গভীর সংকটের মুখে বৈশ্বিক পানি অর্থনীতি

ড্যানিয়েল নিরেনবার্গ: প্রকৃতিগত কারণে সীমিত হওয়ায় মিঠাপানি খুবই মূল্যবান। এজন্য কোন ধরনের উৎসের পানিসম্পদ সীমিত, সে বিষয়টি নিয়ে পানি অর্থনীতিবিষয়ক বিজ্ঞানে গবেষণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক বৈষম্য তৈরি না করে এবং অস্থিতিশীল পরিবেশগত প্রভাব এড়িয়ে চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পানির সংস্থান কীভাবে করা যায় তা নিয়ে এতে কাজ করা হয়।
সার্বিকভাবে আমাদের পৃথিবীতে এক দশমিক চার বিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার পানি রয়েছে। যদিও এর মধ্যে ৪৫ হাজার কিউবিক কিলোমিটারেরও কম পানি (মোট পানির শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য তিন শতাংশ) ব্যবহারযোগ্য। এর মধ্যে আবার মাত্র ৯ থেকে ১৪ হাজার কিউবিক কিলোমিটার পানি মানুষের ব্যবহারোপযোগী। এর মানে হলো, এগুলো পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন, যা বিশ্বের মোট পানির শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য এক শতাংশ।
পৃথিবীতে যে পরিমাণ মিঠাপানি রয়েছে, তা সব স্থানে একই পরিমাণে নেই। দি ওয়ার্ল্ডস ওয়াটার প্রতি দুবছর পরপর তাদের প্রতিবেদনের তথ্য হালনাগাদ করে। সংস্থাটির মতে, বিশ্বের মোট পানযোগ্য পানির ৬৫ শতাংশই ১৩টি দেশে রয়েছে। এর মধ্যে ব্রাজিলে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ, রাশিয়ায় আট দশমিক দুই শতাংশ, কানাডায় ছয় শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় পাঁচ দশমিক দুই শতাংশ, চীনে পাঁচ দশমিক এক শতাংশ, কলম্বিয়ায় তিন দশমিক ৯ শতাংশ, ভারত ও পেরুতে তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ, কঙ্গোয় দুই দশমিক তিন শতাংশ, ভেনিজুয়েলা ও বাংলাদেশে দুই দশমিক দুই শতাংশ এবং মিয়ানমারে এক দশমিক ৯ শতাংশ পানি রয়েছে। অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানিসংকটে পড়া দেশের সংখ্যাও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি ওইসব দেশে বার্ষিক মাথাপিছু পানির প্রাপ্যতা এক হাজার কিউবিক মিটারেরও কম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী পৃথিবীতে প্রতি বছর আট লাখ ৪২ হাজার মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এর মধ্যে অন্তত তিন লাখ ৬১ হাজারই পাঁচ বছরের নিচের বয়সের শিশু। তাদের মৃত্যুর মূল কারণ হলো অনিরাপদ পানি পান করা। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে বিশ্বের অন্তত ৭৬ কোটি ৮০ লাখ মানুষ পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপদ পানি পায়নি। প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন জাতিসংঘ ঘোষিত ন্যূনতম পানির সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বৈশ্বিক সংস্থাটির ঘোষণা অনুযায়ী জনপ্রতি ২০ থেকে ৫০ লিটার মিঠাপানি পাওয়ার নিশ্চয়তাকেই এ সুবিধাপ্রাপ্তি হিসেবে ধরা হয়।
এ ধরনের পরিসংখ্যানগুলো বিবেচনায় নিয়ে পানিকে মৌলিক ও অপরিহার্য মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। এ অধিকার এমন একটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত করে, যার মাধ্যমে সবাই তার প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি, যা পানের উপযুক্ত, তার পূর্ণাঙ্গ নিশ্চয়তা পাবে। এতে শারীরিকভাবে বা অর্থনৈতিক অথবা কোনো উৎসের মাধ্যমে পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না। এ মৌলিক মানবাধিকারের স্বীকৃতির বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ৬৪/২৯২ নম্বর রেজুলেশনের মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

আমাদের পানি ব্যবস্থাপনা: ‘ভার্চুয়াল পানি’ বাণিজ্য ও পানির বেসরকারিকরণ পানির স্বল্পতা বৈশ্বিক সংঘাতের একটি কারণ হয়ে উঠতে পারে। এর পক্ষগুলো হবে যাদের অধিক পরিমাণে পানি আছে এবং যাদের পানির স্বল্পতা রয়েছে। এ কারণে বৈশ্বিকভাবে অবাধ ও সতর্কতার সঙ্গে পানি সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপ করা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও পানের জন্য ও কৃষিক্ষেত্রে যে পানি ব্যবহার করা হয়, তার সঙ্গে ভার্চুয়াল পানিও গুরুত্বপূর্ণ। ভার্চুয়াল পানি বলতে এখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে পানি ব্যবহার করা হয়, তাকে বোঝানো হয়েছে।
‘ভার্চুয়াল পানি’ ধারণাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন টনি অ্যালান, যিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পানি বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। তিনি ভার্চুয়াল পানি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের উচিত বৈশ্বিক পানি ব্যবহারের পেছনে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত কারণগুলো প্রকাশ করা।’ তার এ ধারণাটি প্রচার করতে গিয়ে এর জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথাও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, পানির অতিরিক্ত ব্যবহার ও অব্যবস্থাপনার কারণে আমাদের পানি পরিবেশের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এমনকি পানি ব্যবহার করে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করা হয়, তাতেও প্রভাব পড়েছে। অধিকাংশ মানুষই জানে না, তাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনে কি পরিমাণ পানি ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় শুধু এক কাপ কফি তৈরির জন্যই অন্তত ১৪০ লিটার পানি ব্যবহার করা হয়। এটা কফির উৎপাদন থেকে শুরু করে গরম পানিতে ব্যবহৃত কফি বিন তৈরি পর্যন্ত হিসাব করা হয়েছে। অ্যালান মনে করেন, অতীতে ভার্চুয়াল পানি ব্যবহারের বিষয়ে খুব কমই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। এখন পরিস্থিতি সম্পর্কে তার অভিমত হলো, বৈশ্বিক জনসংখ্যা ৭০০ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার পর পানি সংকটে পড়ার বিষয়টি এখন আর সম্ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন অনেকের জন্য বাস্তবতা।
বিপুল পরিমাণ ভার্চুয়াল পানি শস্য আকারে রফতানি হচ্ছে, যা উৎপাদনে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। এটা সব সময় ভালো ফল বয়ে নিয়ে আসে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গম রফতানিকারক ১০ দেশ মারাত্মক পানিশূন্যতায় ভুগছে। অপরদিকে শীর্ষ ১০ আমদানিকারক দেশের মধ্যে তিন দেশের জন্য বিষয়টি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। পানিসম্পদের ভার্চুয়াল বিনিময়ের ক্ষেত্রে যেসব দেশ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল, তা খুবই সংকটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
পানিসংক্রান্ত বাণিজ্য বিষয়ে অভিজ্ঞ হ্যানোভার কলেজের নদী ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও অর্থনীতির অধ্যাপক ডেনিস উইখেলনস মধ্যপ্রাচ্যের জর্দানের সঙ্গে অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ধরনের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, জর্দানে খুবই সামান্য পরিমাণ পানি রয়েছে। ফলে যেসব পণ্য অনেক বেশি পানি ব্যবহার করে উৎপাদন করা হয়, জর্দান অন্যান্য দেশের সঙ্গে সে ধরনের পণ্যের বাণিজ্য করে। ডেনিস দেখিয়েছেন, ভার্চুয়াল আকারে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি কিউবিক মিটার পানি আমদানি করে জর্দান। যার বিপরীতে মাত্র ১০০ কোটি কিউবিক মিটার পানি অভ্যন্তরীণ উৎসগুলো থেকে উত্তোলন করে দেশটি। তিনি বর্ণনা করেছেন, জর্দানের মানুষ বিশ্বের অন্যান্য দেশের ভার্চুয়াল পানির ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম।
যদিও দূষণ কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক কিছুরই চাহিদা বাড়ছে; কিন্তু তার পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই পানির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়বে। এতে যাদের কাছে প্রচুর পানি আছে এবং যারা পানি সংকটের মধ্যে রয়েছে, তাদের মধ্যে এক ধরনের সংঘাতের সূচনা হবে। পানির বেসরকারিকরণ এ পরিস্থিতিতে পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও বিতরণ বেসরকারি খাতে দিয়ে দেওয়ার একটি সমাধান হিসেবে উদাহরণ দেওয়া হয়। যদিও এটি কিছুটা বিভেদ সৃষ্টিকারী সমাধান হিসেবেও মনে করা হয়।
যারা এ ব্যবস্থার বিরোধী, তারা দেখিয়েছেন পানির ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে দেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় ইতোমধ্যে পানি নিয়ে সমস্যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপে পানির ব্যবহার নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উত্তেজনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ এ অঞ্চলের নিচের দিকে অবস্থিত। এছাড়া দেশটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবেও অনগ্রসর। বাংলাদেশের অভিযোগ, পানিবণ্টন ও বেসরকারিকরণের বিষয়টি ভারতের অনুকূলে রয়েছে। যদিও উভয় পক্ষের মধ্যে পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এটা নৈতিকতার দিক থেকেও উদ্বেগ বৃদ্ধি করছে।
পানির বেসরকারিকরণের বিষয়টিকে যারা সমর্থন করেন, তারা দেখিয়েছেন সরকারিভাবে পানি ব্যবস্থাপনার তুলনায় বেসরকারিকরণ কতটা কার্যকর। বেসরকারি কোম্পানি দ্বারা আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি হবে। এছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে ভাগ করে দিয়ে খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এর ফলস্বরূপ ভোক্তাদের খরচ কমে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় পানি কোম্পানি ও এর সহযোগী হিসেবে বেসরকারি গোল্ডেন স্টেট ওয়াটার পানি ব্যবস্থাপনার কাজ করছে। তারা একসঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় দুই লাখ ৬০ হাজার ভোক্তার ব্যয় বণ্টনের কাজ করে। ইউটিলিটি খরচ ও বৈদ্যুতিক সেবার ব্যয় ভাগ করে নেওয়ায় ভোক্তাদের এক্ষেত্রে সুবিধা হচ্ছে। বেসরকারি কোম্পানিগুলো কার্যকর সরবরাহ ও মনিটরিং ব্যবস্থা উন্নত করার দিকে নজর দিতে পারে। এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড সেফটি সাপোর্ট কোম্পানি ভূগর্ভস্থ পানি রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে দারুণ কাজ করছে।
সর্বোপরি, সবচেয়ে কার্যকর পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সেটা, যেখানে নাগরিকের স্বার্থ মাথায় রেখে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যারা বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কৃষক, মূলত তারা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষকের ভূমিকার গুরুত্ব কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশের মধ্যে প্রতীকী সম্পর্কের বিষয়টিকেই চিহ্নিত করে।

ড্যানিয়েল নিরেনবার্গ: সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফুড ট্যাংক এবং সুষম কৃষি ও খাদ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম থেকে ভাষান্তর (সংক্ষেপিত) তৌহিদুর রহমান