গবেষণার অনুষঙ্গে জীবন ও জগৎ

প্রথম পৃষ্ঠার পর……

কৌশল ব্যবহারের চল আসেনি। এ পদ্ধতিতত্ত্ব বহুমুখী শাস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এখানে জাতিতত্ত্ব, আত্ম-জাতিতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইতিহাস, কথ্য ইতিহাস, অণুকাহিনীমূলক ইতিহাস, জীবন ইতিহাস, সাহিত্য, ডিসকোর্স ইত্যাদি শাস্ত্র জড়িয়ে পড়ে। আবার ব্যক্তির পেশাসংশ্লিষ্ট বিষয়-শাস্ত্রও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

রণদা প্রসাদ সাহা ছিলেন একজন বণিক বা ব্যবসায় উদ্যোক্তা। তাই বাণিজ্যবিদ্যা এ বয়ানে গুরুত্ববাহী। তিনি গণ-দারিদ্র্যের সেই সমাজে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করেন। পশ্চাৎপদ এক সমাজে নারীশিক্ষার অগ্রগমনে অনন্য অবদান রেখেছেন। এসব বিচারে ঐতিহাসিক-অর্থনীতি, চিকিৎসাবিদ্যা ও শিক্ষাশাস্ত্রের প্রথম পাঠ রণদার জীবন আখ্যানে সংসৃষ্ট হয়ে ওঠে।

বস্তুত আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ছাঁচের মধ্যেই রণদার জীবন নির্মিত হয়েছিল। তাই তার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প কিংবা মানবপ্রেমে বিলীন হওয়ার ভাষণ ডিসকোর্সের তিন মাত্রায় ব্যবচ্ছেদের দাবি রাখে।

রণদা প্রসাদ সাহা ছিলেন আমুদে প্রকৃতির মানুষ। শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যকে ছাপিয়ে তিনি মনের মুক্তির জন্যও উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বিনোদন, বিশ্বাস ও স্ফূর্তির তিয়াসে মানুষের জন্য বিলিয়েছেন অর্থ, সময় ও শ্রম। সেই গল্প, গল্পকথন, অভিজ্ঞা উপস্থাপনে যেমন রয়েছে সাহিত্যের সংশ্রব, তেমনি রয়েছে জীবনকথা, আত্মকথা, কেইস স্টাডিজের বিশেষত্ব। রস, বোধ আর লিখন ক্ষমতাতেও থাকতে হয় মুন্সিয়ানা।

গবেষণা কৌশলে ধাপে ধাপে গভীরের উপলব্ধি আরও ঋদ্ধ হয়। একজন রণদা প্রসাদ সাহার উদ্যোক্তা জীবন, সাংগঠনিক চিন্তাকৌশল ও মানবপ্রেমের মতো অনুধ্যান বিচার করা চলে কেবল তার জীবন ও জগৎসংশ্লিষ্ট উপায়-উপকরণের মধ্য দিয়ে। জীবনী গবেষণা পদ্ধতিতে ব্যক্তির ‘ব্যক্তিগত নথি’ বা ‘জীবনের নথি’ সংগ্রহ করা প্রাথমিক ধাপের মধ্যে পড়ে। ডায়েরি, স্মৃতি, স্মারক, ব্যবহারের বস্তুনিচয়, স্থির বা চলচ্চিত্রের মতো রণদার বিভিন্ন প্রতœবস্তুর সহায়তা নেওয়া হয়েছে এ আখ্যান রচনায়।

তাকে নিয়ে অনেক কথ্য ইতিহাস মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এগুলো সংগ্রহ করতে জাতিতাত্ত্বিক পদ্ধতিতত্ত্বের কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। রণদার জীবনকথা এখন অনেক স্থানীয় লোকের মুখে রূপকথার মতো লাগে; টাঙ্গাইলের কিংবদন্তি যেমন কথ্য ইতিহাসে কেচ্ছাকাহিনী হয়ে টিকে আছে, তেমনি মানুষের মুখের বয়ানে রণদা এক কিংবদন্তি। কিন্তু তার গল্প সহজে প্রতীয়মানযোগ্য। কেননা রণদার গল্প যদি কারও কাছে রূপকথার মতো শোনায়, তবে নজির মিলে যায় তার রেখে যাওয়া কাজের মধ্যে।

তার বাড়ির গদিঘর, সামনের মন্দিরখানি আজ এক উš§ুক্ত জাদুঘর। বাড়িটির কোলঘেঁষে বহতা লৌহজং ও তার পেট ভেঙে নির্মিত স্নানঘাট, নদীটির জলধারায় দাপিয়ে বেড়ানো কুষা নৌকা, বিশালাকৃতির রথ এসব কিছু তার পরিচয়। এ কিংবদন্তি সত্যি প্রতীয়মান হয় নদীটির অববাহিকায় গড়ে ওঠা কুমুদিনী হাসপাতাল, ভারতেশ্বরী হোমস, কুমুদিনী কলেজকে ঘিরে। তিনি মানিকগঞ্জে গড়ে তুলেছিলেন বাবার নামে কলেজ। নারায়ণগঞ্জের ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট তার জীবনী গবেষণায় এখনও মূর্তিমান অনুষঙ্গ।

রণদা প্রসাদ সাহা বিশ শতকের গোড়ার দিকে কিশোর জীবনেই রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। তিনি স্বদেশি আন্দোলন করেছেন। জেল-জুলুম সয়েছেন। এরপরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। যুদ্ধে তার অংশগ্রহণ ছিল অসামান্য। তাই একজন রাজনৈতিক কর্মী বা যোদ্ধার জীবন গবেষণায় রাজনৈতিক প্রেক্ষিত ও তার সংশ্লিষ্টতা খুবই প্রাসঙ্গিক। রাজনীতিবিজ্ঞানের আলোচনা এখানে চলে আসে।

তবে রণদার জীবনের একটি বড় অধ্যায় হলো ব্যবসায় উদ্যোগ। উদ্যোক্তা নিয়ে বাণিজ্যবিদ্যায় কিংবা সমাজবিদ্যায় গবেষণাকর্ম প্রথম শুরু হয় আশির দশকে। কল্পলোকের কাহিনীর মতো শোনায় সেসব তৃষিত-শূন্য প্রান্তর ছিঁড়ে বেড়ে ওঠা বিশাল বড় উদ্যোক্তাদের গল্পকথা। অবাক হতে হয়, সেসব উদ্যোক্তা ছিলেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। না ছিল তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষা, না ছিল বাণিজ্যবিদ্যার নানা তত্ত্ব ও কৌশলজ্ঞান। তবু তারা সফল হয়েছেন। তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ-আবাসন, পুঁজিবাজারের মতো নব নব উদ্যোগে এসব উদ্যোক্তার সাফল্য স্ফুরিত হতে থাকে। তখন তাদের নিয়ে গবেষণার দায়ও বাড়তে থাকে। এটা সত্তর দশকের কথা।

নিজ নিজ বিজনেস ইথোস (ব্যবসায়িক আদর্শ) মেনে তারা ব্যবসায় বিস্তার লাভ করেছেন। তবে এ ধরনের গবেষণায় উদ্যোক্তার স্থান, কাল ও পাত্রের স্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজের আর্থসামাজিক বাস্তবতা আরেক নিজস্বতা সৃষ্টিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। রণদার মতো এই বাংলার ব্যবসায় উদ্যোক্তাদের জীবন গবেষণায় প্রাথমিক পুঁজি সৃষ্টি থেকে শুরু করে স্বাধীন বণিকে রূপান্তর এবং তারপর আত্মশক্তি সঞ্চার অবধি পর্যবেক্ষণ করা হয়।

ব্রিটিশরা ভারতে শোষণ-কর্তৃত্ব চালু করার পর নিজেদের মতো করে ভারতীয়রা বাণিজ্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। বিশেষ করে মোগল ঘরনার লোকেরা। তবে অবাঙালির পাশাপাশি কিছু লোক বাণিজ্যে যোগ দেন। তারা ব্রিটিশ কর্তৃত্বকামীদের সাহচর্যে নতুন আর্থসামাজিক শ্রেণি নির্মাণ করেন। এদের মধ্যে প্রথম ভারতীয় উদ্যোক্তা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর। তিনি অবশ্য রণদার মতো প্রান্তিক মানুষ ছিলেন না। জমিদারির উদ্বৃত্ত অর্থে তিনি বাণিজ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অবশ্য গোড়ার দিকে রণদার ব্যবসায় উদ্যোগেও কয়েকজন জমিদারের আর্থিক সহযোগিতা বা অংশীদারত্ব ছিল। তখন কেবল পুঁজি সঞ্চায়নের বৈতরণী পাড়ি দিলেই বাঙালিদের ব্যবসায় বাধা অতিক্রমের কাজ পরিসমাপ্ত হতো না। রাষ্ট্র-রাজনীতির আনুকূল্য বা সহযোগিতা মুখ্য হয়ে দাঁড়াত। রণদার পরে কোনো কোনো উদ্যোক্তার এ ধরনের আনুকূল্য খুব সামান্য চোখে পড়ে। তবে গবেষণায় প্রমাণিত, রণদা ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক আনুকূল্য উপভোগ করেছেন।

তবে রণদাকে কেবল একজন ব্যবসায় উদ্যোক্তা হিসেবে মাপা যায় না। তাই তার জীবন গবেষণার অনুষঙ্গ আরও বেশি বিস্তৃত। দানবীর, শিক্ষানুরাগী ও সমাজহিতৈষী রণদার জীবন অনন্যসাধারণ। তাকে কেবল তার ইথোসেই মাপতে হয়। তার জীবন, সময় আর কর্মের মধ্যেই রয়েছে নিজস্ব দার্শনিক অনুষঙ্গ। তার প্রত্যয়, প্রতীতি, প্রাগ্রসরতার আদ্যোপান্ত অনুসন্ধানই এ গবেষণার লক্ষ্য।

 

গবেষক, শেয়ার বিজ

mshelleyjuÑgmail.com