গুরুজনদের অবমাননা সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন

পাঠকের চিঠি

এখন থেকে এক যুগ আগের কথা চিন্তা করলে মাঝমাঝে বিভ্রান্ত হয়ে যাই। পরিবার, সমাজ ও দেশ অনেকটা এগিয়ে গেছে। উন্নয়ন বা উন্নতি যাই বলি না কেন দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন হয়েছে দেশের। এই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে যেমন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, তেমনি লেগেছে গুরুজনদের মধ্যেও। এখন একটা বিষয় প্রায়ই সমাজে দেখা যায় গুরুজনদের অবমাননার চিত্র। সবার মধ্যেই কেন যেন ডেম কেয়ার একটা ভাব চলে এসেছে। এর একটা ইতিবাচক দিক হলো সবাই এখন স্বতন্ত্র। এটা ভালো, কিন্তু কতটা ভালো, তা নিয়ে একটু বলতে চাই।
পরিবার থেকে একজন শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। আর সেটা তার জন্মের পর থেকেই। পরিবারের বাবা-মা তার প্রথম গুরুজন। তারপর প্রইমারি, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ার ধাপে গুরুজন পাই আমরা, তা নয়। আমাদের সমাজে অনেক প্রবীণ ব্যক্তিও রয়েছেন। তারাও আমাদের গুরুজন। আমরা তাদের কতটুকু মানছি বা সম্মানের জায়গায় রাখছি, সেটা একবার ভাবি তো। আসলেই কি মানছি? যখন তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, তখন সৌজন্যবোধ থেকেও তাদের কিছু জিজ্ঞেস করছি না। এটি একটি সমাজ তথা দেশের জন্য ভালো কিছু নয়। সেটি নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
আমরা বাঙালিরা বাংলা সংস্কৃতি পালন ও ধারণ করে বড় হয়েছি। পাশ্চাত্যের প্রভাবে আমরা গুরুজনকে সম্মান দেখাতে পারছি না। সেজন্য আমাদের প্রত্যেকেরই সচেতন হওয়া উচিত।
একটা ব্যাপার প্রায়ই লক্ষ করা যায় যে শিক্ষককে আমার দরকার সেই শিক্ষককে দেখলে সালাম-নমস্কার দিই, তোষামোদ করার চেষ্টা করি; কিন্তু অন্য শিক্ষককে দেখলে সালামটা পর্যন্ত দিই না। এটা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে পড়ে। একজন শিক্ষক তার বিভাগ বা অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীর কাছে সম্মান আশা করেন। তবে তাকে সম্মান না করলে তার এমন কিছু আসে-যায় না। তবে সৌজন্যবোধ বলতে একটি কথা আছে। সেটি সবারই করা উচিত। এই সৌজন্যবোধ আপনি কেন করবেন? পারস্পরিক সৌজন্যবোধ আন্তঃসম্পর্ক বাড়ায়, যেটি আপনার কোনো কাজে আসতে পারে।
সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, গুরুজনদের অবহেলার চিত্র। সবাই আমরা কর্মক্ষম মানুষ চাই, অর্থাৎ কাজ করার ক্ষমতা। মানুষ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বয়স বাড়ে। একসময় বয়সের ভাড়ে পিঠ বাঁকা হয়ে যায়। নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কোনো মানুষ বৃদ্ধ হয়। বৃদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অবহেলা শুরু হয়। কিন্তু এই গুরুজনদের অবহেলার না করে আমরা যদি তাদের যথার্থ সম্মান দিই, তাহলে সমাজ এগিয়ে যাবে। সবচেয়ে ভালো সুবিধা হলো তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা আমরা কাজে লাগাতে পারি, শুনতে পারি তার জীবনের নানা জানা-অজানা গল্প, যা আমাদের জীবনে কাজে লাগতে পারে। তারা যে জায়গায় গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন, সেটা জেনে সেখান থেকে আমরা সুন্দর করে কাজ শুরু করতে পারি।
গুরুজনদের আদেশ-উপদেশ আমাদের কাজে আসতে পারে। কাউকে শ্রদ্ধা করা বা সম্মান দেখানোর মধ্যে কোনো ভুল নেই, নেই কোনো অন্যায়। সেটা মানুষকে শ্রদ্ধাবনত হতে শেখাবে, কাউকে মেনে নিতে বা মানতে শেখাবে যেটি সমাজ ও পরিবারের সুশৃঙ্খলার জন্য খুব দরকার। নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ছাড়া সমাজ শৃঙ্খলিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে না। নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানসিকতাই তৈরি করবে সত্যিকার মানুষ, আর সেটা শুরু হোক গুরুজনদের শ্রদ্ধা ও সম্মানের মাধ্যমে।
শুধু গুরুজন নয়, কাউকেই অবমাননা বা অপমান করে কেউ ভালো কিছু করতে পারবে না, পাবে না সন্তুষ্টি। দিন শেষে রাতে ঘুমানোর আগে হলেও নিজের মধ্যে নিজের প্রতি ঘৃণাবোধ জাগ্রত হবে। তখন মানসিকভাবে নিজেকে অনেকটাই ছোট মনে হবে। ফলে স্বাভাবিক কাজকর্মে কিছুটা হলেও ব্যাঘাত ঘটবে। নিজের স্বাভাবিকতার জন্য হলেও আমরা অপরকে মূল্যায়ন করি। জাগ্রত করি নিজের বিবেকবান মূল্যবোধ। তাহলেই সমাজে আপনার বা আমার দ্বারা মূল্যবোধহীন কাজ করা সম্ভব হবে না। যদি সমাজে গুরুজনদের অবমাননা না করা হয়, তবে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন ঘটবে না। তাই আসুন গুরুজনদের অবমাননা না করে নৈতিক সমাজ গড়ি।

শতাব্দী জুবায়ের
শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]