মত-বিশ্লেষণ

গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের অমার্জিত আচরণ প্রত্যাশিত নয়

মোহাম্মদ অংকন: গণপরিবহনে যাতায়াতকালে নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। দুঃখজনক হলো, এসব অভিজ্ঞতার বেশিরভাগই সুখকর নয়। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ে কন্ডাক্টারের সঙ্গে বিতর্ক করা, সিটিং সার্ভিসের নামে চিটিং সার্ভিস বন্ধ করতে কর্তৃপক্ষকে গালাগাল করা, গণপরিবহনে যৌন হয়রানি হলে তা নিয়ে প্রতিবাদ করা, বাস চাপা দিয়ে মানুষ হত্যা করলে তা নিয়ে আন্দোলন করা এসব যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চেয়েও মিলছে না পরিত্রাণ। কিছু সিস্টেমবিরোধী কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট রাঘববোয়ালদের দুর্নীতি, প্রশাসনের নিদারুণ অবহেলা, হাত পেতে ঘুষ নেওয়াসহ নানা ধরনের কারণ রয়েছে, যা দেশের গণপরিবহনকে জনকল্যাণে না নিয়ে মারণফাঁদে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। যা-ই হোক, আজকের লেখা গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের অমার্জিত আচরণ প্রসঙ্গে।
সম্প্রতি একটু বেশিই যে জিনিসটি চোখে পড়ছে, তা হলো গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের অমার্জিত ও দৃষ্টিকটু আচরণ। বড়ই কষ্ট ও আশ্চর্যের বিষয়, স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পড়া ছাত্রীদের সঙ্গে ছাত্রদের কিংবা বখাটে স্বভাবের অযাচিত আড্ডা প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। এ দেখার একটা দিক কখনোই ভুল হতে পারে না। কেননা গণপরিবহন তথা বাসের সিটে দুজনের মনোদৈহিক সম্মতিতে চলছে এমন সব কাজ, যেগুলো কোনো বিবেচনায় শ্লীল, শালীন ও সামাজিক বলা যাবে না। এসব কাজ তাদের বিব্রত না করলেও সহযাত্রীরা মাথা নিচু করে অন্যদিকে তাকাতে বাধ্য হন। প্রায়ই দেখা যায়, এই চক্র নির্দিষ্ট দূরত্বে গিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ে, অন্য বাসে ওঠে। এই চক্র বিশেষ করে বাসের পেছনের দিকে বসে। পাশে যে মানুষ বসে আছে, এ বোধকে ভুলে ওইসব কুকর্ম করতে থাকে। এসব বিষয় বর্ণনা করার মানসিকতা হয়তো সবার নেই।
বর্তমানে গণপরিবহন নারীদের জন্য অনেকটা অনিরাপদ। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থা কাজ করছে কীভাবে গণপরিবহনকে নারীদের জন্য নিরাপদ করা যায়। সরকারও যথেষ্ট চেষ্টা করছে। নারীদের আলাদা বাসের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বাসের চালকও নারী। এতকিছুর পরও গণপরিবহনে নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এছাড়া দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়ত নারী ও শিশু ধর্ষিত করা হচ্ছে। বলাবাহুল্য, এটাকে সন্ত্রাসের পর্যায়ে দেখা হচ্ছে। বলা যেতে পারে ‘যৌন সন্ত্রাস’। নারীদের নিরাপত্তাহীনতার এমন সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে ছাত্রীরা গণপরিবহনে নিজেকে প্রেমিকের কাছে সঁপে দিচ্ছে। এ অবস্থায় তারা যদি গণধর্ষণের শিকার হয়, তখন তার দায়ভার কে নেবে? বাসেই যে ধর্ষণের শিকার হবে তারও তো কোনো নিশ্চয়তা নেই, এর জের ধরে অন্যত্রও ধর্ষণের শিকার হতে পারে। তখন কি তার পরিবার বলবে, এ ধর্ষণের পেছনে গাড়িচালক ও সহকারীর যোগসাজশ ছিল? ধর্ষক তাদেরই লোক?
গণপরিবহনে নানা কাজের, নানা মানসিকতার লোক উঠে থাকে। কেউ ব্যস্ত, কেউ ক্লান্ত, কেউ ভিতু, কেউ সাহসী-প্রতিবাদী। তবে দেখেছি, গণপরিহনে যখন এ-জাতীয় ব্যভিচার খোদ শিক্ষার্থীরা ঘটাচ্ছে, তখন কেউ প্রতিবাদ করতে পারছে না। অনেকে এ বিষয়ে আগ্রহই দেখাচ্ছে না। সিট ছেড়ে তাদের কাছ থেকে আড়ালে গিয়ে বসছে। কেননা, যেসব ছেলেমেয়ে প্রকাশ্যে এহেন দৃষ্টিকটু কাজ করতে পারে, তারা সহযাত্রীকে মুহূর্তেই ছুরিকাঘাত করে পালাতে পারে। একদিন প্রতিবাদ করে আমি নিজেই তোপের মুখে পড়েছিলাম। সহযাত্রীরা আমাকে উপদেশ দিয়ে ক্ষান্ত করলেন ‘ভাই, এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে নিজের আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করবেন না।’ এভাবেই তাদের বেহায়াপনা বন্ধ করা গেল না। তবে যখন দেখল যে, যাত্রীদের বেশিরভাগই বিষয়টা জেনে গেছে, এ নিয়ে ফিসফাস করছে, মোবাইলে ছবি তুলছে, তখন তারা নেমে অন্য বাসে চলে গেল।
কতিপয় শিক্ষার্থীর এমন বেহায়াপনা প্রতিনিয়তই দেখছি। প্রশ্ন হলো, এসব প্রতিরোধের উপায় কী? শিক্ষা যদি শিক্ষার্থীদের নীতিনৈতিকতার আদর্শের দিকে ধাবিত করতে না পারে, তা হলে পরিবর্তন আসবে না। সন্তানের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবারকে ভূমিকা রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, স্কুল-কলেজ শেষে তার সন্তান কার সঙ্গে বাড়ি ফিরছে? সময়মতো বাড়ি ফিরছে কি না? কতটা সময় বাইরে কাটাচ্ছে? এ দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ পালনে ব্যর্থদের সন্তানরাই পথেঘাটে অশ্লীলতায় লিপ্ত। পারিবারিক শাসন, সুশিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিকতা ও নীতি-নৈতিকতার চরম অভাববোধ থেকে কতিপয় শিক্ষার্থী এসব অশ্লীল কাজে নিজেদের জড়াচ্ছে। শুধু গণপরিবহন নয়, নানা ধরনের পার্কেও চলছে এসব অপকর্ম। স্কুল-কলেজ শেষে দলবেঁধে পার্কে গিয়ে করছে এসব অপকর্ম। আজকাল এসবের ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে দেখতে পাওয়া যায়। নিজেদের অপকর্ম নিজেরাই প্রচার করছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব দিয়ে মেয়েদের ব্ল্যাকমেইল করছে। নারীদের গোপন ভিডিও ধারণ করে রেখে বিভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণ করছে। আজকাল বিভিন্ন রেস্টুরেন্টেও এমন দৃশ্যের দেখা মিলছে। এ দলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। এমন সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিকতার আস্ফালন সত্যই আমাদের বিচলিত করছে। কিন্তু বিচলিত হওয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

সর্বশেষ..