গণমাধ্যমকর্মী ও সম্প্রচার আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন

নিজস্ব প্রতিবেদক: সব ধরনের গণমাধ্যমকর্মীর জন্য চাকরির শর্ত নির্দিষ্ট করে এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় কমিশন গঠনের প্রস্তাব রেখে ‘গণমাধ্যম কর্মী (চাকরির শর্তাবলি) আইন ২০১৮’-এর খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। একই সঙ্গে ‘সম্প্রচার আইন ২০১৮’-এর খসড়ায়ও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আইন দুটির খসড়ায় অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, গণমাধ্যম পরিচালনার জন্য গঠিত সম্প্রচার কমিশন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স প্রদান করবে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কমিশনে অভিযোগ করে ফল পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, দেশের ভূখণ্ডের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রিন্ট-অনলাইন-রেডিওসহ যেকোনো মাধ্যমের সম্প্রচারকে সংবাদ বলে গণ্য করা হবে। গণমাধ্যমগুলো পরিচালনার জন্য সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিশন গঠন করা হবে। এই কমিশন গঠনে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দেবেন।
এই কমিশন গণমাধ্যমকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, সম্প্রচার কাজকে শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের করতে কাজ করবে। সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে সম্প্রচারযন্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হবে এই কমিশনের প্রধান কাজ। সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান বা গণমাধ্যমগুলোর লাইসেন্স করতে নির্দিষ্ট ফি লাগবে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর এই লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে। লাইসেন্স ফি ও এর মেয়াদ বিধি দ্বারা নির্ধারণ করা হবে। সম্প্রচারের কারণে কারও কোনো ক্ষতি হলে এই কমিশনে নালিশ জানানো যাবে। কমিশন ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগের সুরাহা করবে।
আইনের ২৮ ধারায় ২৪টি অপরাধের বিবরণ দেওয়া আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑঅসত্য তথ্য উপস্থাপন করলে ও সরকারের প্রজ্ঞাপন দ্বারা জারি হওয়া কোনো আদেশ অমান্য করলে, স্বাধীনতার চেতনা পরিপন্থি কোনো সংবাদ পরিবেশন করলে দণ্ড প্রদান করা হবে। এক্ষেত্রে তিন বছরের জেল, পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অপরাধ চলমান থাকলে দিনে এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। লাইসেন্স প্রাপ্তির শর্তের ব্যত্যয় ঘটলে সাত বছরের জেল ও পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই অপরাধগুলো জামিনযোগ্য এবং বিনা ওয়ারেন্টে কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না।
অপরদিকে খসড়ায় সব ধরনের গণমাধ্যমকর্মীর জন্য চাকরির শর্ত ঠিক করা হয়েছে, যাতে সাংবাদিকদের আগের মতো শ্রমিক হিসেবে বর্ণনা না করে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। শফিউল আলম বলেন, আগে গণমাধ্যমকর্মীরা চলতেন ‘দ্য নিউজপেপার এমপ্লয়িজ (চাকরির শর্তাবলী) আইন ১৯৭৪’-এর আওতায়। এর সঙ্গে শ্রম আইনের কিছু বিষয় সাংঘর্ষিক হচ্ছিল। পরে সাংবাদিকদের শ্রম আইনের আওতায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ডেফিনেশনের মধ্যে তাদের শ্রমিক হিসেবে ডিফাইন করা হয়। নতুন আইনের খসড়ায় ওখান থেকে বেরিয়ে আসা হয়েছে।
শফিউল বলেন, শ্রম আইনের অধীনে গণমাধ্যমকর্মীদেরও ‘শ্রমিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। নতুন আইন পাস হলে গণমাধ্যমকর্মীরা আর শ্রমিক থাকবেন না, তাদের গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে অভিহিত করা হবে। দ্য নিউজপেপার এমপ্লয়িজ (চাকরির শর্তাবলি) আইনে সাংবাদিক, প্রেস শ্রমিক ও প্রেস কর্মচারীদের চাকরির শর্ত, আর্থিক বিষয় ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করা ছিল। সরকার ওই আইনকে রহিত করে সব শ্রমিকের জন্য ২০০৬ সালে ‘শ্রম আইন’ প্রণয়ন করে, যাতে সংবাদপত্রের সাংবাদিক, প্রেস শ্রমিক ও প্রেস কর্মচারীদের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নতুন আইনের খসড়ায় গণমাধ্যমকর্মীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছেÑগণমাধ্যমে কর্মরত পূর্ণকালীন সাংবাদিক, কলাকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কর্মচারী বা নিবন্ধিত সংবাদপত্রের মালিকানাধীন ছাপাখানা এবং বিভিন্ন বিভাগে নিয়োজিত কর্মী। সম্প্রচার কাজে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত গণমাধ্যমের কর্মীরা সম্প্রচার কর্মী এবং প্রযোজক, পাণ্ডুলিপি লেখক, শিল্পী, ডিজাইনার, কার্টুনিস্ট, ক্যামেরাম্যান, অডিও ও ভিডিও এডিটর, চিত্রসম্পাদক, শব্দধারণকারী, ক্যামেরা সহকারী, গ্রাফিক ডিজাইনারসহ যে পেশাজীবীরা এ কাজের সঙ্গে জড়িত, প্রস্তাবিত আইনে তাদের ‘কলাকুশলী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদের সপ্তাহে কর্মঘণ্টা ৪৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৩৬ ঘণ্টা করার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়ে শফিউল বলেন, এর চেয়ে বেশি কাজ করালে ওভারটাইম দিতে হবে। আগের ১০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি (সিএল) ১৫ দিন করা হয়েছে। অর্জিত ছুটি ৬০ দিনের বদলে ১০০ দিন করা হচ্ছে, ১১ দিনে এক দিন করে ছুটি জমা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রত্যেক গণমাধ্যমকর্মী চাকরির ১৮ ভাগের এক ভাগ সময় পূর্ণ বেতনে অসুস্থতাজনিত ছুটি পাবেন; সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে। এককালীন বা একাধিকবার সর্বোচ্চ ১০ দিন উৎসব ছুটি পাবেন। নারী কর্মীরা সরকারি বিধি অনুযায়ী ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন, যা আগে ছিল আট সপ্তাহ। গণমাধ্যমকর্মীদের তিন বছর পর পূর্ণ বেতনে শ্রান্তি বিনোদন ছুটি এবং বিধিমালা অনুযায়ী স্বাস্থ্য বিমা সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে। নতুন আইন হলে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠন করতে হবে বলে জানিয়ে শফিউল বলেন, নিয়োগের এক বছর পর থেকে ভবিষ্যৎ তহবিলে মাসিক চাঁদা জমা দেওয়া যাবে। আগে দুই বছর চাকরি পার হলে ভবিষ্যৎ তহবিলে চাঁদা জমা দেওয়া যেত। সর্বনি¤œ আট ও সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ এই তহবিলে জমা রাখা যাবে। আগে সাত শতাংশ জমা রাখা যেত। মালিককে সমান হারে প্রভিডেন্ট ফান্ডে টাকা রাখতে হবে।
ওয়েজবোর্ডের সিদ্ধান্ত সব গণমাধ্যম মালিককে পালন করতে হবে বলে জানিয়ে শফিউল বলেন, যদি কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কোনো গণমাধ্যম কর্মীর বকেয়া থাকে তবে তিনি বা তার লিখিত ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি মৃত গণমাধ্যমকর্মীর ক্ষেত্রে তার পরিবারের কোনো সদস্য বকেয়া পাওনা আদায়ে যথোপযুক্ত আদালতে মামলা করতে পারবেন। এই আইনের বিধি লঙ্ঘন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে, এজন্য সর্বনি¤œ ৫০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে। জরিমানা আদায় না হলে আদালত জেল দিতে পারবেন। সরকার এই আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়াসহ যে কোনো পর্যায়ে সরকার প্রদত্ত যে কোনো সুযোগ-সুবিধা স্থগিত বা বন্ধ করে দিতে পারবে।