গুঁড়োদুধ আমদানিতে শুল্ক হ্রাসে দেশীয় খামারিরা সর্বস্বান্ত হবেন

সংবাদ সম্মেলনে দুগ্ধখামারিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের আপামর মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুঁড়োদুধের ওপর নির্ভরশীলতা নয় বরং খাঁটি তরল দুধের উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং দুগ্ধ খামারিদের স্বার্থ রক্ষার প্রতি নজর দিতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে গুঁড়োদুধের শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। শুল্ক হ্রাস হলে দেশীয় খামারিরা সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। বাজেট পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় দুগ্ধ খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিডিএফএ) পক্ষ থেকে এ দাবি করা হয়েছে।
গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, ফিল্ড মিল্ক পাউডার (এফএমপি) বা গুঁড়োদুধের আমদানিতে শুল্ক কমানোর মধ্য দিয়ে দেশীয় দুগ্ধ উৎপাদনকারী খাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তাই শুল্ক হ্রাস নয় বরং বিদ্যমান শুল্ক বহাল রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত ৩০ শতাংশ এন্টিডাম্পিং ডিউটি আরোপের দাবি তাদের।
বিডিএফএ সভাপতি মো. ইমরান হোসেন বলেন, দুগ্ধ উৎপাদনে সাধারণ খামারিরা যখন পারদর্শিতা দেখাতে শুরু করেছেন, আমদানি নির্ভরতা যখন কমে আসতে শুরু করেছে এবং দুগ্ধ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে সরকার যখন ইতিবাচক উদ্যোগ নিচ্ছেন, এমনকি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ প্রকল্প (পাঁচ হাজার কোটি টাকার) বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে- তখন গুঁড়োদুধের ওপর শুল্ক হ্রাস সরকারের নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। আর এ প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে সারা দেশের লাখো খামারির সর্বনাশ হবে। এ খাতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে।
তিনি বলেন, দুগ্ধ উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ, পাবনা, সাতক্ষীরা, যশোর, রংপুর প্রভৃতি এলাকার খামারিরা মিল্কভিটা, প্রাণ, আকিজ প্রভৃতি কোম্পানির কাছে ২৯ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ টাকায় প্রতি লিটার দুধ বিক্রি করে থাকেন। যেখানে উৎপাদন খরচ প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। বিক্রি করতে না পেরে অনেক সময় দুধ ফেলে দিতেও বাধ্য হয় খামারিরা। হোসেন বলেন, বিশ্বের প্রধান দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশগুলো এ খাতে বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি দিচ্ছে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত দুধ পাউডার হিসেবে আমাদের মতো দেশগুলোতে ডাম্পিং করছে। ডেনমার্কভিত্তিক সংস্থা অ্যাকশনএইড ‘মিল্কিং দ্য পুওর’ প্রতিবেদনে দেখিয়েছে কীভাবে ইউরোপের দেশগুলো ভর্তুকিতে উৎপাদিত দুধ অন্য দেশে ডাম্পিং করছে। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে স্বাবলম্বী হতে হলে গুঁড়োদুধ আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
বিডিএফএ মহাসচিব শাহ এমরান বলেন, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মাথাপিছু দৈনিক ২৮০ মিলিলিটার দুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সে হিসাবে বাৎসরিক চাহিদার পরিমাণ প্রায় ১৪৫০ কোটি লিটার। ২০১৭ সালে দেশে উৎপাদিত হয়েছে চাহিদার ৬২ দশমিক চার শতাংশ। অর্থাৎ আমদানি নির্ভরতা ছিল মাত্র ৩৭ দশমিক ছয় শতাংশ। মাত্র সাত বছর আগে এ নির্ভরশীলতা ছিল প্রায় ৬০ ভাগ। এমরান বলেন, বিগত পাঁচ বছরে গুঁড়োদুধের আমদানি ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। এতে এক ধরনের কমিশন বাণিজ্য কাজ করছে। শুরুর দিকে গুঁড়োদুধের ওপর আমদানি শুল্ক ছিল প্রায় ৫১ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এ হার ছিল ২৫ শতাংশ। কিন্তু আগামী অর্থবছরের বাজেটে তা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় এফএমপি এর পুষ্টিগুণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটি আসলে দুধ থেকে প্রাণিজ ফ্যাট তুলে নিয়ে তাতে ভেজিটেবল ফ্যাট (পামওয়েল/কোকোনাট ওয়েল) মিশিয়ে তৈরি করা একটি পণ্য। সে অর্থে এটি ন্যাচারাল নয়, বরং কৃত্রিম একটি পণ্য।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বিগত পাঁচ বছরে দেশে কয়েক লাখ শিক্ষিত বেকার যুবক ও প্রবাসী এ খাতে বিনিয়োগ করেছেন। এ খাতটি প্রায় ৫০-৬০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, ২০১০-১১ সালে দুগ্ধ খামারের সংখ্যা ছিল ৭৯ হাজার ৯৪২টি। ২০১৬-১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ। জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান তিন দশমিক ২১ শতাংশ। প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে মোট কর্মসংস্থানের ২১ শতাংশ। মোট আমিষের আট শতাংশ আসে মাংস ও দুধ থেকে। সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় দুগ্ধ ডেভেলপমেন্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও ব্র্যাকের ডেইরি অ্যান্ড ফুড বিভাগের পরিচালক মো. আনিসুর রহমান, বাংলাদেশ এসএমই করপোরেশনের পরিচালক (হেড অব বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) আজাদ চৌধুরী, অক্সফ্যামের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার মুহতাসীম বিল্লাহ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।