গভর্নরের বক্তব্যের প্রতিফলন চাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজে

‘ব্যাংকগুলো যত ভালো করুক না কেন, যতই নতুন পণ্য নিয়ে আসুক না কেন, সুশাসন না থাকলে এ খাত টিকে থাকতে পারবে না।’ বুধবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে সপ্তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন ২০১৮-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এ কথা বলেন। তার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই বললেই চলে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী আরও বলেন, আগামী দিনগুলোতে সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ মন্তব্যে আমরা আশাবাদী। ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাবের কথা বিশেষজ্ঞরা অনেকদিন ধরেই বলছেন। ব্যাংক খাতে সুশাসন নেই, গভর্নরই তা স্বীকার করেছেন। এটি লুকোছাপার বিষয়ও নয়। গত দেড় দশকে এ খাতে বেশ কয়েকটি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে। গত আট বছরে সংঘটিত0 ছয়টি বড় কেলেঙ্কারিতে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি চুরি বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও শর্ত শিথিল করে। অর্থ কেলেঙ্কারির আসামিরা আদালতে হাজিরা দেন দামি গাড়িতে চড়ে। লুটপাটের পরও ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডির বলতে গেলে কিছুই হয় না। অবস্থা এমন হয়েছে যে, সাধারণ মানুষও জানে ব্যাংক মানে আত্মসাৎ। ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে পরিশোধ না করলেও চলে।
ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা নিয়মিত করা, ব্যাংকগুলো যাতে বড় ঝুঁকিতে না পড়েÑসেদিকে নজর রাখা, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঋণদানের ক্ষেত্রে কাকে ঋণ দেওয়া হবেÑসেটি বিবেচনায় নেওয়া, ঋণ আবেদনকারীর তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিচারহীনতায় আর্থিক খাতে অনিয়ম বাড়ছে। এ খাতে সংঘটিত অনিয়মগুলোর বিচার হচ্ছে, এমন দৃষ্টান্ত তেমন নেই। ব্যাংক খাতের বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত হোতাদের বিচার হয়নি। শাস্তি হচ্ছে শুধু অধস্তন কর্মকর্তাদের। অনিয়ম কমাতে হলে কিন্তু দরকার জড়িতদের দৃশ্যমান শাস্তির বিধান করা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার যে স্বায়ত্তশাসন রয়েছে, তা প্রয়োগ করতে হবে। স্বায়ত্তশাসন প্রয়োগ করেই অর্জন করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে আইন ও ক্ষমতা আছে, তা সঠিকভাবে পরিপালন হলেই ব্যাংক খাত ঠিক থাকবে বলে ধারণা।
রাজনৈতিক কারণে যেমন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিয়োগ ও ঋণদানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। আর্থিক খাতে নেতিবাচক কিছু ঘটলে তা প্রবৃদ্ধিতে আঘাত করে। ২০০৮ সালে বিশ্বমন্দার শুরু ছিল কিন্তু আর্থিক খাত দিয়ে।
বর্তমানে অর্থ লোপাটের কারণে সংকটে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। ঘাটতি দেখা দিচ্ছে মূলধনের। খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। একটি বেসরকারি ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতেও মূলধন সহায়তা দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক ও একটি বিনিয়োগ সংস্থা।
ব্যাংক কর্মকতারা যেন একটি অলিখিত নিয়ম মেনে চলেনÑযাদের অর্থ আছে, তারা ঋণ পাবে। যাদের নেই, তারা পাবে না। কিন্তু পরিশোধ করবে, এমন ঋণগ্রহীতাদের বিভিন্ন শর্ত পরিপালনের কথা বলা হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যাংকের আইটি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ গুরুত্বপূর্ণ। আইটিতে সর্বাধুনিক যন্ত্র, হালনাগাদ সফটওয়্যার পরিচালনাকারী কর্মীরা দায়িত্বপরায়ণ হলেই কাজ হবে। এক্ষেত্রে নিয়োগে স্বচ্ছতা, কাজে জবাবদিহি না থাকলে অনিয়মও যাবে না।
অনুষ্ঠানটিতে ব্যাংকাররা বলেছেন, অতিরিক্ত কাজের কারণে পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যাংককর্মীরা। কাজের চাপ কমাতে জনবল বাড়াতে হবে বৈকি। সন্ধ্যার আগেই ব্যাংকিং কাজ শেষ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। কর্মীদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিতেও ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হবে বলে প্রত্যাশা।
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে হঠাৎ বদলসহ (যা দখল হিসেবে বিবেচিত) কয়েকটি ক্ষেত্রে নীরবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ অবস্থায় সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে মর্মে গভর্নরের বক্তব্য নিছক বক্তব্য নয়, তার বিলম্বিত উপলব্ধিও বটে। ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমে তার বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটলে ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরবে বলেই প্রত্যাশা।