গালফে নতুন মেরুকরণ ও বাংলাদেশ

 

প্রায় সাড়ে তিন দশকের পুরোনো আঞ্চলিক সংস্থা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) থেকে বেরিয়ে সৌদি আরবের নেতৃত্বে নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ঘোষণাটি এসেছে মঙ্গলবার কুয়েতের রাজধানীতে এ সম্মেলন শুরু হওয়ার সময়েই। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এমন জোট গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া না গেলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না দেশটির বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ। এ থেকেও অনুমান করা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশটি হাঁটছে কোন পথে। অনেকের হয়তো মনে আছে, চলতি বছরের জুনে সৌদি আরবের নেতৃত্বে চারটি দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল কাতারের সঙ্গে। এখন পর্যন্ত এর সমাধান না হওয়ায় ওই অঞ্চলে চলছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট। জিসিসি থেকে বেরিয়ে এসে ইউএই নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দেওয়ায় সেটি আরও ঘনীভূত হবে বলেই মনে হচ্ছে।

জিসিসি তালিকাভুক্ত ছয়টি দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য গঠিত একটি প্লাটফর্ম। এদের মধ্যে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক দিয়ে শক্তিশালী। দেশ দুটির সামরিক শক্তিও লক্ষণীয়। এ অবস্থায় জিসিসির পাল্টা জোট গঠন হলে সেটি যে শক্তিশালী হবে, তাতে সন্দেহ নেই। সেক্ষেত্রে ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব ও সন্ত্রাসবাদে মদদ জোগানোর অভিযোগ ঘিরে এ সংকট স্পষ্ট হতে পারে আরও। রাজনীতি ও অর্থনীতির বাইরে এসবে যে ধর্মীয় উপাদানও রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। সার্বিক বিবেচনায় কাতার সংকট সমাধানের যে আশা করা হয়েছিল, তা তো হবেই না; বরং নতুন মেরুকরণ ঘিরে আরও অস্থিতিশীল হতে পারে গালফ অঞ্চলের রাজনীতি ও অর্থনীতি।

এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য স্বভাবতই উদ্বেগের। কারণ মধ্যপ্রাচ্য আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। গত অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় কমে আসার অন্যতম কারণ ছিল জ্বালানি তেলের নিম্নমুখী দর ও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা। এমনতরো সংকট দীর্ঘায়িত হলে ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের শুধু অস্বস্তিতেই পড়তে হবে না, ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের অর্থনীতি। বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে আসার পাশাপাশি প্রবাসী আয়নির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির গতি হবে কিছুটা হলেও শ্লথ। এজন্য মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের হালনাগাদ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ওয়াকিবহাল থাকার পাশাপাশি দরকার তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি।

ইরান-সৌদি আরব মতবিরোধে শুধু ধর্মীয় ইস্যু কিংবা ওই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক বিষয় নয়, বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তির স্বার্থও নানাভাবে যুক্ত। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা আন্তর্দেশীয় সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় এসব জটিলতার সহজ সমাধান যেমন নেই, তেমনি এর সম্ভাব্য ফল থেকে তৃতীয় কোনো দেশের পক্ষে মুক্ত থাকাও কঠিন। স্বভাবতই বাংলাদেশকেও একরকম মেনে নিতে হবে এসবের সম্ভাব্য ফল। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হওয়ায় নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে অস্থিতিশীলতার মধ্যে থাকা ওইসব দেশে বাংলাদেশিদের স্বার্থের যাতে সুরক্ষা হয়, সেদিকে নজর দেওয়া। এদিকে ‘ব্রেক্সিট’ ঘিরে অস্থিতিশীলতা রয়েছে ইউরোপের শ্রমবাজারে। এ অবস্থায় নতুন বাজার অন্বেষণ ও সেখানে জনশক্তি রফতানির বিষয়টি সময়সাপেক্ষও বটে। যেহেতু প্রবাসী আয়ের ওপর এ দেশের অর্থনীতি অনেকটা নির্ভরশীল, সেহেতু আমরা চাইব উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এও মনে রাখতে হবে, মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে জনশক্তি রফতানির ওপর অতিনির্ভরশীলতা সুবুদ্ধির পরিচায়ক হবে না। ধনী ও উন্নত বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন শ্রম বাবদ খরচ কমানোর জন্য দৃষ্টি দিচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির দিকে। আমাদের তাই উচিত হবে রফতানি বৈচিত্র্যকরণ ও এ খাত থেকে আয় বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া।