিল। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠা পেল এশিয়াটিক সোসাইট। পরের বছরে প্রতিষ্ঠা পেল হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল।
উল্লেখ্য, সরকার ১৯৫৩ সালে টাউন ইমপ্রুভমেন্ট বিল পাস করে। এ থেকে বোঝা যায়, রাজধানী ঢাকার উন্নয়নের প্রয়োজনটা ওই সময় কতটা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এমনকি সরকার থেমে থাকেনি। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের আশপাশে কিছু এলাকায় উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণের উদ্দেশ্যে ১৯৫৩ সালের টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী, ১৯৫৬ সালে ডিআইটি প্রতিষ্ঠা করে। এতে চেয়ারম্যানসহ ১৩ সদস্যের একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডই ছিল ডিআইটি মূল প্রশাসনিক কাঠামো। ঢাকার পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
যাহোক, ১৯৫১ সাল থেকে ঠিকাদারি ব্যবসায় জহুরুলের দুই বছরের আত্মোন্নয়নের পর আসে ১৯৫৩ সাল। এ সময়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির ঠিকাদারে উন্নীত হয়েছিলেন। ঠিকাদারিতে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা লাভের পরেই জহুরুল গড়ে তোলেন তার উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান বিডিসি। সালটা তখন ১৯৫৩।
বিডিসি। যার পুরো নাম বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন। এটা একটি নির্মাণ বা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। বলা চলে বা বিডিসি ছিল আলহাজ জহুরুল ইসলামের ব্যবসায় অভিযাত্রার শুরুর পাঠ।
গঠিত হওয়ার পর থেকেই বিডিসি টেকনিক্যাল দক্ষতায় বিশ্বস্ততা অর্জন করেছে। এর রয়েছে মাল্টি ডাইমেনশনাল অ্যাপ্রোচ, দক্ষতা ও কঠোর পেশাদারিত্ব, যোগ্য কর্মীবাহিনী। তাই এটি দেশ-বিদেশে বহু কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট পেয়েছে। জহুরুল ইসলামের ডাইনামিক লিডারশিপ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায় বিডিসির মাতৃপ্রতিষ্ঠানের আওতায় এটা সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অবস্থান নিতে পেরেছে। বিডিসির মতো প্রতিষ্ঠানের কারণেই এর মাতৃপ্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ অব কোম্পানি একটি বৃহৎ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে সক্ষম হয়েছে।
বিডিসির প্রথম দিকে কার্যক্রম ছিল প্রধানত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পের আওতাধীন। যেমনÑআবাসন, বাণিজ্যিক ভবন, রোড ও হাইওয়ে, সেতু, গুদাম ঘর, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন, পাওয়ার স্টেশন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউনিটের জন্য সিভিল ও বিল্ডিং নির্মাণ কার্যক্রম। পাম্পিং ও হাইড্রোলিক অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন প্রকল্প, ভূমি ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন ও স্থিরকরণ প্রকল্প, ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহনকারী ও ঐতিহ্যবাহী ভবন পুনরুদ্ধার, ডিপটিউবওয়েল ও পাইপলাইন নেটওয়ার্ক বিনির্মাণ, পানি ও সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, বন্যা ও উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প প্রভৃতি। এ প্রকল্পগুলো কখনও সরকারি, কখনও আধা সরকারি, আবার স্বায়ত্তশাসিত, এমনকি প্রাইভেট ও বহুজাতিক সংগঠনের। দেশ-বিদেশে এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় পুনঃকাঠামায়ন এবং এর সম্পদের শক্তিমত্তা বৃদ্ধিকরণের মাধ্যমে আরও বেশি বিস্তার লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি বহুমুখী ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্প যে কোনো পরিস্থিতিতে বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
যাহোক, এ রকম ১৯৫৩ সালে তিনি বিডিসির আওতাধীন তিনি বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ করতে থাকেন। এই বিডিসি গড়ে তোলার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি লাইসেন্স বা নিবন্ধন পেয়ে যান।

গবেষক, শেয়ার বিজ

সর্বশেষ..