গাছগাছালি পেয়েছিল তার মতো দরদি

নুর আলম, রংপুর: গাছগাছালি শুনলে মনে হতে পারে অজপাড়াগাঁয়ের ভাষা। অজপাড়াগাঁয়ের মানুষের ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠতে পারে। এমন সব মানুষের মধ্যে সরলতা হয়তো আজও টিকে আছে দেশের প্রতি তাদের সত্যিকারের টান রয়েছে। দেশকে তারা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন।

তেমনই একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা মুকুল মোস্তাফিজ। তিনি মুজিববাহিনীর রংপুরের ডিস্ট্রিক্ট লিডার ছিলেন। সাংবাদিকতা করতেন বাংলার বাণী পত্রিকায়। প্রকৃতিপ্রেমী মানুষটি আজ পৃথিবীতে নেই। রয়ে গেছে তার হাতে গড়া নার্সারি। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৯১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি একটি নার্সারি স্থাপন করেন। একটুও ব্যবসার চিন্তা ছিল না তার। কেবল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এমন উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

রংপুর শহরের পায়রা চত্বর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে রংপুর সাহেবগঞ্জ-হারাগাছ সড়কের পাশে বাহারকাছনা নামক স্থানে গড়ে তোলেন সেই নার্সারি। নাম দিয়েছিলেন ‘গাছগাছালি’। প্রায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে ৭০০-এর বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ নিয়ে শুরু করেছিলেন গাছগাছালি নার্সারি।

তার গড়া নার্সারিতে শুধু বৃক্ষজাতীয় চারাই নয়, রয়েছে ফুলজ, ফলজ ও ঔষধি গাছ। একই সঙ্গে বিলুপ্তপ্রায় অনেক গাছের চারা রয়েছে সেখানে। বর্তমানে নার্সারির দেখাশোনা করছেন রাসেদুল কবীর রুবেল। তিনি মূলত মুকুল মোস্তাফিজের সহধর্মিণী মনোয়ারা মুস্তাফিজকে সহায়তা করছেন। রুবেল জানান, এ নার্সারি প্রতিষ্ঠার আগে তিনি আর কে রোড সংলগ্ন রানা নার্সারিতে কাজ করতেন। বেঁচে থাকতে মুক্তিযোদ্ধা মুকুল মোস্তাফিজ প্রায়ই রানা নার্সারিতে গাছ কিনতে যেতেন।

‘আমার মতো গাছের যতœ নেওয়া লোক খুঁজতেন মুকুল মোস্তাফিজ চাচা। আমাকে মাঝে মাঝে বলতেন সেই কথা।’ বলেন রুবেল। তিনি আরও বলেন, ‘একদিন আমাকে সঙ্গী করেই গাছগাছালি নার্সারি স্থাপন করেন’।

শুরু থেকেই মুকুল মোস্তাফিজের মতো তিনিও নানা প্রকার চারা রোপণ ও বাজারজাত শুরু করেন। ২০০৫ সালে প্রথমবার রংপুর অঞ্চলের বৃক্ষমেলায় অংশ নিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে তাদের নার্সারি। পরের বছর ২০০৬ সালে সামাজিক বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসকের আয়োজনে বৃক্ষমেলায়ও প্রথম হয় এ নার্সারি। এরপর ২০০৮ সাল পর্যন্ত ধারবাহিকভাবে বৃক্ষমেলায় প্রথম স্থান অধিকার করে নার্সারিটি।

এ নার্সারিতে ১০-১৫ জন লোক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এখানে বিলুপ্তপ্রায় গাছের চারা ছাড়া রয়েছে নানা প্রকার দেশি-বিদেশি চারা। এ নার্সারিতে এমন কিছু চারা উৎপাদন হয়, যা বিশ্বের কয়েকটি হাতেগোনা কয়েকটি দেশে পাওয়া যায়। যেমন কাইজিলিয়া ও ড্রাগনের মতো কিছু গাছ। বিলুপ্তপ্রায় গাছের মধ্যে রয়েছে আগর গাছ, সাতকরা, নাগেশ্বর, অশোক প্রভৃতি। এছাড়া কমলা রয়েছে তিন জাতের নাগকুরি, চায়না ও মালটা। আঙুর দুই জাতের সবুজ ও লাল। এখানে পাওয়া যায় অ্যাভোকোডার চারা, জাপাটিকাবা ও আলুবোখারাসহ বিলাতি আম ও ছাতিম। রংপুরে হাড়িভাঙা আমের বিস্তারে এ নার্সারির ভূমিকা রয়েছে। বারোমাসি আমড়া, আম্রপালী, আশ্বিনী আম গাছের চারা পাওয়া যায়  এখানে।

গাছগাছালি নার্সারি থেকে আয়ের একটি অংশ দিয়ে প্রায় এক দশক ‘অটল’ নামে ভিন্নধারার একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন প্রতিষ্ঠাতা। এখন উদ্ভিদবিষয়ক একটি গবেষণাগার ও গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে তার সহধর্মিণীর।